‘অটো ভাড়ার চেয়েও সস্তা’ দাবি মোদির, অথচ রকেট উৎক্ষেপণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় ভারতেরই—বলছে গবেষণা
চন্দ্রযান-৩-এর সাফল্য এবং ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভারত যখন তার তৃতীয় জাতীয় মহাকাশ দিবস উদযাপন করছে, তখন ইউরোপের দুটি প্রতিষ্ঠানের একটি নতুন অ্যাকাডেমিক গবেষণা ভারতীয় মহাকাশ প্রতিষ্ঠানের সামনে এর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি হিসেবে ভারতের মহাকাশ উৎক্ষেপণ খরচ আমেরিকার তুলনায় চার গুণ বেশি এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ আলেসিও তারজি এবং ইতালির প্রাচীনতম কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় পলিটেকনিকো ডি তুরিনের ফ্রাঞ্চেসকো নিকোলির লেখা একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা প্রবন্ধ এলসেভিয়ার জার্নাল 'ইকোনমিক্স লেটার্স'-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা ১৯৬০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া ৬ হাজার ৭৪০টিরও বেশি রকেট উৎক্ষেপণের একটি নতুন ডেটাবেস ব্যবহার করেছেন। এ থেকে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ২০২৫ সালে নিম্ন ভূ-কক্ষপথে এক কেজি পে-লোড উৎক্ষেপণে ভারতের গড় খরচ ছিল প্রায় ১৩,৩০২ ডলার, যা এ গবেষণার প্রধান মহাকাশচারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রে সর্বনিম্ন খরচ রেকর্ড করা হয়েছে প্রতি কেজিতে ৩ হাজার ২২৫ ডলার। এর অর্থ, কেজি প্রতি উৎক্ষেপণে ভারতের খরচ আমেরিকার তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
এই গবেষণার ফলাফলটি ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচির সাথে জড়িত বহুল প্রচলিত একটি দাবিকে সরাসরি বাতিল করে দেয়। দশকের পর দশক ধরে ইসরো বিশ্বজুড়ে সাশ্রয়ী প্রকৌশলের একটি আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
পশ্চিমা বিশ্বের খরচের সামান্য অংশ দিয়ে মিশন পরিচালনা করা থেকে শুরু করে সাধারণ দৈনিক খরচের সাথে মহাকাশ মিশনের তুলনা—কম খরচে বেশি অর্জন করার এই ভারতীয় ভাবমূর্তিটি জনমনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে।
২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, 'আহমেদাবাদে অটো রিকশায় এক কিলোমিটার যেতে ১০ টাকা খরচ হয়, অথচ মঙ্গলযানের মাধ্যমে ভারত প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ৭ টাকা খরচে মঙ্গলে পৌঁছেছে, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।'
গত ২১ আগস্ট নরেন্দ্র মোদি ভারতের ২০টি স্পেস স্টার্টআপের প্রধান নির্বাহী এবং প্রতিষ্ঠাতাদের সাথে মতবিনিময় করেন। সেখানে তিনি এমন একটি পরিবেশ ও ইকোসিস্টেম তৈরির আহ্বান জানান, যাতে বিশ্ব যখনই মহাকাশ নিয়ে ভাববে, তখন তারা ভারতের দিকে তাকাবে।
তিনি বলেন, ভারতের মহাকাশ খাত বৈশ্বিক মেধা, কোম্পানি এবং বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য একটি চৌম্বক ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
কেমব্রিজ এবং তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, কক্ষপথে পাঠানো প্রতি কেজি খরচের ভিত্তিতে যখন উৎক্ষেপণের খরচ পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন ভারত সবচেয়ে সাশ্রয়ী হিসেবে নয়, বরং প্রধান উৎক্ষেপণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হিসেবে সামনে আসে।
