প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে রাজনৈতিক উত্থান, আজ সেই ইস্যুতেই তোপের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান
সাল ১৯৯৭। ওড়িশায় তখন কংগ্রেসের শাসন এবং মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জানকী বল্লভ পট্টনায়েক। ভুবনেশ্বরে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে রাজ্য সচিবালয়ের সামনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিলেন। তাদের বিক্ষোভের কারণ ছিল পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস। শিক্ষার্থীদের সেই দলে একজন বিশেষ তরুণ ছিলেন, যিনি আজকের ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী—ধর্মেন্দ্র প্রধান।
'দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) একজন ছাত্রনেতা হিসেবে জানকী পট্টনায়েকের সরকারের বিরুদ্ধে ভুবনেশ্বরের রাজপথে নেমেছিলেন।
প্রতিবেদনটিতে প্রধানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বরাতে বলা হয়েছে, তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে দুইবার এবিভিপি-র সর্বভারতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
'দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' জানায়, ১৯৯৭ সালে ওড়িশায় একটি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। সে সময় প্রধান এবিভিপি-র সর্বভারতীয় সম্পাদক ছিলেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন।
ভুবনেশ্বরের আরএমডি ডিগ্রি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ এবং উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানের অনুজ প্রশান্ত রাউত সেই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করেছেন। ওই সংবাদপত্রকে তিনি বলেন, 'আমরা সচিবালয়ের সামনে ওড়িশা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিলাম। আমাদের সাথে প্রায় ১৫০০ শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছিল।'
রাউতের বর্ণনা অনুযায়ী, পুলিশের মারমুখী অবস্থানের আগে পর্যন্ত আন্দোলনটি শান্তিপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, 'আমরা বেশ আতঙ্কিত ছিলাম। ওই সময় প্রধানকে খুব মারধর করা হয়েছিল। তার শরীরের কয়েকটি হাড়ও ভেঙেছিল।'
রাউতের মতে, সেই সময় ক্যাম্পাস নির্বাচনগুলো রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে প্রায়ই সহিংস হয়ে উঠত। তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্বাচনে প্রধানের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় 'জনতা দল'-এর সমর্থকরা তার ওপর হামলা চালিয়েছিল। সেই ঘটনার কথা মনে করে রাউত বলেন, 'তিনি আজ কেবল ভাগ্যের জোরেই বেঁচে আছেন।'
ছাত্র রাজনীতির সেই বছরগুলোই বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রধানের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কয়েক দশক ধরে ওড়িশাজুড়ে বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তারে প্রধান বড় ভূমিকা রেখেছেন। সেই প্রচেষ্টারই প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৪ সালে, যখন রাজ্যটিতে নবীন পট্টনায়েকের বিজু জনতা দলের দুই দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠন করে।
বর্তমানে নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে চলা বিতর্কের কারণে ১৯৯৭ সালের সেই আন্দোলনের স্মৃতি আবারও সামনে এসেছে।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে দিল্লিতে আন্দোলনরত হাজারো শিক্ষার্থী পুলিশের বাধার মুখে পড়েছেন। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের কারণে অন্তত ১০০ জন শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এমনকি পুলিশের নির্যাতনে আহত হয়ে ২১ বছর বয়সী এক তরুণী একটি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিরোধী দলগুলো এখন নিট ইস্যুতে আলোচনার আগে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে যুক্তি দিয়েছেন যে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করার পরই কেবল এই অনিয়ম নিয়ে সুষ্ঠু আলোচনা সম্ভব।
তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সিনিয়র বিজেপি নেতা জেপি নাড্ডা বলেছেন, সরকার এ বিষয়ে আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং তাদের লুকানোর কিছু নেই।
