‘এখনো বেঁচে আছি’: ২৬ দিনের অনশনে ১১ কেজি ওজন কমল সোনম ওয়াংচুকের
২৬ দিন ধরে অনশনে থাকা ভারতীয় অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক জানিয়েছেন যে তার ওজন ১১ কেজি কমলেও তিনি 'এখনো বেঁচে আছেন'। ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থনে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে তিনি প্রধান অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।
জনপ্রিয়ভাবে 'সোনম স্যার' নামে পরিচিত ওয়াংচুককে গত শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সেখান থেকেই অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে গত সোমবার সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় পুলিশের বর্বর হামলার পরও প্রতিবাদস্থলে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হচ্ছেন। ওই সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হন।
অনশনে থাকা ওয়াংচুকের শরীর ক্রমেই ভেঙে পড়ায় তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। হাসপাতালে নেওয়ার আগে দিল্লির তীব্র গরমে টানা ২১ দিন কেবল লবণ আর পানি খেয়ে কাটিয়েছেন তিনি। বুধবার গুরুগ্রামের মেদান্ত হাসপাতাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই অধিকারকর্মীকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল তার চিকিৎসা করছে। বর্তমানে তার অবস্থা স্থিতিশীল। তার সম্মতি অনুযায়ীই যাবতীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।'
ওয়াংচুকের শর্ত
বুধবার সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ বিরোধী দলের এমপি, অধিকারকর্মী ও তারকারা সোনম ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা তাকে দেখতে গিয়ে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নাড্ডা বলেন, 'আমরা তার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছি। আমরা তাকে অনশন ভেঙে মূলধারায় ফিরতে এবং সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালনা করার অনুরোধ করেছি।' তিনি আরও জানান যে ওয়াংচুকের তোলা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে সরকার প্রস্তুত।
তবে সব অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন ওয়াংচুক। বুধবার রাতে হাসপাতালের বিছানা থেকে দেওয়া তিন মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, 'সরকারি দলের মন্ত্রীসহ অনেক নেতা আমাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ করেছেন। আমিও সেটি চাই কারণ আমার কাজ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।'
তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকার যদি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের বলপ্রয়োগ বা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তবেই তিনি অনশন ভাঙবেন। ওয়াংচুক বলেন, 'যদি দ্রুত সেই নিশ্চয়তা পাই, তবে আমি আজই অনশন ভেঙে দেব। তা না হলে দুর্ভাগ্যবশত আমাকে এটি চালিয়ে যেতে হবে।'
সোমবারের পুলিশি হামলার সময় শিক্ষার্থীদের আচরণের প্রশংসা করে তিনি বলেন, 'আমি সেই সব শিক্ষার্থীদের স্যালুট জানাই যারা অসীম ধৈর্য দেখিয়েছে। লাঠিচার্জের শিকার হয়েও তারা পাল্টা আক্রমণ করেনি। তাদের ওপর এমন বর্বরতা দেখে আমি অনশন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
ওয়াংচুকের বিবৃতিতে বা মন্ত্রীদের দেওয়া চিঠিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের কথা সরাসরি না থাকলেও সিজেপি জানিয়েছে এই দাবি থেকে তারা সরবে না। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, 'প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলবে। আমরা সোনম স্যারের অনশন এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া হামলা বৃথা যেতে দেব না।'
শিক্ষার্থীরা বারবার প্রশ্ন ফাঁসের জন্য ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়ী করে তার পদত্যাগ দাবি করছেন।
গত সোমবার সংসদের বর্ষা অধিবেশন শুরুর দিনে সিজেপি-র সংসদ অভিমুখী পদযাত্রায় ব্যাপক হামলা চালায় পুলিশ। পুলিশ লাঠি ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে আক্রমণ করলে অন্তত ৬০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে তাদের অধিকাংশকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের মঞ্চ ও তাবু ভেঙে দিলেও আন্দোলনকারীরা দিনরাত সেখানে অবস্থান করছেন। বুধবার থেকে দিল্লির অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, যন্তর মন্তরে মানুষের পৌঁছানো ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সিজেপি এবং মোদি সরকারের অবস্থান
একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া সিজেপি-র অনুপ্রেরণা ছিল ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য। তিনি বেকার যুবকদের 'ককরোচ' বা তেলাপোকা বলে অভিহিত করেছিলেন। সোমবারের বিশাল জমায়েত প্রমাণ করেছে যে সিজেপি এখন একটি বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
ওয়াংচুকের অনশন ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন। পুলিশ রাহুল গান্ধীকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট দিয়েছেন মোদি। সেখানে তিনি লিখেছেন, 'আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যারা আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করবে তাদের রেহাই দেওয়া হবে না।'
