ডেটা সেন্টারের নিরাপত্তায় চীনা যন্ত্রাংশ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারির পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার লক্ষ্যে চীনের নতুন মডেলের ডেটা সেন্টার যন্ত্রাংশ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার খসড়া তৈরি করছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) এমন একটি বিধিমালা প্রণয়নের কাজ করছে, যার আওতায় চীনে তৈরি নতুন অপটিক্যাল ট্রান্সসিভার আমদানি নিষিদ্ধ করা হবে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে ডেটা সেন্টারের ভেতরে ফাইবার-অপটিক কেবলের মাধ্যমে আলোর গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করা হয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা চলতি বছরের মধ্যেই এ বিধিমালা প্রকাশের আশা করছেন। কার্যকর হলে এটি নতুন চীনা অপটিক্যাল ট্রান্সসিভার আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলতি বছরই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে এবং ঘোষণার সাথে সাথেই তা কার্যকর হবে।
এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টার থেকে তথ্য চুরি করতে না পারে, ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার ইনস্টল করতে না পারে বা সেবায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। এসব ডেটা সেন্টারেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত চিপগুলো সংরক্ষিত থাকে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন এখনো এই বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনতে পারে, এমনকি পুরো পরিকল্পনাই স্থগিত রাখতে পারে। তা সত্ত্বেও এটি ট্রাম্প প্রশাসনের এমন এক ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ, যার মাধ্যমে অত্যাধুনিক মার্কিন শিল্পখাতে চীনা প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেওয়ার আগেই সীমিত করার চেষ্টা চলছে।
ওয়াশিংটন ডি.সি. ভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা বিকন গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের এআই নীতি বিশেষজ্ঞ দিব্যাংশ কৌশিক বলেন, "ট্রান্সিভারগুলো নিশ্চিতভাবেই ঝুঁকি তৈরি করে।" তিনি আরও যোগ করেন, "যেহেতু ডেটা সেন্টারের পরিসর ক্রমশ বাড়ছে, তাই একদম শুরু থেকেই ডেটা সেন্টার সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।"
খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কিন ট্রান্সিভার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো যারা এ পদক্ষেপের ফলে লাভবান বলে মনে করা হচ্ছে, তাদের শেয়ারের দাম বেড়েছে। লুমেনটাম, কোহেরেন্ট এবং অ্যাপ্লাইড অপ্টোইলেকট্রনিক্স-এর শেয়ারের দাম যথাক্রমে ৭ শতাংশ, ১১ শতাংশ এবং ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে চীন: দূতাবাস
হোয়াইট হাউস এবং এফসিসি এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, বেইজিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উভয় দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিযুক্ত আহ্বানে সাড়া দেওয়া এবং চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপবাদ দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি বন্ধ করার আহ্বান জানাচ্ছে।
দূতাবাসের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, চীনের স্বার্থে গুরুতর ক্ষতিসাধন করে এমন যেকোনো পদক্ষেপের জবাবে বেইজিং প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
চীনা ডেটা সেন্টার যন্ত্রাংশের নতুন মডেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি হলে তা সম্ভবত চীনের ঝোংজি ইনোলাইট-কে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সংস্থাটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ট্রান্সিভার বিক্রেতা। এটিকে গত জুন মাসে পেন্টাগনের কথিত 'চীনা সামরিক সহায়তাপুষ্ট' প্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
এই জাতীয় তালিকাটি সচরাচর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। তবে ইনোলাইট এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
এই নিষেধাজ্ঞা আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস-এর মতো আমেরিকান ক্লাউড ফার্মগুলোর খরচও বাড়িয়ে দিতে পারে, কারণ এটি তাদের যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক কোহেরেন্ট ও লুমেনটাম-এর মতো অন্যান্য উৎপাদকদের দিকে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করতে পারে।
প্রশাসনের চীন-বিরোধী কঠোর নীতির সমর্থকরা হুয়াওয়ের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে ব্যাকুল। কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত এই চীনা প্রতিষ্ঠানের তৈরি টেলিকম সরঞ্জাম মার্কিন অবকাঠামোতে এত গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে তা অপসারণের প্রচেষ্টা ছিল ধীরগতির, ব্যয়বহুল ও পূর্ণাঙ্গ নয়।
এফসিসি ঐতিহাসিকভাবে একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও, জুনে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ডেমোক্রেটিক ফেডারেল ট্রেড কমিশনের একজন সদস্যকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসহ সরকারের ওপর তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার ট্রান্সিভার বাজারে ইনোলাইটের সর্বোচ্চ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে।
ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান ইনোভেশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোহেরেন্ট এবং লুমেনটামের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো প্রযুক্তি থাকলেও চীনা সরবরাহকারীদের প্রতিস্থাপন করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা তাদের নেই। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ইনোলাইটের আয়ের ৯০ শতাংশ চীন থেকে নয়, বরং চীনের বাইরে থেকে আসে।
এডব্লিউএস, কোহেরেন্ট এবং লুমেনটামের কাছে মন্তব্যের অনুরোধ করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এফসিসি চীনা ড্রোন, রাউটার, রোবট এবং ইনভার্টারের ওপরও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
উক্ত বিধিনিষেধগুলোর ধারাবাহিকতায়, সংস্থাটি নতুন মডেলের সমস্ত অপটিক্যাল ট্রান্সিভার আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করবে এবং পরবর্তীতে চীন ছাড়া অন্যান্য অনেক অ-চীনা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে এই বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি প্রদান করবে । সংশ্লিষ্ট চারজন সূত্রের তিনজনই এমন তথ্য জানিয়েছেন।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কথিত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি এবং হুয়াওয়ে কর্তৃক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নজরদারি চালানোর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, যা হুয়াওয়ে অস্বীকার করে।
তবে গত বছর বিরল মৃত্তিকা খনিজের ওপর বেইজিংয়ের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
রয়টার্স ফেব্রুয়ারি মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়, মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ চীনের ওপর থেকে বেশ কিছু আমদানি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে, যার মধ্যে ডেটা সেন্টার সরঞ্জামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে চীন থেকে সম্ভাব্য কোনো ঝুঁকি আছে কি না, তা তদারকি করার ক্ষমতা এই বাণিজ্য বিভাগের রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ কিছুটা শান্ত হওয়ার পর তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তবে এফসিসি এগিয়ে এসেছে এবং কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত 'কাভার্ড লিস্ট'-এর মাধ্যমে যথাক্রমে ডিসেম্বর ও মার্চ মাসে ড্রোন এবং রাউটার নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে। যে সকল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পণ্য জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, সেগুলোর ভবিষ্যৎ সরঞ্জাম বিক্রয় রহিত করতেই এই তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। গত সপ্তাহে চীনা ইনভার্টার এবং রোবটের বিরুদ্ধেও অনুরূপ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