গবেষণায় দেখা গেছে ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে গড় উৎক্ষেপণ খরচ যেখানে ছিল প্রতি কেজিতে ৩ হাজার ৮৬৮ ডলার, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা ছিল গড়ে প্রতি কেজিতে ৩ হাজার ২২৫ ডলার, জাপানে ৫ হাজার ২৮৭ ডলার, চীনে ৫ হাজার ৮০৯ ডলার, রাশিয়ায় ৬ হাজার ৬৮২ ডলার এবং ইউরোপে ৯ হাজার ৮৯৭ ডলার। এ তালিকায় শীর্ষে থাকা ভারতের খরচ ছিল প্রতি কেজিতে ১৩ হাজার ৩০২ ডলার।
গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, 'ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যানটি সাধারণ ধারণার বিপরীত মনে হতে পারে, কারণ এটি দেশটির সাশ্রয়ী মহাকাশ কর্মসূচির প্রচলিত ভাবমূর্তির সম্পূর্ণ বিপরীত।' গবেষকদের যুক্তি, এর মূল কারণ রকেটের আকার। ভারতের উৎক্ষেপণ যানগুলো সাধারণত ছোট আকারের পে-লোড বহন করে, যার অর্থ নির্দিষ্ট স্থায়ী খরচ কম কেজি ওজনের মধ্যে ভাগ হয়। এর ফলে, মিশনের সম্ভাব্য মূল খরচ কম হওয়া সত্ত্বেও প্রতি কেজির আপাত খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়ে যায়।
এই গবেষণাটি কেবল উৎক্ষেপণ খরচের সাধারণ তুলনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিগত কয়েক দশকের উৎক্ষেপণ কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেছে এবং অভিজ্ঞতা, উৎক্ষেপণের পুনরাবৃত্তি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা কীভাবে সময়ের সাথে সাথে খরচ কমিয়ে আনে—তা বোঝার চেষ্টা করেছে। গবেষকদের মতে, কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক 'অভিজ্ঞতা বক্ররেখা'-র মাধ্যমে উৎক্ষেপণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে ভারত, চীন, রাশিয়া এবং জাপানের ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা দেখা যায়নি—যদিও চীন অন্যতম প্রধান মহাকাশ শক্তি এবং নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন থাকা বিশ্বের একমাত্র দেশ।
এই গবেষণায় বলা হচ্ছে ভারতের ক্ষেত্রে, অপেক্ষাকৃত কম ঘন উৎক্ষেপণ এর অন্যতম কারণ হতে পারে। যেসব দেশ ঘন ঘন রকেট উৎক্ষেপণ করে, তারা দ্রুত শেখে, আরও দক্ষভাবে শিল্পায়ন ঘটায় এবং তাদের নির্দিষ্ট পরিকাঠামোগত খরচ তুলনামূলক বেশি সংখ্যক মিশনের মধ্যে ভাগ করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই কৌশল থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে, বিশেষ করে স্পেসএক্সের মাধ্যমে।
ইসোরোর জন্য এক সংবেদনশীল সময়ে এই সিদ্ধান্তটি সামনে এলো, যখন সংস্থাটি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ভারতের নির্ভরযোগ্য রকেট মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পিএসএলভি-র বেশ কয়েকটি মিশনের ব্যর্থ হয়েছে এবং এ বছর ইসরো কোনো সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করতে পারেনি—সব মিলিয়ে সংস্থাটি এক কঠিন সময় পার করছে।
এর পাশাপাশি ১২৫ জন বিজ্ঞানীর চাকরি ছাড়ার খবরটি বেশ সাড়া ফেলে। ফলে এই প্রতিবেদনটি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারতের উৎক্ষেপণ খাতের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
তবে ইসরোর চেয়ারম্যান ড. ভি নারায়ণন এই গবেষণাপত্রের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন। এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'গবেষণাটিতে "ভুল ডেটা" ব্যবহার করা হয়েছে।'
যদিও ইসরোর পক্ষ থেকে ঠিক কোন ডেটাসেট, অনুমান বা হিসাবগুলো ভুল ছিল—সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, গবেষণাপত্রটিতে বলা হয়েছে যে তাদের এই প্রাক্কলনগুলো সরকারি প্রতিবেদন, অ্যাকাডেমিক গবেষণা এবং পাবলিক ডকুমেন্টেশনসহ নানা উন্মুক্ত উৎস থেকে সংগৃহীত, যা ২০২৪ সালের ডলারের মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মানসম্মত করা হয়েছে।
