ট্রাম্প নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলকে ‘নজিরবিহীন অপমানের’ মুখোমুখি করেছেন: সাবেক ইসরায়েলি মন্ত্রী
ইসরায়েলের সাবেক আইনমন্ত্রী ড্যানিয়েল ফ্রিডম্যান শনিবার বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দুর্বলতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল—উভয়কেই 'নজিরবিহীন অপমানের' মুখোমুখি করার সুযোগ করে দিয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদপত্র 'মারিভ'-এ লেখা এক নিবন্ধে ফ্রিডম্যান গাজা উপত্যকার যুদ্ধের পরিণতি এবং ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তির ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করেন।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক ধারণার পরিবর্তন
ফ্রিডম্যান বলেন, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যে দৃশ্যগুলো দেখছে, তা হলো—ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকা, নিহত ও আহত শিশুরা এবং ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো মানুষ, যারা প্রচণ্ড রোদ কিংবা ভারী বৃষ্টির মধ্যে তাঁবুতে বসবাস করছে।
তিনি লেখেন, 'ইসরায়েলে এমন অনেকে আছেন, যারা মনে করেন এসবই ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং দেশটির প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করছে।'
'কিন্তু এটি সত্যের কেবল একটি অংশ। সীমিত যে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জিত হয়েছে, তা বিশ্বজনমতের পরিবর্তনের যে মূল্য তৈরি করেছে, তার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে হবে। আরব বিশ্বের মধ্যেও যে পরিবর্তন এসেছে, তার বেশিরভাগই ইসরায়েলের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।'
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পরপরই বিশ্বজনমতের বড় অংশ ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, 'কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে এবং সময় যত গড়িয়েছে, গাজার ধ্বংসযজ্ঞ হামাসের হামলার আলোচনাকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষ, এমনকি আমাদের বন্ধু ও মিত্ররাও ক্রমশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছে।'
অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতার সমালোচনা
ফ্রিডম্যানের মতে, বিশ্বজনমতের এই পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের অবস্থানের প্রতি জনসমর্থন বেড়েছে।
তিনি অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাঁর ভাষায় 'ইহুদি সন্ত্রাসবাদ' নিয়েও সতর্কতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি ইহুদি ও আরব হামলাকারীদের প্রতি ভিন্ন ধরনের আচরণ এবং সরকারের মন্ত্রী ও জোটভুক্ত আইনপ্রণেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
তিনি লেখেন, 'এসব বক্তব্যই ইসরায়েলের নিরাপত্তার ওপর আঘাত, দেশের অবস্থানকে দুর্বল করে, শত্রুদের শক্তিশালী করে এবং দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।'
ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে ফ্রিডম্যান বলেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দুর্বলতা ট্রাম্পকে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েল—উভয়কে 'নজিরবিহীন অপমানের' মুখোমুখি করার সুযোগ করে দিয়েছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গাজার যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময়সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য কাতারে যাওয়া হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ইসরায়েল 'একটি ব্যর্থ চেষ্টা' চালিয়েছিল।
ফ্রিডম্যানের দাবি, এরপর ট্রাম্প 'নেতানিয়াহুকে কাতারের নেতার কাছে ক্ষমা চাইতে এবং কাতারের ভূখণ্ডে ইসরায়েল আর কোনো হামলা চালাবে না—এমন প্রতিশ্রুতি দিতে বলেন।'
তিনি বলেন, হোয়াইট হাউস থেকে টেলিফোনে নেতানিয়াহু সেই ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং পরে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
ইরান-সংক্রান্ত কাঠামোগত চুক্তি ও আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা
ফ্রিডম্যান ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কাঠামোগত চুক্তিরও সমালোচনা করেন। তার মতে, ওই চুক্তি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পদক্ষেপ—অথবা আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, পদক্ষেপ না নেওয়ার ক্ষেত্রেও—সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে এবং এতে ইসরায়েলের অবস্থানকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রাম্প সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে আগ্রহী ছিলেন।
তিনি লেখেন, 'সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ নয়, ইসরায়েলের স্বার্থকেও মূল্য হিসেবে দিতে প্রস্তুত ছিলেন।'
তিনি আরও লেখেন, 'এভাবে আমরা এমন একটি পণ্যে পরিণত হয়েছি, যাকে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে কেনাবেচা করা যায়, অথচ সেই লড়াইয়ে আমাদের কোনো প্রভাব নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইহুদিদের নিয়ে দর-কষাকষি করা এবং তাদের স্বার্থের বিনিময়ে চুক্তি করার এমন চেষ্টা আর দেখা যায়নি।'
রাজনীতিতে টিকে থাকাকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ
কঠোর সমালোচনা করলেও ফ্রিডম্যান বলেন, 'ট্রাম্পের কাছে আমাদের অনেক ঋণ রয়েছে।'
তবে একই সঙ্গে তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে নিজের রাজনীতিতে টিকে থাকাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, নেতানিয়াহু গাজার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করেছেন, যার ফলে বড় ধরনের রাজনৈতিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছেন।
ফ্রিডম্যান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ইসরায়েলি নীতিতে প্রভাব বিস্তারের একটি 'সুবিধা'ও রয়েছে।
তিনি বলেন, 'অন্তহীন গাজা যুদ্ধ বন্ধ করা এবং জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।'
তিনি আরও বলেন, 'লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সম্ভবত সেখানে আমাদের থামিয়ে দেওয়াও ভালো হবে।'
দুটি রাজনৈতিক দর্শনের সন্ধিক্ষণে ইসরায়েল
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাইরের শক্তির প্রভাবের মূল্য অত্যন্ত বেশি।
তিনি বলেন, 'এর মূল্য হলো সেই স্বাধীনতা হারানো, যার জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম তরুণ ইসরায়েলিরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে।'
ফ্রিডম্যান উপসংহারে বলেন, ইসরায়েল এখন দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট সরকারের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রবিনের সরকারের তুলনা করেন।
তিনি লেখেন, 'এটি শুধু ভাবমূর্তির প্রশ্ন নয়; এর চেয়েও বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র। আমরা কেমন রাষ্ট্র হতে চাই, এবং কেন এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।'
নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোটে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ রয়েছেন। তারা দুজনই অধিকৃত পশ্চিম তীরে আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বসতি নির্মাণ সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এ ছাড়া, তারা উভয়েই অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে স্মোত্রিচ বারবার গাজা উপত্যকা পুনরায় দখল করে সেখানে নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন।
