কাতার, সৌদি আরবের কাছে বিক্রি হয়েছে অত্যাধুনিক ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম: নথিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য
আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও— কাতার ও সৌদি আরবের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উন্নত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের কমব্যাট হেলমেটসহ অত্যাধুনিক ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা হয়েছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া বেশ কিছু গোপন নথিপত্র এবং আলোকচিত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ইসরায়েলের প্রথম সারির দৈনিক 'হারেৎজ'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কাতারের সঙ্গে অনৈতিক ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে তৈরি হওয়া বিতর্কিত 'কাতারগেট' কেলেঙ্কারির তীব্রতা আড়াল করার চেষ্টা করতে গিয়ে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটিকে একটি "জটিল দেশ" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে অন্যান্য সময়ে তিনি কাতারকে 'সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র' হিসেবে চিহ্নিত করার লক্ষ্যে আনা আইনের পক্ষে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিলেন, এবং কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থানরত হামাসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে হামলার নির্দেশও দিয়েছিলেন।
কাতারের এই 'জটিল' বা দ্বিমুখী আচরণের প্রতিফলন ঘটেছে ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির গোপন বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। এর আওতায়, কাতারে অত্যাধুনিক ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রপ্তানি করা হয়েছে; যার মধ্যে কাতারের আমিরের সুরক্ষায় নিয়োজিত বিশেষ প্রযুক্তিও রয়েছে। গত বছর কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি যখন ইরানের রাজধানী তেহরান সফরে যান, তখন তাঁর ব্যবহৃত বিশেষ বিমানে ইসরায়েলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'এলবিট সিস্টেমস'-এর তৈরি একটি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোর মতো 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস' বা আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য ও ব্যাপক নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখলেও, কাতার ও সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
গত বছরের জুনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম 'মারিভ' এক প্রতিবেদনে জানায়, কাতারের সঙ্গে ১০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের প্রতিরক্ষা চুক্তির অনুমোদন দিয়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এর আগে 'হারেৎজ ও হিব্রু ভাষার ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য মার্কার যৌথ অনুসন্ধানে প্রকাশ করেছিল যে, একটি প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান কাতারের সঙ্গে আলোচনায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সংস্থা 'রাফায়েল' এবং 'এলবিট সিস্টেমস'-এর প্রতিনিধিত্ব করেছিল। কাতার ও নেতানিয়াহুর সহযোগীদের মধ্যকার অনৈতিক লেনদেনের তদন্তে, সন্দেহভাজনদের তালিকায় থাকা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং অবসরপ্রাপ্ত আইডিএফ মেজর জেনারেল ইয়োভ (পলি) মোর্দেচাই এই মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের অংশীদার। তারা 'ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ'-এর সঙ্গেও কাতারে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চালিয়েছিলেন। পরে আগস্ট মাসে 'ক্যালকালিস্ট' রিপোর্ট করে যে, ২০১৮ সাল থেকে কাতারের রাজপরিবারের ব্যবহৃত বিমানের সুরক্ষায় এলবিট সিস্টেমসের প্রযুক্তি বিক্রির চুক্তিগুলো থেকে মোর্দেচাই এবং তাঁর অংশীদার ব্রোকারেজ ফি বাবদ লাখ লাখ ডলার আয় করেছেন।
কাতারের রাজকীয় বিমান বহরে মোট ১১টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যা মূলত দেশটির আমির ও প্রধানমন্ত্রী তাঁদের বিদেশ সফরে ব্যবহার করেন। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই বিমানগুলোর আলোকচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে তিনটি বিমানে—দুটি বোয়িং ৭৪৭ এবং একটি এয়ারবাস এ৩৪০-৫০০ বিমানে—এলবিট সিস্টেমসের তৈরি 'সি-মিউজিক' সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে। ইসরায়েলে এই প্রযুক্তিটি 'মাগেন রাকিয়া' নামে পরিচিত। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে যখন বিমানগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছিল, ঠিক তখনই এই ডিফেন্স সিস্টেমগুলো স্থাপন করা হয়।
