'পরাশক্তিগুলো নিজেদের সীমাবদ্ধতা টের পাচ্ছে' -এফটিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘ মহাসচিব
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অচলাবস্থা এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার স্থবির হয়ে পড়া আগ্রাসন—বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। একই সঙ্গে বহুকেন্দ্রিক (মাল্টি-পোলার) বিশ্বে জাতিসংঘের গুরুত্ব হারিয়ে যাওয়ার ধারণাও পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
জাতিসংঘের শীর্ষ পদে প্রায় এক দশক দায়িত্ব পালনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেছেন, মার্কিন আধিপত্যের পতন, নতুন শক্তির উত্থান এবং স্নায়ুযুদ্ধের পরাশক্তিগুলোর নিজেদের পছন্দমতো যুদ্ধে নেমে নির্ণায়ক জয় পেতে ব্যর্থ হওয়ার শিক্ষা—বর্তমান বিশ্বকে নতুন রূপ দিচ্ছে।
বর্তমানে আর্থিক সংকট, কর্মীদের মনোবল হ্রাস এবং বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর বিভাজনে জর্জরিত জাতিসংঘ। এমন প্রেক্ষাপটে, বিশ্বসংস্থাটির মহাসচিব সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারে, তবে এই বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা চরম সংঘাতের দিকে ধাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের ৩৮ তলায় নিজ কার্যালয়ে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম– ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে (এফটি) দেওয়া সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেন, "পরাশক্তিগুলোর এখন নিজেদের ক্ষমতার সীমা বোঝার সময় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যা ঘটেছে তার দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেদের ইচ্ছা বা সামরিক শক্তি চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।"
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "রাশিয়া ও ইউক্রেনের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে দেখুন।" উল্লেখ্য, মস্কো আশা করেছিল ইউক্রেনে তাদের অভিযান মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হবে।
এরপর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দিকেও তাকান।" গত ফেব্রুয়ারিতে আক্রমণের সময় আমেরিকা আশা করেছিল তেহরান আত্মসমর্পণ করবে; কিন্তু ছয় মাস পরও ইরানের শাসকগোষ্ঠী টিকে রয়েছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনের নৌপথ 'হরমুজ প্রণালি' বন্ধ করে দিয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা থেকে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, "পরাশক্তিগুলোকে বুঝতে হবে যে পরিস্থিতি বদলে গেছে, বিভিন্ন দেশের প্রভাব-প্রতিপত্তির ভারসাম্যও পাল্টে গেছে।"
পর্তুগালের ৭৭ বছর বয়সী প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রী— যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত 'বোর্ড অব পিস'-এর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হয়ে ওঠার ধারণাকে নাকচ করে দেন। আন্তর্জাতিক নেতাদের নিয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চুক্তি করার লক্ষ্য নিয়ে গত বছর গঠিত হয়েছিল। কিন্তু গাজায় শান্তি ফেরাতে এটি যে কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি করতে পারেনি, সে বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, "(জাতিসংঘের) যত জটিলতাই থাক না কেন, সত্যিটা হলো গাজায় কী ঘটছে, কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং কতটা অগ্রগতি হয়েছে তার দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট—জাতিসংঘের চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বরং অন্যরা কী করছে, তা নিয়ে তাদেরই চিন্তিত হওয়া উচিত।"
গুতেরেসের এক দশকের মেয়াদে বৈশ্বিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাতিসংঘের অবস্থান কিছুটা ম্লান হয়েছে। জাতিসংঘের সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তার মতে, গুতেরেস ও তাঁর প্রশাসন দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ব সংঘাতের স্থানগুলোতে নিষ্ক্রিয় থেকে ভুল করেছেন। বিরোধ মেটানোর চেয়ে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জলন্ত বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার দিকেই বেশি মনোনিবেশ করেছেন বলে মনে করেন তারা।
ইউক্রেন, গাজা ও ইরানের যুদ্ধে মধ্যস্থতা করা কঠিন ছিল বলে স্বীকার করেন গুতেরেস। তিনি বলেন, জাতিসংঘের মূল নীতি-নির্ধারণী কর্তৃপক্ষ– নিরাপত্তা পরিষদ 'কার্যত অচল' হয়ে পড়েছিল, কারণ এতে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি স্থায়ী দেশের মধ্যে দুটি পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে রেখেছে সংস্থাটিকে। সুদান গৃহযুদ্ধেও জাতিসংঘকে কোণঠাসা হয়ে পড়তে হয়েছে বলে তিনি মেনে নেন; কারণ অচল নিরাপত্তা পরিষদের সুযোগ নিয়ে বাইরের মধ্যস্থতাকারীরা সেই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছে।
