ইউক্রেনের আকাশযুদ্ধ: রাশিয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি সুইডেনের তৈরি ‘গ্রিপেন’
গ্রিপেন ফাইটার জেটকে নিজেদের বিমানবাহিনীর মূল ভিত্তি করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইউক্রেন। এতে করে, সুইডেনের তৈরি এই যুদ্ধবিমানটি অবশেষে সেই আসল ভূমিকার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে—যার জন্য এটিকে বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, আর তা হলো: রাশিয়ার সামরিক শক্তির মোকাবিলা করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ৯০ বিলিয়ন ইউরোর একটি বিশাল ঋণ তহবিলের অর্থায়নে ইউক্রেন ২০টি নতুন 'গ্রিপেন-ই' ফাইটার জেট কেনার জন্য ২.৫ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করেছে। এর পাশাপাশি দেশটি সুইডেনের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে আরও ১৬টি পুরোনো মডেলের গ্রিপেন পেতে যাচ্ছে, যা ইউক্রেনের শহরগুলোকে রক্ষা করার জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা হিসেবেও কাজ করবে।
গত সপ্তাহে সুইডেনের উপসালা বিমানঘাঁটিতে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এসময় তিনি বলেন, "এই যুদ্ধবিমানগুলো আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন এবং এটি সত্যিই ইউক্রেনের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়।"
এই চুক্তির আওতায় কেনা বিমানের সংখ্যা ভবিষ্যতে ১৫০টি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে আগামী এক বছরের মধ্যে গ্রিপেনকে সরাসরি রাশিয়ার যুদ্ধবিমানের প্রতিপক্ষের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্ষমতার জন্য প্রশংসিত এই ফাইটার জেটের জন্য যা প্রথম কোনো যুদ্ধকালীন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। এর আগে উচ্চ-তীব্রতার কোনো বড় যুদ্ধে বিমানটির কার্যকারিতা পরীক্ষিত হয়নি।
গ্রিপেন ফাইটার জেট ১৯৮৮ সালে প্রথম আকাশে ওড়ে এবং পরবর্তীতে এটি ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রি করা হয়। বিমানটি মূলত বিভিন্ন দেশের নজরদারি মিশন এবং আকাশসীমায় নিয়মিত টহল দেওয়ার (এয়ার পুলিশিং) কাজে ব্যবহৃত হয়েছে; এছাড়া থাইল্যান্ডের গ্রিপেন জেটগুলো অতীতে কম্বোডিয়ান বাহিনীর সাথে ছোটখাটো সীমান্ত সংঘর্ষে ব্যবহার হয়েছিল।
সুইডিশ ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির লেকচারার ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোহান হুওভিনেন বলেন, "এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু হতে যাচ্ছে। এই যুদ্ধবিমানটি যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, এটি হবে ঠিক তারই একটি পরীক্ষা: অর্থাৎ রাশিয়ার বিরুদ্ধে পরীক্ষা। চূড়ান্ত বিচারে এটি হবে সুইডিশ প্রযুক্তির একটি বড় পরীক্ষা।"
দুর্গম পরিবেশ উপযোগী ও ক্ষিপ্র
লকহিড মার্টিনের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের তুলনায় গ্রিপেনের রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা (স্টিলথ ক্যাপাবিলিটি) ও পাল্লা কিছুটা কম, তবে এর কিছু নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও রয়েছে। রাশিয়ার আক্রমণের মুখে থাকা একটি দেশের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির উপযোগী করে ডিজাইন করায়, এটি চরম বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় অভিযান পরিচালনায় টেকসই নির্ভরযোগ্যতার ওপর বিশেষভাবে জোর দেয়।
গত মার্চ মাসে আইসল্যান্ডে তাঁর স্কোয়াড্রন যখন ন্যাটোর এয়ার পুলিশিং বা বিমান টহলের দায়িত্বে ছিল, তখন সুইডিশ বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন কমান্ডার রবিন আরভিডসন রয়টার্সকে জানান, এই বিমানের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে তীব্র শীতে গ্লাভস বা দস্তানা পরেই এর সমস্ত মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেইন্যান্সের কাজ সম্পন্ন করা যায়। তিনি বলেন, "শীতকালে যখন আপনি রণক্ষেত্রে সরাসরি থাকবেন, তখন এই ধরনের ছোটখাটো সুবিধাগুলো অনেক বড় পার্থক্য তৈরি করে।"