প্রাক্তন ইসরো চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের বোর্ড সদস্য ড. এস সোমনাথও এই ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তার মতে, কেজি প্রতি খরচ দিয়ে সম্পূর্ণ চিত্র প্রকাশ পায় না।
তিনি বলেন, একটি ৪.৫ টনের মহাকাশযানের জন্য ভারত একজন আমেরিকান সরবরাহকারীকে যে উৎক্ষেপণ খরচ দিয়েছে, তা প্রায় লঞ্চ ভেহিকল মার্ক-৩ মিশনের খরচেরই সমান। যা ইঙ্গিত দেয় যে ভারতীয় উৎক্ষেপণ সেবাগুলো বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের মতোই সাশ্রয়ী।
ড. সোমনাথের মূল্যায়নে, স্পেসএক্স মূলত তাদের বিশাল পরিধি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের কারণে কেজি প্রতি কম খরচের সুবিধা পায়। তার মতে, 'ফ্যালকন ৯-এর জন্য কেজি প্রতি খরচ আমাদের চেয়ে কম, তবে তারা এই সুবিধা অন্য কাউকে দেয় না, বরং নিজেদের উৎক্ষেপণের জন্য ব্যবহার করে।'
তিনি আরও বলেন, যদিও ভারতীয় রকেটগুলো সবচেয়ে সস্তা না হলেও সেগুলো অতিরিক্ত ব্যয়বহুলও নয়।
ভারতের মহাকাশ সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক ও প্রচারকারী সংস্থা—ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল স্পেস প্রমোশন অ্যান্ড অথরাইজেশন সেন্টার এবং ইন্ডিয়ান স্পেস অ্যাসোসিয়েশন (আইএসপিএ)—উভয়েই এই গবেষণার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই বিতর্কটি আন্তর্জাতিক উৎক্ষেপণ খরচের তুলনার ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতের প্রকৃত উৎক্ষেপণ অর্থনীতি এখনো অস্পষ্ট। কিছু বাণিজ্যিক সরবরাহকারীর মতো ইসরো তাদের মিশনের বিস্তারিত খরচ কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে প্রকাশ করে না।
২০১৮ সালে ভারতের সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, একটি পিএসএলভি মিশনের আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় ২০৪ কোটি টাকা, আর একটি লঞ্চ ভেহিকল মার্ক-৩ (পূর্বে জিএসএলভি মার্ক ৩ নামে পরিচিত) মিশনের খরচ পড়েছিল প্রায় ৪৩৪ কোটি টাকা। এই হিসাবগুলো বেশ কয়েক বছর আগের এবং অবকাঠামো, কর্মীবাহিনী ও গবেষণা ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ খরচ কাঠামো এতে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে, যদিও ধারণা করা হয় যে সংখ্যাগুলো খুব একটা দূরবর্তীও নয়।
স্বচ্ছ ব্যয়-হিসাবের অভাব তুলনা প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। ভারত সাধারণত সরকারি উৎক্ষেপণগুলোর জন্য কোনো বীমা করে না। ফলে ব্যর্থতার কারণে হওয়া ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সরকারি তহবিল থেকেই মেটাতে হয়। তাছাড়া, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং সহায়ক কর্মীরা প্রায়ই একসাথে একাধিক প্রকল্পে কাজ করেন। যার ফলে নির্দিষ্ট কোনো একক মিশনের পেছনে তাদের বেতন এবং পরিকাঠামোগত ব্যয় আলাদাভাবে বের করা কঠিন।
নাসা ও ইসরোর যৌথ সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার মিশন বা 'এনআইএসএআর' সম্পর্কিত আলোচনায় এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কাগজে-কলমে নাসার খরচ পৌঁছেছে প্রায় ১২০ কোটি ডলারে, যার বিপরীতে ভারতের অবদান ছিল প্রায় ৩০ কোটি ডলার।
তবে জেটি প্রোপালশন লেবোরটরির ড. পল রোসেনের মতো বিশেষজ্ঞরা এনডিটিভি-কে জানান, সরাসরি এমন তুলনা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কারণ ভারতীয় হিসাব পদ্ধতিতে প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো এবং কর্মীভিত্তিক খরচগুলো একাধিক মিশনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
