প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামাল যা বললেন
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুষ্ঠান 'জিরোসাম গেম'-এ উপস্থাপক ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটনের সঙ্গে আলাপকালে সেই সাক্ষাতের নানা অজানা দিক এবং প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন চিন্তা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরেন তিনি।
সাক্ষাৎকারটির চুম্বক অংশ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো:
শাখাওয়াত লিটন: আপনি দেড় মাস আগে বলেছিলেন সরকার নতুন বলে ভুল খুঁজে পাচ্ছেন না, তাই ভালো নেই। এখন সরকারের বয়স দুই মাস হতে চলল। গত ১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আপনার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। কী আলাপ হলো?
মাসুদ কামাল: আসলে ১০ দিন আগে উনার সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল। উনি আমাকে লাঞ্চের দাওয়াত দিয়েছিলেন ওনার সচিবালয় অফিসে। সেখানে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। মাঝখানে দেহলাম জাহিদুর রহমান যে ১৫০ টাকার লাঞ্চের হিসাব দিয়েছিল, সেটি একদম সত্য।
শাখাওয়াত লিটন: মেন্যুতে কী কী ছিল?
মাসুদ কামাল: মেন্যুতে ছিল বেগুন ভর্তা, চিকন করে কাটা বাঁধাকপি ভাজি, ছোট ছোট বেলে মাছ আর শিং মাছ দিয়ে কাঁচকলা ও আলুর তরকারি। সাথে সাদা ভাত আর ডাল। আমি দেখেছি খাবার খুব সামান্য ছিল এবং উনি খুবই স্বল্পাহারী। উনি জানালেন, আগে খাবার 'অবকাশ' থেকে আসত, এখন যমুনার কিচেনে রান্না হয়। উনার অফিসের স্টাফদের লাঞ্চ বাজেট ১০০ টাকা আর বিকেলের নাস্তা ৫০ টাকা—সব মিলিয়ে ১৫০ টাকা।
শাখাওয়াত লিটন: আলাপ হলো কী নিয়ে?
মাসুদ কামাল: নানা বিষয় নিয়ে। যেমন, উনি জানতে চাইলেন উনার সরকার কেমন করছে। আমি যা বলার বলেছি এবং খুব কড়াভাবেই বলেছি। যেমন আমি ওনাকে জিজ্ঞেস করেছি—আওয়ামী লীগ কেন নিষিদ্ধ করলেন? হিন্দুরা তো আপনাকে ভোট দিয়েছে। আগে তারা বিএনপিকে ভোট দিত না এই ভয়ে যে, বিএনপি হয়তো তাদের বিশ্বাস করবে না যে তারা ভোট দিয়েছে। এখন তারা যে ভোট ব্যাংক হিসেবে আপনাদের পাশে দাঁড়ালো, তাদের জন্য দৃশ্যমান কী করছেন? দেবোত্তর সম্পত্তি বেদখল বা চিন্ময় প্রভুর মতো ধর্মীয় নেতাদের গ্রেফতারের বিষয়ে আপনাদের সিদ্ধান্ত কী?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, উনার সরকার এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
শাখাওয়াত লিটন: প্রেস ফ্রিডম বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কী বললেন?
মাসুদ কামাল: এ বিষয়ে ওনাকে খুব আন্তরিক মনে হয়েছে। উনি স্পষ্ট বলেছেন, প্রেসের ওপর হাত দেওয়া উনার কাজের মধ্যে পড়ে না। প্রেস প্রেসের মতো থাকবে, উনি উনার কাজ করবেন। এমনকি উল্টো আমাকেই জিজ্ঞেস করেছেন—উনার কোনো আচরণে কি মনে হয়েছে যে উনি প্রেস ফ্রিডমে হস্তক্ষেপ করছেন? আমি বলেছি—না, তা মনে হয়নি।
শাখাওয়াত লিটন: অনেক সাংবাদিক প্রায় দেড় বছরের মতো সময় ধরে কারাগারে আটক আছে বিনাবিচারে বা খুনের মামলায়। তাদের বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে?
