দেশে চাকরির সংকট, কর্মসংস্থানের আশায় জাপানে পাড়ি দিচ্ছেন দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা
দেশে ভালো চাকরির সংকটের কারণে কর্মসংস্থানের আশায় জাপানের দিকে ঝুঁকছেন দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা।
জাপানের উদ্যোক্তা মোয়ে কাসুগাই সিউলের ইয়োনসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার সময় লক্ষ্য করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার এই মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষে চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
এ কারণে ২০১৯ সালে তিনি কোরীয় চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে জাপানি নিয়োগদাতাদের সংযোগ স্থাপনের জন্য 'কোরেক' নামের একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেন।
গত মাসে সিউলে তার স্টার্টআপ 'কোরেক' আয়োজিত দুই দিনের চাকরি মেলায় ৩৫ বছর বয়সী কাসুগাই বলেন, 'তারা [দক্ষিণ কোরীয় তরুণরা] এত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও চাকরি খুঁজে পাচ্ছে না দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। অনেকেই জাপানি ভাষায় কথা বলতে পারে। তাই আমি ভেবেছিলাম, তারা জাপানে গেলে ভালো করবে। আমি তাদের সাহায্য করতে চেয়েছিলাম।'
দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা দীর্ঘদিন ধরে ভালো মানের এন্ট্রি লেভেলের চাকরির সংকটে রয়েছে। স্যামসাংয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগে বেশি আগ্রহী এবং অনেক বয়স্ক কর্মী এখনও নিজেদের চাকরিতে বহাল থাকায় নতুনদের জন্য সুযোগ কমছে।
অন্যদিকে, বয়স্ক জনসংখ্যার দেশ জাপানের কোম্পানিগুলো কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণভিত্তিক বড় নিয়োগ কর্মসূচিতে াংশ নেওয়ার প্রয়োজনীয় কর্মী জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে।
যদিও বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় গড় বেতন জাপানের তুলনায় কিছুটা বেশি, তবু জাপানে কোরীয় তরুণদের চাহিদা এবং কোরীয় তরুণদের জাপানে চাকরির আগ্রহ দুটোই বাড়ছে। আর তাই দক্ষিণ কোরিয়ার ওয়ান্টেড ল্যাব এবং জাপানের ল্যাপরাস চলতি বছর কোরেকের মতো একই ধরনের সেবা চালু করেছে।
প্রযুক্তি খাতে কর্মী নিয়োগে বিশেষায়িত এসব প্রতিষ্ঠান এর আগে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া মাইনাভির সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।
চলতি বছর দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে জাপানভিত্তিক অন্তত তিনটি চাকরি মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ক্যানন ইমেজিং সিস্টেমস ও আজবিলের মতো কোম্পানি কর্মী নিয়োগে অংশ নেয়।
জুনের সর্বশেষ মাসিক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ, যেখানে জাপানের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
কোরিয়া লেবার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, জাপানে কর্ম ভিসা পাওয়া বিদেশিদের বড় অংশ সাধারণত শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত। তবে দেশটিতে কর্মরত ৮০ হাজারের বেশি কোরীয় নাগরিকের অনেকে খুচরা বিক্রয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গেম উন্নয়ন খাতের মতো পেশাগত কাজে নিয়োজিত।
কোরিয়ার মানবসম্পদ উন্নয়ন সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত কর্মসূচির মাধ্যমে ২ হাজার ২৫৭ জন কোরীয় তরুণ জাপানে চাকরি নিয়েছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা ৪৭ শতাংশ বেড়েছে, ফলে বিদেশে কাজের জন্য জাপান তাদের প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ২৯ শতাংশ কমেছে।
কোরীয় মেধাবীদের মাধ্যমে জাপানের কর্মসংস্থানের ঘাটতি পূরণ
জাপানের অতীত ঔপনিবেশিক শাসন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মাঝে মাঝে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পৃক্ততা ক্রমে বাড়ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কোরীয় পুরুষ ও জাপানি নারীদের মধ্যে বিয়ের হার আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০২০ সালের তুলনায় তা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে কোরীয় নারী ও জাপানি পুরুষদের বিয়ের হার বেড়েছে ২৯ শতাংশ।
চলতি বছর রেকর্ডসংখ্যক দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক জাপান ভ্রমণ করেছেন।
কোরেক আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ১০০ জনের বেশি চাকরিপ্রার্থীর একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কিম সি-হিয়ন বলেন, 'জাপানে চাকরি খুঁজছেন আমার পরিচিত এমন বেশিরভাগ মানুষেরই আগে থেকেই সেখানে বসবাসের আগ্রহ ছিল।'
কিমের মতো অনেকেই জাপানি প্রতিষ্ঠানে কাজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগে আকৃষ্ট হচ্ছেন। কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নতুনদের এ ধরনের প্রশিক্ষণের সুযোগ দেয় না।
ডংগুক বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী কিম সি-হিয়ন বলেন, 'কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেয়, অন্যদিকে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও নতুন স্নাতকদের নিয়োগ করে।'
তিনি জানান, তিনি তথ্যপ্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে চাকরি খুঁজছেন।
হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের অধ্যাপক লি চ্যাং-মিন বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
তিনি বলেন, 'ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে কোরীয় প্রার্থীদের মান অত্যন্ত উচ্চ। কারণ বাস্তবিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জাপানি ভাষা ব্যবহার করতে পারেন, এমন বিদেশি প্রার্থীর সংখ্যা খুব বেশি নয়।'
জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জাইজের প্রধান তোমোয়া হাত্তোরি বলেন, তিনি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর জাতীয়তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তবে কোরীয় প্রার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব, দ্রুত কাজ করার সক্ষমতা ও নিষ্ঠা তাকে আকৃষ্ট করেছে।
চাকরি মেলায় তিনি বলেন, 'ভালো কোনো প্রার্থী পাওয়া গেলে আমরা তাকে নিয়োগ দিতে চাই।'
কর্মী ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
তবে বিদেশি কর্মী নিয়োগ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
কোরেকের কাসুগাই বলেন, অনেক কোরীয় কর্মী ক্যারিয়ারে উন্নতি ও ভালো বেতনের জন্য চাকরি পরিবর্তন করতে পছন্দ করেন। ফলে আজীবন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর্মী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, 'এটি জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অবশ্যই একটি বড় বাধা। তবে বর্তমানে তরুণ জাপানিরাও ক্রমেই বেশি চাকরি পরিবর্তন করছেন। তাই আমার মনে হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে।'
হানকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লির মতে, প্রশিক্ষণ দীর্ঘ হলে, নির্দিষ্ট দায়িত্বের বাইরে দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ কম থাকলে এবং পদোন্নতির গতি ধীর হলে বিদেশি কর্মীদের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
তবে একসময় কূটনীতিক হওয়ার কথা ভাবা এবং সাবলীল কোরীয় ভাষায় কথা বলা কাসুগাইয়ের কাছে এই কর্মী নিয়োগের উদ্যোগের আরও গভীর উদ্দেশ্য রয়েছে।
তার মতে, এর মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, '(কোরীয়) মানুষ যখন সেখানে [জাপানে] গিয়ে কাজ করেন, তখন এমন জাপানি সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়, যাদের হয়তো আগে কোনো কোরীয় বন্ধু ছিল না বা কোরীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না।'
