২০২২ সালের পর আর দেখা যায়নি—মিয়ানমারের কারাবন্দি নেত্রী সু চি কি মারা গেছেন?
তায়েচিতো সব সময় ছায়ার মতো অং সান সু চি-র সঙ্গে থাকত। কিন্তু পাঁচ বছর আগে সামরিক জান্তা যখন সু চির সরকার উৎখাত করে তাকে জেলে পাঠায়, তখন কুকুরটিকে তার সঙ্গে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
গত মাসে সাবেক রাজধানী ইয়াঙ্গুনে সু চির বাড়িতে ১৫ বছর বয়সে কুকুরটি মারা যায়। দেশি কুকুরটি শেষ দিন পর্যন্ত মালিকের ফেরার অপেক্ষায় ছিল। এর আগে ২০১০ সালে সু চি যখন কারামুক্ত হন, তখন ছেলে কিম অ্যারিস তাকে কুকুরটি উপহার দিয়েছিলেন।
তবে অ্যারিসের এখন এর চেয়েও বড় চিন্তা হলো: তার বয়স্ক মা নিখোঁজ। গত কয়েক মাস ধরে পুরো বিশ্ব চষে বেড়াচ্ছেন অ্যারিস। বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীর কাছে তদবির করছেন, তারা যেন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের কাছে সু চির 'জীবিত থাকার প্রমাণ' দাবি করেন।
অং সান সু চির বর্তমান বয়স ৮১ বছর। ২০২২ সালের শেষদিকে এক লোকদেখানো বিচারকার্য সমাপ্তির দিনে তাকে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। তারপর থেকে সেনাবাহিনী তার আইনজীবীদেরও দেখা করার অনুমতি দেয়নি।
গত কয়েক বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির কারাগারগুলোতে সু চিকে দেখতে পাওয়ার কিছু খবর টুকটাক কানে এলেও সেগুলো যাচাই করা অসম্ভব।
এ বছরের এপ্রিলে সামরিক সরকার দাবি করে, অং সান সু চিকে তারা গৃহবন্দি করে রেখেছে। কিন্তু কূটনীতিকরা বারবার তার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানালেও তা নাকচ করা হয়েছে।
কূটনীতিকরা যখন সু চির অবস্থা জানতে চেয়ে চাপ দেন, তখন সরকারের কর্মকর্তারা বরাবরের মতোই উত্তর দেন যে তিনি সুস্থ আছেন। তবে এর বাইরে তারা আর কিছু বলেননি।
কথিত গৃহবন্দি হওয়ার সময় প্রকাশিত এক ছবিতে দেখা যায়, অচেনা একটি ভবনের ভেতর একজন পুলিশ ও একজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন সু চি।
তবে ছবিটি যে সাম্প্রতিক, তার কোনো প্রমাণ নেই। অ্যারিসও এর সত্যতা নিয়ে সন্দিহান।
সু চির ছেলে বলেন, তার মা যদি সত্যিই গৃহবন্দি হয়ে থাকেন, তবে তা ইয়াঙ্গুনের বাড়িতে নয়। আর নতুন রাজধানী নেপিদো-তে তার যে বাড়িটি ছিল, সেটি আগেই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং গত মার্চে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। সম্প্রতি অন্তত দুবার তাকে সু চির বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে।
গত মাসে দিল্লিতে হ্লাইংয়ের সঙ্গে আলোচনার সময় সু চির প্রসঙ্গটি তোলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর মে মাসে মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ এই জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সু চির সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিতে অনুরোধ করেছিলেন। ওই আলোচনাগুলোর বিষয়ে অবগত কূটনীতিকরা জানান, সু চির নাম শুনলেই জেনারেল ক্ষুব্ধ হয়ে জবাব দেন।
এসব আলোচনা সম্পর্কে অবগতদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, অভ্যুত্থান-নেতার এই রূঢ় প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে এই যে, তিনি সু চির জীবিত থাকার প্রমাণ দেখাতে পারবেন না। কারণ এই নেত্রী হয়তো মারা গেছেন; অথবা তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
তবে অন্যরা এ ব্যাপারে সন্দিহান। লন্ডনের থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস বলেন, 'এমন একটা খবর চেপে রাখা অসম্ভব।'
এক রাষ্ট্রদূত মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি জেনারেলের তীব্র বিদ্বেষই হয়তো তাকে বহির্বিশ্ব থেকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কারণ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বারবার জান্তা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সু চির খবর জানতে চেয়েছেন। গত ১২ জুলাই ব্যাংককের বৈঠকেও প্রসঙ্গটি জোরালোভাবে উঠেছিল।
সামরিক সরকার আবারও আসিয়ানে পূর্ণ সদস্যপদ ফিরে পেতে চায়। অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারকে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো থেকে বাদ দিয়েছিল আসিয়ান।
জেনারেলরা জাতিসংঘেও তাদের আসন ফেরত চান। অভ্যুত্থানের পর থেকে নিউইয়র্কে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করছেন ক্ষমতাচ্যুত বেসামরিক সরকারেরই এক প্রতিনিধি। কূটনীতিকদের ধারণা, সু চিকে মুক্তি দিলে কিংবা শুধু তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দিলেও এই দুই আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে জান্তা সরকারের বরফ গলে যেত।
তবে এই দুটির যেকোনো একটি পদক্ষেপ নিলেও মিয়ানমারের ভেতর কী ঘটবে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সু চি বরাবরই অহিংস আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশজুড়ে জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এমনকি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মান নৃগোষ্ঠীর বিপ্লবীদের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে।
কিন্তু বার্মান জাতীয়তাবাদী সু চি ক্ষমতায় থাকাকালীন সংখ্যালঘুদের চরম অবহেলা করেছিলেন। ফলে বহু সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে যুক্ত এক বিদেশি কূটনীতিকের মতে, সু চিকে মুক্তি দেওয়াটাই হবে 'এদের মধ্যকার ঐক্য ভেঙে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়'।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মানদের ওপর সু চির এখনো প্রবল প্রভাব রয়েছে। তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে এখনো তার প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে চলেছেন। গত ১৯ জুন তার ৮১তম জন্মদিনে সমর্থকরা অত্যন্ত সন্তর্পণে দিনটি উদযাপন করেছেন। সু চির পক্ষ থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অন্নদান করার অপরাধে পুলিশ তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির এক সদস্যকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করেছে।
তবে অং সান সু চির এই সংকট নিয়ে অতিরিক্ত কূটনৈতিক মাতামাতির কারণে মিয়ানমারের নিপীড়িত সাড়ে ৫ কোটি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আড়ালে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্সের তথ্য অনুযায়ী, জান্তা সরকারের কারাগারে এখনো ১৪ হাজার ৫১৭ জন রাজনৈতিক বন্দি আছেন। কারাগারে চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক, আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যেও কোনো ফ্যান বা এসির ব্যবস্থা নেই। শুধু চলতি বছরেই কারা হেফাজতে থাকা ৬০ জনেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
