গণবিক্ষোভের মুখে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডারকে বরখাস্ত করলেন জেলেনস্কি
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডারকে বরখাস্ত করেছেন ভলোদিমির জেলেনস্কি। কয়েক দিন ধরে তার অপসারণের দাবিতে চলা গণবিক্ষোভের পর জনগণের চাপের মুখে নতি স্বীকার করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার গভীর রাতে জানান, ২০২৪ সাল থেকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আসা ৬০ বছর বয়সী জেনারেল ওলেক্সান্দর সিরস্কির পরিবর্তে তিনি যৌথ বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতিকে নতুন প্রধান কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছেন।
ইউক্রেনের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া সন্ধ্যার ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, 'মিখাইলো, ইয়েভহেনি খমারা এবং পাভলো পালিসার সঙ্গে আমরা একমত হয়েছি যে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের কাঠামো কীভাবে পুনর্গঠন করা উচিত।'
তিনি আরও বলেন, বিদায়ী সেনাপ্রধানের সঙ্গে তিনি 'দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যেন নির্বিঘ্ন হয়'—সে বিষয়েও আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, 'সব সিদ্ধান্ত আগামীকাল আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে।'
মেজর জেনারেল দ্রাপাতি তাকে প্রধান কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য জেলেনস্কিকে ধন্যবাদ জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, 'আমি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে, পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে এবং আজ যারা আমাদের দেশকে রক্ষা করছেন তাদের প্রতি সম্মান রেখে কাজ করব।'
জেনারেল সিরস্কির অপসারণ এবং জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে হাজারো মানুষ কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।
প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক কৌশল নিয়ে তার অবস্থানের সঙ্গে জেনারেল সিরস্কি এবং সেনাবাহিনীর পুরোনো নেতৃত্বের বিরোধের জেরে গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই ফেদোরভকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর থেকে বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবনের বাইরে প্রতিদিন ফেদোরভের সমর্থনে বিক্ষোভ করে আসছিলেন। তার অপসারণের প্রতিবাদে দুইজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন এবং সামরিক বাহিনীর অনেক কর্মকর্তার সমর্থনও তিনি পেয়েছেন।
৩৫ বছর বয়সী সাবেক এই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে আধুনিকায়নের সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কিয়েভের বাহিনীর অবস্থান আমূল উন্নত করার কৃতিত্ব পেয়েছেন।
অন্যদিকে, জেনারেল সিরস্কি ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, কারণ সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে তিনি একটি সোভিয়েত ধাঁচের পরিচালনা কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করেন এবং অতিরিক্ত প্রাণহানিকর কৌশল ব্যবহার করেন।
অক্ষয়িষ্ণু ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পদ্ধতির জন্য তাকে 'কসাই' ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল। তার কারণে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত চলা রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘায়িত বাখমুতের যুদ্ধে ইউক্রেনের সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
বরখাস্ত হওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ফেদোরভ অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনীতে তার সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে জেনারেল সিরস্কি বাধা সৃষ্টি করেছিলেন।
এসব সংস্কারের মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতি নির্মূল করা এবং বিতর্কিত সেনা সমাবেশ ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন করা।
জেনারেল সিরস্কিকে উদ্দেশ করে ফেদোরভ বলেন, 'রাশিয়াকে অপ্রচলিত উপায়ে কীভাবে পরাজিত করা যায়—যেটি প্রধান কমান্ডারের দায়িত্ব—সেটির পথ খোঁজার বদলে তিনি আমাদের দেশকে বিভক্ত করার পথ খুঁজে বের করেছেন।'
এ সময় তিনি আবারও সিরস্কির পদত্যাগের দাবি জানান।
জেলেনস্কি বলেন, দুই কর্মকর্তার মধ্যে তাকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। তার দাবি, পরিস্থিতি এমন ছিল যে তারা প্রায় একই কক্ষে একসঙ্গে থাকতেও পারতেন না।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'যুদ্ধকালীন সময়ে একজন প্রেসিডেন্টকে এমন পরিস্থিতিতে কাউকে বেছে নিতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়, সত্যি বলতে।'
কয়েক দিন নীরব থাকার পর সোমবার জেনারেল সিরস্কি প্রকাশ্যে ফেদোরভের কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ রয়েছে—এটি জানতে পেরে তিনি 'বিস্মিত' হয়েছিলেন।
তিনি সামরিকবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিলিতারনি-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেখেন, 'আমাদের সম্পর্ককে আমি সব সময় কাজের সম্পর্ক হিসেবেই দেখেছি—যেখানে জটিল বিষয় এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ছিল।'
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, 'একটি বড় যুদ্ধ চলাকালে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক এমনই হওয়া উচিত।'
নতুন প্রধান কমান্ডার বরখাস্ত মন্ত্রীর প্রশংসা করেছিলেন
সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ এ সপ্তাহে জানায়, নতুন প্রধান কমান্ডার নিয়োগের আগে জেলেনস্কি প্রায় ১১ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর একটি তালিকা পর্যালোচনা করেছিলেন।
এই তালিকায় ছিলেন বিমান হামলা প্রতিরোধ বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওলেহ আপোস্তল এবং জেনারেল স্টাফের উপপ্রধান মেজর জেনারেল ভলোদিমির হোরবাতিউকও।
৪৪ বছর বয়সী মেজর জেনারেল দ্রাপাতি, যার সঙ্গে টানা দুই দিনে দুবার বৈঠক করেছিলেন জেলেনস্কি, এর আগে ফেদোরভের সংস্কার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছিলেন।
গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, 'যেসব সমস্যা উপেক্ষা করতে এই ব্যবস্থা অভ্যস্ত হয়ে গেছে, সেগুলো সমাধানের জন্য ফেদোরভ যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি আরও লেখেন, 'সামরিক বাহিনীর পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো পরিবর্তনেরই অর্থ থাকবে না সেই মানুষদের কাছে, যারা প্রতিদিন নিজেদের কাঁধে এই যুদ্ধের ভার বহন করছেন।'
দ্রাপাতিকে নতুন প্রধান কমান্ডার হিসেবে অভিনন্দন জানিয়ে ফেদোরভ টেলিগ্রামে লেখেন, 'এটি স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইরত স্বাধীন মানুষের সংগ্রামে নতুন বাতাস এবং নতুন আশার সঞ্চার করবে। এটি সেই পরিবর্তনের কণ্ঠস্বর, যাকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।'
জেলেনস্কি তার সন্ধ্যার ভাষণে আরও জানান, ইউক্রেনের প্রযুক্তি খাত তদারকির জন্য একটি 'গুরুত্বপূর্ণ' পদ তিনি ফেদোরভকে প্রস্তাব করেছেন।
তবে জানা গেছে, ফেদোরভ এখনো সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
ইউক্রেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সাবেক এই প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন যে তিনি কেবল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদেই পুনর্বহাল হলে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন।
গত সপ্তাহ থেকে ওই পদে দায়িত্ব পালন করছেন ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইয়েভহেনি খমারা।