তিনি বলেন, "বর্তমানে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজ করছে। যেসব দেশ নিয়ম ভাঙছে তাদের সরাসরি সতর্ক করা বা শাস্তি দেওয়ার মতো— কার্যকর কোনো নিরাপত্তা পরিষদ না থাকায়, জাতিসংঘের প্রভাব বা দর কষাকষির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।"
তবে মধ্যস্থতার কাজ থেকে সরে দাঁড়ানোর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে গুতেরেস ৬০ বছর ধরে বিভক্ত সাইপ্রাসে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "আজকের দিনে মধ্যস্থতা অত্যন্ত কঠিন এবং এর ফলাফলও সীমিত। কিন্তু আমরা হাল ছাড়ছি না।" তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও লেবানন, গাজা, সুদান ও লিবিয়ায় মধ্যস্থতা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে।
তাঁর আমলে জাতিসংঘের কণ্ঠস্বর 'ক্ষীণ' হয়ে এসেছে—এমন সমালোচনার জবাবে গুতেরেস যুক্তি দেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের 'ভয়াবহ' হামলা এবং গাজায় ইসরায়েলের 'সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য' পাল্টা আক্রমণের বিষয়ে তাঁর মতো স্পষ্ট ভাষায় খুব কম লোকই সোচ্চার হয়েছেন।
এসব সমালোচনার কারণে ইসরায়েল এবং রাশিয়া উভয় দেশই তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট—এমন অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে গুতেরেস বলেন, "আমি মনে করি আমরা ইতিহাসের সঠিক পথেই ছিলাম। দুটি জাতি যেন পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করতে পারে, আমরা কেবল সেই প্রয়োজনীয় নীতিকেই সমর্থন জানিয়েছি।"
গুতেরেসের পূর্বসূরি আটজন মহাসচিবের মতোই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক। জাতিসংঘের বহুপক্ষীয় এজেন্ডা ও এর কার্যক্রম নিয়ে নিজের অসন্তোষের কথা কখনই গোপন করেননি ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসন বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (ডব্লিউএইচও) সহ জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সংস্থা থেকে সহায়তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং জাতিসংঘের বহু কার্যক্রমের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির মূল বাজেটে যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি এবং শান্তি রক্ষা মিশনে বকেয়া ৩০০ কোটি ডলার। তবে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের বাজেটের জন্য ৭২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ছাড় করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
আর্থিক ঘাটতির কারণে গুতেরেসকে কঠোর বাজেট ছাঁটাইয়ের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, যার ফলে জাতিসংঘের হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা এই বাজেট ছাঁটাইকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানালেও তাদের দাবি—এই ছাঁটাই অনেক বছর আগেই করা উচিত ছিল। জাতিসংঘের ভেতরের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন যে, স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং একই কাজ বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে করে অপচয় বাড়াচ্ছিল।
বাজেটের টানাপোড়েন প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, "অনেকে ভেবেছিলেন জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থা হয়তো ভেঙে পড়বে। কিন্তু কোনো কিছুই ভেঙে পড়েনি। হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের ব্যাপ্তি কিছুটা কমেছে। কিন্তু সংস্থাগুলো কি ধসের মুখোমুখি? একদমই না, কারণ আমরা এমনভাবে পুনর্গঠিত হয়েছি, যা আমাদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করেছে। প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের বিশাল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছি। ২০২৬ সালের বাজেটে আমরা পদের সংখ্যা ২২ শতাংশ হ্রাস করেছি। বিশ্বের অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান এমন নজির দেখাতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই।" তিনি আরও জানান, গত বছর শান্তিরক্ষী বাহিনী মিশনে সেনা সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমানো হয়েছে। "আমরা ইউনিট ধরে ধরে সেনা কমিয়েছি, যা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসও হয়তো খেয়াল করেনি" –বলেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে গুতেরেসের সম্পর্ক অত্যন্ত শীতল। এমনকী তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প গুতেরেসের সঙ্গে তেমন একটা কথাও বলেননি। তবে গুতেরেস জানান, বিভিন্ন খবর বা হেডলাইনের বাইরেও পশ্চিম সাহারা, লিবিয়া এবং সুদানের মতো বেশ কয়েকটি বিরোধ নিষ্পত্তিতে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা বজায় রেখেছে। হাইতির মানবিক সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটনকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকার কথা তিনি উল্লেখ করেন। সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, "কখনও কখনও মানুষের মুখের কথা আর কাজের মধ্যে... তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকে।"
জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে গুতেরেসের এই এক দশকে বিশ্বমঞ্চে 'মধ্যম শক্তি' হিসেবে ভারত এবং ধনাঢ্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর উত্থান ঘটেছে। গুতেরেস এটিকে 'খুবই ইতিবাচক একটি ধারা' হিসেবে দেখছেন। এই পরিবর্তনের হাওয়া আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোকে তাদের ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের কাঠামো বদলে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে বাধ্য করবে বলেও মনে করেন তিনি।
তবে এই পরিবর্তন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামলানোর বিষয়ে হুঁশিয়ার করেন তিনি। বিশ্ব পরাশক্তিগুলো যদি পরিবর্তিত বিশ্বকে প্রতিফলিত করার জন্য এই সংস্থাগুলোর সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে "ঝুঁকি হলো এই বহুমেরু ব্যবস্থা প্রতিযোগিতা এবং শেষ পর্যন্ত চরম সংঘাত সৃষ্টি করবে।" গুতেরেস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের ইউরোপও ছিল বহুমেরু-ভিত্তিক। কিন্তু (আন্তর্জাতিক) সুশাসনের কোনো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান না থাকার চূড়ান্ত ফল ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।"
মধ্যম শক্তির ও অপেক্ষাকৃত ছোট দেশগুলো নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের জোর দাবি জানাচ্ছে। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী পাঁচ বিশ্বশক্তি— নিরাপত্তা পরিষদে আনা যেকোনো প্রস্তাবে ভেটো দিতে পারে; যেখানে অন্যদের মতামত গ্রাহ্য হয় না। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। গুতেরেস মনে করেন, ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি দেশের মধ্যে তিনটিই ইউরোপের হওয়া কোনো টেকসই ব্যবস্থা হতে পারে না। তিনি বলেন, "দিনশেষে বাস্তবতাই জয়ী হবে। নিরাপত্তা পরিষদকে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির প্রভাব-প্রতিপত্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে রূপান্তর করা অপরিহার্য।"
তবে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে নতুন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে একমত হওয়া যে কঠিন, তাও মানেন গুতেরেস। তিনি বলেন, "ক্ষমতা কখনো উপহার হিসেবে পাওয়া যায় না, তা অর্জন বা ছিনিয়ে নিতে হয়। প্রশ্ন হলো কীভাবে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এমনভাবে সংগঠিত করব যেন সেই ক্ষমতা অর্জনের পরিবেশ তৈরি হয়।"
এ বছরের ডিসেম্বরে গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার প্রতিযোগিতা তীব্রতর হচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘকে আরও দৃশ্যমান দেখতে চান। এক প্রার্থী তো বলেই বসেছেন যে আমূল সংস্কার না হলে জাতিসংঘ "ধীরে ধীরে বিলুপ্তির" মুখে পড়তে পারে এবং এর কার্যক্রম আরও সংকুচিত হতে পারে। এ বিষয়ে তাঁর উত্তরসূরির প্রতি গুতেরেসের একমাত্র পরামর্শ হলো— "নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখুন এবং যা সঠিক মনে করেন সেটাই করুন।"
ভবিষ্যতে জাতিসংঘের কর্তৃত্ব ও ব্যাপ্তি আরও কমে যেতে পারে বলে ব্যক্তিগত আলাপে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গুতেরেস। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জাতিসংঘের পূর্বসূরি অকার্যকর 'লিগ অব নেশনস'-এর মতো জাতিসংঘেরও একই পরিণতি হতে পারে বলে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা তিনি উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, "সব জটিলতা ও সমস্যা সত্ত্বেও" বিগত আট দশকে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় অবদান হলো পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ এড়ানো।
গুতেরেসের দায়িত্বের সময়সীমা এখন শেষ লগ্নে। জাতিসংঘের অন্যান্য মহাসচিবদের মতো তাঁকেও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হয়েছে—তিনি কি প্রশাসনিক কাজ সামলানোর দিকে বেশি নজর দিয়ে 'সেক্রেটারি' বা সচিব হবেন, নাকি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি সামলে সত্যিকারের 'জেনারেল' হবেন? শেষ পর্যন্ত উভয় দিক থেকেই সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। তবে পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী বিশ্বনেতারা জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যাকে পাত্তা না দেওয়া সত্ত্বেও—এই ইস্যুতে লড়াই চালিয়ে যাওয়াকে নিজের একটি বড় সাফল্য মনে করেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, "জাতিসংঘ মহাসচিবের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। মহাসচিবের কেবল একটি স্বর বা কণ্ঠ আছে এবং সবাইকে একসঙ্গে আহ্বান করার সামর্থ্য আছে। ক্ষমতা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস এবং তা আমাদের নেই। কিন্তু আমাদের কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া যাবে না।"
