জার্মানিতে ফোনে ‘সিক লিভ’ নেওয়া বাতিল, অসুস্থতার প্রথমদিনই প্রমাণপত্র সংগ্রহে যেতে হবে ডাক্তারের কাছে
চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, অসুস্থতার প্রথম দিনেই জার্মানির কর্মীদের সশরীরে ডাক্তারের কাছে গিয়ে 'সিক নোট' বা অসুস্থতার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে হবে।
জার্মানির স্থবির অর্থনীতিতে গতি আনতেই এই কঠোর নিয়মের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগে কর্মীরা শুধু ডাক্তারকে ফোন করেই সিক নোট পেয়ে যেতেন। তাছাড়া ছুটির তৃতীয় দিনের আগে সেই নোট দেখানোর বাধ্যবাধকতাও ছিল না। নতুন ঘোষণা অনুসারে সেই নিয়ম আর থাকছে না।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সাংবাদিকদের বলেন, 'অসুস্থতাজনিত ছুটির সংখ্যা অনেক বেশি। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছি, যাতে কর্মী ও কোম্পানি—উভয় পক্ষই এই অবস্থার সংশোধন করতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা জানি সিদ্ধান্তটি কঠিন। কিন্তু কাজ থেকে দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে আমরা প্রতিযোগিতার বাজারে যে পিছিয়ে পড়ছি, তা আর মেনে নেওয়া যায় না।'
মালিকপক্ষ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও ক্ষুব্ধ হয়েছে জার্মানির ক্ষমতাধর ট্রেড ইউনিয়নগুলো। সেবা খাতের ইউনিয়ন ভের্ডি-র প্রধান ফ্রাঙ্ক ভের্নেকে সরাসরি মের্ৎসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, চ্যান্সেলর মূলত 'কর্মীদের প্রতি অবিশ্বাসের সংস্কৃতি' তৈরি করছেন।
চিকিৎসকরাও এই পরিবর্তনের বিরোধী। তাদের আশঙ্কা, নতুন নিয়মের কারণে জার্মানির সাধারণ চিকিৎসকদের (জিপি) চেম্বারে অপ্রয়োজনীয় রোগীর ঢল নামবে।
প্রস্তাবটিকে 'চরম বিপর্যয়' আখ্যা দিয়ে জার্মান অ্যাসোসিয়েশন অভ ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানস বলেছে, 'যাদের সশরীরে চিকিৎসার কোনো দরকারই নেই এবং বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নেওয়াই যাদের জন্য সবচেয়ে ভালো—এমন রোগীতেই আমাদের চেম্বার ভরে যাবে।'
জার্মানরা বছরে গড়ে প্রায় তিন সপ্তাহ বা ১৫ কর্মদিবস অসুস্থতাজনিত ছুটি নেন। ফ্রান্স বা অন্যান্য নর্ডিক দেশের তুলনায় এই সংখ্যা কম হলেও সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড ও ইতালির চেয়ে তা বেশি।
গত বছর ব্রিটেনে কর্মীরা অসুস্থতা বা আহত হওয়ার কারণে ছুটি নেওয়ায় প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে—যা মোট কর্মঘণ্টার ২ শতাংশ; অর্থাৎ কর্মীপ্রতি গড়ে চার দিনের বেশি ছুটি।
অসুস্থতাজনিত ছুটির ওপর মের্ৎসের এই খড়গ একটি বড় সংস্কার প্যাকেজের অংশ। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও জার্মানির সরকারি কোষাগারকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।
মের্ৎসের মধ্য-ডানপন্থি দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন ও তাদের জোটসঙ্গী বামপন্থি সোশ্যাল ডেমোক্রেট পার্টির মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পরই এই রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে।
এ প্যাকেজের অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটানো। এছাড়া জার্মানদের অবসর ও পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। আগামী কয়েক দশকে এই বয়স ৬৭ থেকে বেড়ে ৭০-এ গিয়ে ঠেকতে পারে।
পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষদের জন্য কর ছাড়ের ঘোষণাও দিচ্ছেন মের্ৎস। এই ঘাটতি মেটাতে আড়াই লাখ ইউরোর বেশি আয়ের ওপর চাপানো হবে চড়া কর।
ডাচ ব্যাংক আইএনজি-র অর্থনীতিবিদ কারস্টেন ব্রজেস্কি বলেন, 'অনেকে যতটা আশা করেছিলেন তার চেয়ে হয়তো একটু বেশিই সময় লেগেছে, কিন্তু জার্মানিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সংস্কারের হাওয়া অবশেষে বইতে শুরু করেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এই প্যাকেজ রাতারাতি কোনো স্থবির অর্থনীতিকে রমরমা অবস্থায় নিয়ে যাবে না ঠিকই। তবে এটি ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত এবং একটি মজবুত কাঠামো ঠিকই তৈরি করতে পারে।'
