‘আমাদের পিছু নেওয়া বন্ধ করুন’: বাড়ি ছাড়লেন মোদিকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা সেই কিশোরী ও তার মা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কথিত আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী ও তার বিধবা মাকে নয়ডার ভাড়া বাসা ছাড়তে হয়েছে বলে দাবি করেছেন ওই কিশোরীর মা।
তিনি বলেন, দশম শ্রেণির পড়ুয়া তার মেয়ে এ বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পর থেকে পুলিশ ও অপরিচিত লোকজন বারবার তাদের বাসায় আসছেন। তাই বাধ্য হয়ে দুই দিন আগে তারা বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
ওই নারী জানান, তার মেয়ে ক্ষমা চেয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীও তাকে ক্ষমা করেছেন। কিন্তু এরপরও তাদের পরিবারকে নিয়মিত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
তিনি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, 'আমি একাই মেয়েকে বড় করছি। ২০১৯ সালে আমার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। আমার ছোট ছেলে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে থাকে।'
তিনি আরও বলেন, 'নানা মানুষ আর পুলিশ বারবার আমাদের বাড়িতে আসছে, আমরা কীভাবে সেখানে থাকব?'
তিনি কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের পরিবারকে হয়রানি না করার আহ্বান জানান।
অভিযোগ রয়েছে, দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এক বিক্ষোভে ওই কিশোরী প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন। এ ঘটনায় নয়ডা পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
১ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কিশোরীটি ক্ষমা চেয়ে বলে, এটি ছিল তার 'প্রথম ও শেষ ভুল'।
সে আরও জানায়, বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত কয়েকজনের প্রভাবে সে এমন মন্তব্য করেছিল।
ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, 'আমি বিক্ষোভস্থলে ছিলাম। সেখানে অনেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে গালিগালাজ করছিল। তারা অন্যদেরও এসব বলতে উসকানি দিচ্ছিল। আমিও এমন কথা বলেছি—এ জন্য এতটাই লজ্জিত যে, মুখ তুলে তাকাতেও পারছি না। আমি পুরো জাতির কাছে ক্ষমা চাইছি। এটি আমার প্রথম ও শেষ ভুল।'
ওই শিক্ষার্থীর মা বলেন, তিনি ও তার মেয়ে আর তাদের ভাড়া বাসায় থাকতে পারছেন না।
তিনি বলেন, 'প্রতিবেশীরা আমাকে জানিয়েছেন, এখনও কালো রঙের গাড়িতে করে লোকজন আমাদের বাসায় আসছে। উত্তর প্রদেশ পুলিশও এখনও আমাদের বাসায় যাচ্ছে। আমি ও আমার মেয়ে অন্য একটি জায়গায় চলে এসেছি। সে মাত্র দশম শ্রেণিতে পড়ে, আমি নিজেও শিক্ষার্থীদের পড়াতাম। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, জানি না।'
এদিকে, ওই শিক্ষার্থীর বয়স নিয়েও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে।
জিরো এফআইআরে তার জন্মসাল ১৯৯৪ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার মায়ের দাবি, মেয়েটির বয়স ১৫ বছর এবং তার জন্ম ২০১১ সালে।
ওই নারী বলেন, '২০১০ সালে আমার বিয়ে হয়। আমার মেয়ের জন্ম ২০১১ সালে, আর ছেলের জন্ম ২০১৪ সালে। আমার মেয়ে এখনও শিশু। দয়া করে তাকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের আর সবার মতো স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে দিন।'
তিনি বলেন, 'ও একটি বড় ভুল করেছে এবং সে জন্য ক্ষমাও চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও তাকে ক্ষমা করেছেন। তাহলে মামলাটি নয়ডা থেকে দিল্লিতে কেন পাঠানো হলো? ভবিষ্যতে যদি দিল্লি পুলিশও আমাদের বাড়িতে এসে হয়রানি শুরু করে, তাহলে কী হবে?'
কী ঘটেছিল
গত সপ্তাহে নয়ডা পুলিশ ওই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং মানহানিসংক্রান্ত ধারায় একটি জিরো এফআইআর দায়ের করে। পরে সেটি দিল্লি পুলিশের কাছে পাঠানো হয়।
তবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, তারা এখনও নিয়মিত এফআইআর দায়ের করেনি এবং জিরো এফআইআরটিকেও নিয়মিত এফআইআরে রূপান্তর করা হয়নি।
পুলিশের সূত্রগুলো জানিয়েছে, মামলাটি আর এগিয়ে না–ও নেওয়া হতে পারে।
একটি সূত্র জানায়, 'যেহেতু এটি একটি জিরো এফআইআর, তাই এটি নিয়মিত এফআইআরে রূপান্তর নাও হতে পারে। মেয়েটিও ক্ষমা চেয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও আইনি মতামত নেওয়া হচ্ছে।'
সূত্রটি আরও জানায়, বিভিন্ন সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রকাশিত আপত্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
দিল্লি পুলিশের সাইবার সেল প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে করা আপত্তিকর মন্তব্যের ঘটনায় পৃথক একটি মামলা করেছে। সেই তদন্তও এখনও চলছে।
এর আগে ওই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশ দাঙ্গা, হত্যাচেষ্টাসহ দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলার অভিযোগে প্রায় ১৩টি এফআইআর দায়ের করে।
পরে সরকার আশ্বাস দেয়, যারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে এবং কোনো সহিংসতায় জড়িত ছিল না, তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
তবে যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অপরাধের রেকর্ড রয়েছে এবং যারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
