পারমাণবিক চুল্লি শীতল করার পানি আনার জন্য দানিয়ুবের গতিপথ ঘোরাতে পাথরে বিস্ফোরণ ঘটাল রোমানিয়া
খরায় শুকিয়ে এসেছে দানিয়ুব নদী। তার ফলে রোমানিয়ার একমাত্র সচল পারমাণবিক চুল্লি (নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর) শীতল করার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তাই চুল্লি ঠান্ডা রাখার জন্য অত্যাবশ্যক পানির গতিপথ ঘুরিয়ে দিতে সোমবার নদীর বুকে জেগে থাকা একটি পাথরের চাঁইয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দেশটি।
এই নজিরবিহীন পদক্ষেপই বলছে, গোটা অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি সংকটের মাত্রা ঠিক কতটা তীব্র।
প্রতিবেশী দেশ হাঙ্গেরির পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। দানিয়ুবের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় তাদের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও ধুঁকছে। পারমাণবিক চুল্লি ঠান্ডা রাখার জন্য নদীর পানির ওপরেই নির্ভরশীল তারা। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই কেন্দ্র থেকে বড়জোর আর দুই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে হতে পারে।
প্রচণ্ড দাবদাহ ও খরায় ইউরোপের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে নদীগুলোর পানির স্তর নেমে গেছে। ফলে পানীয় জলের সরবরাহ, নৌ-যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ।
চাপ কমাতে গাড়ি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ
বিদ্যুতের চাহিদায় রাশ টানতে দুই দেশের সরকারই সাধারণ মানুষ ও কোম্পানিগুলোকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কাটছাঁট করতে বলেছে। রোমানিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইলি বলোজান জানিয়েছেন, রেনো-র মালিকানাধীন ড্যাসিয়া ও ফোর্ড-এর মতো গাড়ি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ১৯ আগস্ট পর্যন্ত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে রাজি হয়েছে। এতে স্বেচ্ছায় প্রায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।
বলোজান বলেন, 'মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে আমাদের আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ বেশ সীমিত। ফলে খরার কারণে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা আরও বেড়ে গেছে। আমাদের বিদ্যুৎ আমদানি করার সক্ষমতাও সীমিত।'
রোমানিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থা নিউক্লিয়ারইলেকট্রিকা দেশের মোট চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ বিদ্যুতের জোগান দেয়। কিন্তু নদীর পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গত সপ্তাহের শুরুতেই বাধ্য হয়ে তাদের দুটি চুল্লির মধ্যে একটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
সোমবার ওই সুনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে পানি ও পাথরের টুকরো ছিটকে ওঠে আকাশে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর ফলে একটি অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পথ প্রশস্ত হবে। ওই বাঁধের মাধ্যমে নদীর যে অংশে সচল চেরনাভোদা চুল্লিটি অবস্থিত, সেই চ্যানেলে আরও বেশি করে পানি যাবে।
নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবারের মধ্যেই এই কাজ শেষ হয়ে যাবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাদু মিরুতা বলেন, 'বুধ বা বৃহস্পতিবারের পর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যত দিন সচল থাকবে, ততটাই লাভ। কেন্দ্রটি একদিন সচল থাকার অর্থ হলো, এই গোটা অপারেশনের পেছনে যা খরচ হয়েছে, তার চেয়েও তিনগুণ বেশি সুফল উঠে আসা।'
হাঙ্গেরির সাময়িক স্বস্তি
দানিয়ুবের একটু উজানে হাঙ্গেরির পরিস্থিতিও বেশ উদ্বেগজনক। এর আগে তারা সতর্ক করেছিল, পরিস্থিতি সামাল দিতে রোববারই তাদের পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ করে দিতে হতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান হ্রাসকৃত উৎপাদন ক্ষমতায় কেন্দ্রটি সোমবার বা মঙ্গলবার পর্যন্ত চালু রাখা যাবে।
দুই গিগাওয়াট সক্ষমতাসম্পন্ন পাকস বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় অর্ধেক একাই জোগান দেয়। কিন্তু দানিয়ুবের পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে যাওয়ায় সোমবার কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ১০ শতাংশেরও কাছাকাছি নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগিয়ার বলেন, 'আজ এবং হয়তো আগামীকালও ২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী শেষ টারবাইনটি সচল রাখা সম্ভব হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি খুবই ভালো খবর। কারণ বিদ্যুতের চাহিদা যখন তুঙ্গে থাকবে, তখন অন্তত কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।'
সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাঙ্গেরির সাধারণ পরিবার ও বিভিন্ন কোম্পানি স্বেচ্ছায় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। ফলে রোববার বিদ্যুতের চাহিদা ৭০০ মেগাওয়াট কমেছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, এই পদক্ষেপের ফলে পাওয়ার গ্রিডের ওপর থেকে চাপ অনেকটাই লাঘব হয়েছে।
এদিকে সোমবার ওষুধ কোম্পানি রিখটার ঘোষণা করেছে, আগামী তিন সপ্তাহের জন্য তারা তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার ৫০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে দেবে। একইসঙ্গে তাদের নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত দৈনিক ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।