কেমব্রিজের এই গবেষণাপত্রটি প্রমাণ করে যে, স্পেসএক্স কীভাবে বৈশ্বিক উৎক্ষেপণ অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রতিযোগীদের তুলনায় খরচের দিক থেকে এক বিশাল ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
কারণগুলো চিহ্নিত করা খুব কঠিন নয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে প্রবেশের পুরো অর্থনীতিকেই বদলে দিয়েছে স্পেসএক্স। এর ফ্যালকন ৯-এর প্রথম ধাপটি নিয়মিতভাবে পৃথিবীতে নেমে আসে এবং পুনরায় আকাশে ওড়ে, যা উৎক্ষেপণ খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে।
প্রতিষ্ঠানটি শত শত মিশন সম্পন্ন করেছে এবং বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় অনেক বেশি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করে, কখনো কখনো একই দিনে একাধিকবারও ঘটে থাকে।
গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, আমেরিকান এই আধিপত্য এতটাই শক্তপোক্ত হয়ে উঠেছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্ষপথে পাঠানো বৈশ্বিক পে-লোডের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশেরই প্রতিনিধিত্ব করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
অর্থনীতির পাশাপাশি এর ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও চিন্তিত গবেষকরা। "আউটসোর্সিং দ্য ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার: স্পেসএক্স, দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যান্ড দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব স্পেস" শীর্ষক একটি পৃথক গবেষণা প্রবন্ধে আলেসিও তারজি বলেছেন, একক প্রভাবশালী ব্যক্তিগত কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই প্রবন্ধের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে কক্ষপথে প্রেরিত বৈশ্বিক পে-লোডের প্রায় ৭৫ শতাংশের জন্যই দায়ী ছিল স্পেসএক্স। প্রবন্ধটিতে এই আশঙ্কার কথাও তোলা হয়েছে যে, এই ধরণের নির্ভরতা একদিন ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তারজি জানান, '২০২৫ সালে কক্ষপথে পাঠানো বৈশ্বিক পে-লোডের ৭৫ শতাংশেরই পেছনে ছিল একটি একক আমেরিকান কোম্পানি, স্পেসএক্স। ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন এই নির্ভরতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার কিংবা অন্যান্য দেশকে চাপে ফেলার জন্য দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা অসম্ভব কিছু হবে না।'
স্পেসএক্স শেষ পর্যন্ত তারজির মতানুযায়ী "মহাকাশ অর্থনীতির ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি" হয়ে ওঠে কি না—তা সময় বলে দেবে। তবে ইলন মাস্ক নিশ্চিতভাবেই এমন বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন, যা এই তুলনার যথার্থতা নির্দেশ করে।
মহাকাশে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে চাওয়া দেশগুলোর জন্য এই সতর্কতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই ভারতের জন্য বিষয়টি এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ। একদিকে নীতি নির্ধারকরা জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের জন্য একটি স্বাধীন উৎক্ষেপণ ক্ষমতা বজায় রাখতে চান, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি দিন দিন বিশাল পরিসরের পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
স্পেসএক্সের সাথে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার কর্মী কাজ করছেন এবং কেবল ২০২৫ সালেই তারা প্রায় ১৬৫টি ফ্যালকন ৯ রকেট উৎক্ষেপণ করেছে।