এফ-৩৫-এর মতো বিমানগুলো যেখানে কোনো সুরক্ষিত বিমানঘাঁটি বা বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ থেকে পরিচালনার জন্য তৈরি, সেখানে গ্রিপেন যেকোনো সোজা সাধারণ সড়ক বা রাস্তা থেকেই উড্ডয়ন (টেক-অফ) এবং অবতরণ (ল্যান্ড) করতে পারে। এর অর্থ হলো, এগুলোকে যুদ্ধের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা সম্ভব, যা শত্রুপক্ষের জন্য এগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা বা ভূমিতে থাকা অবস্থায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে ধ্বংস করাকে কঠিন করে তোলে।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে একটি ইমেইল বার্তায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক প্রধান ওলেক্সি আন্তোনিউক বলেন, "ইউক্রেন ন্যাটোর মানসম্মত কোনো অক্ষত বিমানঘাঁটি থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রানওয়ে, কাঁচা রাস্তা, হাইওয়ের অংশ এবং গোপন অবস্থানগুলো ব্যবহার করি। গ্রিপেনকে ঠিক এই পরিস্থিতির জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।"
তিনি বলেন, "মাত্র ছয়জনের একদল ক্রু—যার মধ্যে একজন প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান এবং পাঁচজন নতুন রিক্রুট—১০ মিনিটেরও কম সময়ে এই বিমানে জ্বালানি ভরা, পুনরায় অস্ত্র সজ্জিত করা এবং পরবর্তী মিশনের জন্য সেটিকে প্রস্তুত করতে পারে। এই শ্রেণির অন্য কোনো আধুনিক যুদ্ধবিমান এই ধরনের অনন্য সুবিধা দিতে পারে না।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর প্রতি ঘণ্টা ওড়ার জন্য যেখানে ৮,০০০ ডলার খরচ হয়, সেখানে গ্রিপেন ফাইটার জেটটি চালাতে এফ-৩৫-এর তুলনায় চার ভাগের এক ভাগেরও কম খরচ হয়, যা একটি দীর্ঘস্থায়ী শক্তিক্ষয়কারী যুদ্ধে অনেক বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা এনে দেয়।
এর পাশাপাশি এর 'মিটিওর' আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রাশিয়ার যুদ্ধবিমানগুলোকে যুদ্ধক্ষেত্র বা ফ্রন্টলাইন থেকে আরও দূরে উড়তে বাধ্য করবে। এটি মস্কোর অন্যতম প্রধান আক্রমণাত্মক অস্ত্র হয়ে ওঠা 'গ্লাইড-বোমা'-র ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভাবকে অনেকাংশে কমিয়ে দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সীমাবদ্ধতা ও উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিমানশক্তি ও প্রযুক্তি বিষয়ক সিনিয়র জাস্টিন ব্রঙ্ক বলেন, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গ্রিপেন চমৎকার একটি বিমান এবং এটি ইউক্রেনের জন্য সঠিক পছন্দ, তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
তিনি বলেন, "এটি ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীকে সম্পূর্ণ আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ বা আকাশ শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার সক্ষমতার ক্ষেত্রে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন এনে দেবে না, কারণ রাশিয়ার স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী।"
তিনি আরও বলেন, রাডার ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতার অভাব এবং অপেক্ষাকৃত কম অস্ত্রবহনের ক্ষমতা এই যুদ্ধবিমানের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে কাজ করতে পারে।
এর উৎপাদন প্রক্রিয়া আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউক্রেন ২০টি বিমানের চাহিদা জানানোর আগেই গ্রিপেনের নির্মাতা- সাব কোম্পানির কাছে আরও ১১৭টি গ্রিপেন-ই ফাইটার জেটের অর্ডার ঝুলে ছিল। কোম্পানিটি বর্তমানে সুইডেনে বছরে প্রায় ১৫টি বিমান তৈরি করতে পারে এবং এটিকে বাড়িয়ে ২০ থেকে ৩০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
ব্রাজিলে এই কোম্পানির আরেকটি অতিরিক্ত প্রোডাকশন লাইন বা উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা বিবেচনায় নিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এই ধরনের উচ্চ প্রযুক্তিগত সামরিক পণ্যের উৎপাদন হঠাৎ করে বাড়ানো বেশ কঠিন; যদিও সাব কোম্পানি এই সম্ভাবনার ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী।
সাব-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিচেল জোহানসন রয়টার্সকে বলেন, "আমরা বেশ কিছু সময় আগেই এই খাতে নতুন বিনিয়োগ শুরু করেছি।" তিনি জানান যে মেরামত, ওভারহল (সার্ভিসিং) এবং খুচরা যন্ত্রাংশ বা স্পেয়ার পার্টসের বিষয়ে ইউক্রেনের সাথে যৌথ সহযোগিতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ইউক্রেনে স্থানীয়ভাবেও উৎপাদন শুরু হতে পারে। তিনি বলেন, "সময়ের সাথে সাথে ইউক্রেনের মতো একটি বড় অংশীদারের ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই ঘটতে পারে।"