মাসুদ কামাল: হ্যাঁ, আলোচনা হয়েছে। উনি বলেছেন বিষয়টি বিচার বিভাগীয়। তবে উনি ব্যক্তিগতভাবে সচেতন আছেন এবং ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
শাখাওয়াত লিটন: দীর্ঘ আলোচনায় আপনার অবজারভেশন কী ?
মাসুদ কামাল: আমার কাছে উনাকে অন্য সরকার প্রধানদের তুলনায় অনেক বেশি মানবিক মনে হয়েছে। উনি শেখার চেষ্টা করছেন। সাধারণত সরকার প্রধানরা আমলা বা অনুগত চাটুকারদের দিয়ে ঘেরা থাকেন। কিন্তু তারেক রহমান সেই বৃত্তের বাইরে গিয়ে আমার মতো সমালোচকদেরও ডাকছেন। আমি যখন বললাম যে আমি তো আপনার অনেক সমালোচনা করি, উনি বললেন—'আমি তো জানি, এজন্যই তো আপনাকে ডেকেছি।' এই উদারতা আমি আগে দেখিনি।
শাখাওয়াত লিটন: মন্ত্রিসভার টিমওয়ার্ক নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
মাসুদ কামাল: আমি ওনাকে [প্রধানমন্ত্রীকে] বলেছি যে আপনার মন্ত্রীরা আপনাকে ফলো করতে পারছেন না। উনি যখন সিদ্ধান্ত নিলেন সরকারি গাড়ি, তেল বা ড্রাইভার নেবেন না—উনি একটা এক্সাম্পল ক্রিয়েট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো মন্ত্রী সেটা ফলো করেনি। আমি ইন্টারনেট থেকে সব মন্ত্রীর হলফনামা বের করে দেখেছি, মন্ত্রিসভার সবচেয়ে গরিব মানুষটি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অথচ বড় বড় ধনী মন্ত্রীরা সরকারি সুবিধা ছাড়তে পারেননি। তার মানে তারা মানসিকভাবে দরিদ্র।
প্রধানমন্ত্রী আমাকে অসহায়ত্বের সুরে বললেন—'দেখেন, আমি তো কাউকে অর্ডার করতে পারি না, কারণ সুযোগটা উনাদের আইনে আছে।' তবে উনি মনে মনে চেয়েছিলেন সবাই যেন উনাকে অনুসরণ করে।
শাখাওয়াত লিটন: প্রধানমন্ত্রী যেদিন ঢাকায় ফিরলেন লন্ডন থেকে, একটা সংবর্ধনা সভায় মার্টিন লুথার কিং'কে কোট করে তিনি বলেছিলেন 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান'। এ বিষয়ে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা?
মাসুদ কামাল: তিনি ১৮০ দিনের একটি প্রোগ্রাম নিয়ে নেমেছেন। আমাকে বলেছেন, ১৮০ দিন পর উনি সব মূল্যায়ন করবেন। যারা খারাপ করবেন, তাদের সরিয়ে দেবেন। আমি ওনাকে প্রস্তাব দিয়েছি—ধরুন সবাই ভালো করেছে। তবে সবাই তো সমান ভালো করেনাই। কম ভালো করেছে এরকম দুই জন মন্ত্রী ও দুই জন প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে দিন। এতে অন্যদের মধ্যে মেসেজ যাবে এবং প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে।
শাখাওয়াত লিটন: প্রধানমন্ত্রী কি আপনাকে ওনার টিমে যোগ দেওয়ার কোনো প্রস্তাব দিয়েছেন?
মাসুদ কামাল: না, সেরকম কিছু নয়। তবে আমি ওনাকে বলেছি যে, উনি যদি আমার মতো সমালোচকদের অনুষ্ঠানগুলো দেখেন বা কথাগুলো শোনেন, তবে সেটি উনার নিজের জন্যই লাভজনক হবে।
শাখাওয়াত লিটন: সবশেষে আপনার মূল্যায়ন কী?
মাসুদ কামাল: নতুন যাত্রায় প্রধানমন্ত্রী মানুষের সাহায্য চেয়েছেন। উনি খুব ভালো শ্রোতা এবং অত্যন্ত সেন্সিবল মানুষ। ব্যক্তি হিসেবে উনাকে আমার পছন্দ হয়েছে।