অপরদিকে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রায় ১৬ হাজার কর্মী নিয়ে পরিচালিত ইসরো তার সম্পূর্ণ ৫৭ বছরের ইতিহাসে প্রায় ১০৫টি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করেছে। ভারত নিজেই দুইবার ফ্যালকন ৯-এর উৎক্ষেপণ সেবা গ্রহণ করেছে, অর্থাৎ শীর্ষ মহাকাশচারী দেশগুলোকেও মাঝে মাঝে এই মার্কিন জায়ান্টের দ্বারস্থ হতে হয়।
এই গবেষণা থেকে বেরিয়ে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা। গবেষকরা বারবার উল্লেখ করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খরচ কমার মূল কারণই হলো এই পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা। ভারত তার 'রিউজেবল লঞ্চ ভেহিকল' প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে এবং সফলভাবে কয়েকটি প্রযুক্তি প্রদর্শনীও সম্পন্ন করেছে। তবে কক্ষপথে পাঠানো যায় এমন কোনো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট এখনো ভারত চালু করতে পারেনি। তাদের পরিকল্পিত 'নেক্সট জেনারেশন লঞ্চ ভেহিকল'—যাকে একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে ভাবা হচ্ছে—তা এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে, ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'স্কাইরুট অ্যারোস্পেস' তাদের 'বিক্রম' সিরিজের রকেটের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে বাজার দখলের চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটি 'বিক্রম ১'-এর উড্ডয়ন মূল্য প্রকাশ করেনি। এটি তারা জুলাই মাসে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছিল। তবে তারা দ্রুত বর্ধনশীল ছোট উপগ্রহের বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করার আশা করছে।
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং বলেন, ভারতের মহাকাশ অর্থনীতি বর্তমানে থাকা প্রায় ৮ বিলিয়ন থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে আগামী এক দশকে ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
উৎক্ষেপণ সেবায় প্রতিযোগিতা বজায় রেখে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জন করা সম্ভব কি না, তা ভারতের মহাকাশ খাতের অন্যতম প্রশ্ন। তা না হলে এটি কেবল অধরা স্বপ্নই থেকে যেতে পারে।
তাই জাতীয় মহাকাশ দিবসে কেমব্রিজ ও তুরিনের এই বিশ্লেষণকে ইসরোর ওপর কোনো আক্রমণ হিসেবে না দেখে বরং একটি সচেতনতামূলক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ গবেষণাটি ভারতের অসাধারণ অর্জনগুলোকে অস্বীকার করে না। তবে এটি এতদিন ধরে লালন করা ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। গবেষকদের যুক্তি, উৎক্ষেপণের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এখন স্কেল বা মাত্রা, উৎক্ষেপণের ধারাবাহিকতা ও পুনঃব্যবহারযোগ্যতা ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ধারণ করে দিচ্ছে কক্ষপথের এই দৌড়ে কারা জয়ী হবে।
কম খরচে বেশি কাজ করে বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করা একটি সংস্থার জন্য এই বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট। ভারত হয়তো সীমিত বাজেটে প্রকৌশল বিদ্যায় এখনও পারদর্শী, কিন্তু বিশ্বের উৎক্ষেপণ বাজার যদি পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট এবং শিল্প-পর্যায়ের কার্যক্রম দ্বারা নতুন করে রূপ পায়, তবে ভারতের মহাকাশ গল্পের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য শুধু সাশ্রয়ী ভাবনাই যথেষ্ট নয়।
বরং কীভাবে রকেট তৈরি, উৎক্ষেপণ ও পুনর্ব্যবহার করা হবে, তার একটি মৌলিক পুনঃমূল্যায়ন প্রয়োজন। চলতি বছরে ইসরো এখনও তাদের প্রথম সফল রকেট অভিযানের অপেক্ষায় রয়েছে।