এই অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি মূলত বিমানের পেছনের নিচের অংশে স্থাপন করা হয়। এটি মাটি থেকে নিক্ষেপকরা তাপসন্ধানী ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে পারে, এবং তৎক্ষণাৎ একটি ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি নির্গত করে ক্ষেপণাস্ত্রটির লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষমতা (লক-অন) ব্যাহত বা অকার্যকর করে দেয়। কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের (ম্যানপ্যাডস) হুমকি রোধে এটি বিশেষভাবে কার্যকর। ২০০২ সালে কেনিয়ার মোম্বাসা থেকে উড্ডয়ন করা ইসরায়েলি উড়োজাহাজ সংস্থা 'আর্কিয়া'-এর একটি যাত্রীবাহী বিমানকে লক্ষ্য করে দুটি কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়। ওই ঘটনার পর এই 'মিউজিক' সিস্টেমটি তৈরি করা হয়। এলবিট সিস্টেমস তাদের এই বিশেষ সিরিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ইসরায়েলি এয়ারলাইন্সের যাত্রীবাহী বিমান, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় বিমান 'উইং অব জায়ন', ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত বিমানসহ বিশ্বের বহু ভিআইপি বিমানে স্থাপন করেছে।
কাতারের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তির সঠিক আর্থিক অঙ্ক কঠোর গোপনীয়তার কারণে জানা যায়নি। তবে গত বছর জার্মানির বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমানে একই ধরনের 'জে-মিউজিক' সিস্টেম স্থাপনের জন্য ২৬ কোটি ডলারের একটি চুক্তি সই করে এলবিট। এছাড়া ডাচ ও অস্ট্রিয়ান বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমানে একই ধরনের সিস্টেম ইনস্টল করার জন্য আরেকটি ১৭ কোটি ডলারের চুক্তি করে প্রতিষ্ঠানটি। এর আগের দশকে সংস্থাটি ন্যাটোর ট্যাংকার বিমান বহরেও অনুরূপ সিস্টেম স্থাপন করেছিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষাদপ্তর পেন্টাগন ও বোয়িং-এর মধ্যকার একটি চুক্তি অনুযায়ী, কাতারের উন্নত এফ-১৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচির সঙ্গেও এলবিট ও অন্যান্য ইসরায়েলি কোম্পানি যুক্ত রয়েছে। ২০১৭ সালে কাতারি বিমানবাহিনীকে এফ-১৫কিউএ "আবাবিল" যুদ্ধবিমান সরবরাহের জন্য মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং কোটি কোটি ডলারের একটি বিশাল চুক্তি পায়। এরপর ২০২৩ সালের মধ্যে কাতার এই মডেলের ৩৬টি যুদ্ধবিমান বুঝে পেয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, কাতারি যুদ্ধবিমানগুলোর উন্নত পার্টস বা খুচরা যন্ত্রাংশ ও এভিয়েশন সিস্টেম সরবরাহের জন্য বোয়িং-এর কাছ থেকে ১৫ কোটি থেকে ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের সাব-কন্ট্রাক্ট বা উপ-চুক্তি পেয়েছে ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো।
এই উপ-চুক্তির একটি বড় অংশ পেয়েছে এলবিট সিস্টেমসের দুটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান—'এলবিট আমেরিকা' এবং ইসরায়েলের কারমিয়েল-ভিত্তিক বিমান কাঠামোর উপকরণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান 'সাইক্লোন'। আরেকটি চুক্তি পেয়েছে আরটিএক্স-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান কলিন্স এলবিট ভিশন সিস্টেমস, যারা মূলত উন্নত 'জেএইচএমসিএস' কমব্যাট হেলমেট তৈরি করে। এই বিশেষ হেলমেটটি পাইলটের চোখের সামনে ভাইজর বা কাঁচের পর্দায় বিমানের উড্ডয়ন সংক্রান্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (ফ্লাইট ডেটা) প্রদর্শন করে, যার ফলে পাইলট সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর ওপর চোখ রেখেই নিখুঁতভাবে ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমা নিক্ষেপ করতে পারেন। এছাড়াও কাতারের এফ-১৫ কর্মসূচির জন্য আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ 'এএন/এভিএস-৯' নাইট-ভিশন গগলস সরবরাহ করেছে এলবিট।
কাতারের এই প্রকল্পে আরও কিছু সাব-কন্ট্রাক্ট বা কাজ পেয়েছে 'ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ'-এর এভিয়েশন বিভাগ। যারা অ্যাভিওনিক্স সিস্টেম স্থাপন ও বিমানের বিভিন্ন অংশ তৈরিতে বিশেষজ্ঞ। এভিয়েশন কোম্পানি টিএটি টেকনোলজিস ও বিশেষ ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেথ-এল... ইন্ডাস্ট্রিজ রয়েছে এ তালিকায়।
ফাঁস হওয়া মার্কিন সরকারি নথিপত্র ও ছবি থেকে আরও জানা গেছে যে, সৌদি আরবও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর একটি অন্যতম পরোক্ষ গ্রাহক। গত এক দশকে বোয়িং-এর সঙ্গে করা একটি বড় চুক্তির আওতায়, দেশটি কয়েক ডজন উন্নত এফ-১৫এসএ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করেছে। যদিও ক্রয়ের মূল নথিপত্রগুলোতে 'কলিন্স এলবিট ভিশন সিস্টেমস' এবং 'সাইক্লোন'-এর নাম খুব সামান্যই উল্লেখ রয়েছে, তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর জানিয়েছে যে এই চুক্তির আওতায় ৪৬২টি উন্নত জেএইচএমসিএস কমব্যাট হেলমেট ও ৪৬২টি এএন/এভিএস-৯ নাইট-ভিশন গগলস সরবরাহ করা হয়েছে—যা হুবহু কাতারের কাছে বিক্রি করা মডেলগুলোর মতোই। ইন্টারনেটে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি থেকেও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সৌদি ফাইটার পাইলটরা বর্তমানে এই বিশেষ ইসরায়েলি প্রযুক্তির হেলমেটগুলো ব্যবহার করছেন।
কলিন্স এলবিটের তৈরি প্রতিটি জেএইচএমসিএস হেলমেটের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ লাখ মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে, শুধু সৌদি আরবের কাছেই প্রায় ১০ কোটি ডলারের হেলমেট বিক্রি করা হয়েছে। অন্যদিকে, কাতার পৃথকভাবে সাড়ে ৩ কোটি ডলারের চুক্তিতে এই মডেলের ১৬০টি হেলমেট কিনেছে।
