‘স্নাইপিংয়ের যুগ শেষ’: সস্তা ড্রোনের কাছে যেভাবে কাজ হারাচ্ছেন সামরিক স্নাইপাররা
প্রায় আড়াই মাইল দূর থেকে গুলি করে এক রুশ কর্মকর্তাকে হত্যার দাবি করেছিলেন ইউক্রেনের স্পেশাল ফোর্সের এক স্নাইপার। ২০২৩ সালের শেষের দিকে করা ওই নিশানাকে বিশ্ব রেকর্ড বলেও দাবি করা হয়েছিল।
সেই স্নাইপার ভিয়াচেস্লাভ কোভালস্কি এখন নতুন কাজ করছেন। তিনি এখন ড্রোন পাইলটদের সহায়তা করেন। গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি আর কোনো লক্ষ্যবস্তুতে গুলি করেননি।
সস্তা এবং সহজে বিস্ফোরক যুক্ত করা যায়—এমন ছোট ছোট ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধের চেহারাটাই পাল্টে দিয়েছে। এর ফলে সামরিক বাহিনীর বেশ কিছু পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী পদের গুরুত্ব কমে গেছে। যারা লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে আর্টিলারি বা গোলন্দাজ বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দিতেন, এখন আর তাদের দরকার হচ্ছে না। আকাশে ওড়া ড্রোনগুলোর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় ট্যাংক ক্রুরাও তাদের আগের সেই অহংকার হারিয়েছেন।
স্নাইপারের প্রধান দুটি কাজ—নজরদারি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা—এই দুটি কাজেই ড্রোন সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। ড্রোনের মূল সুবিধা হলো এটি অনেক দূর থেকে দেখতে পারে, যেকোনো দিকে বাঁক নিতে পারে এবং এটি হারালে খুব একটা আফসোস করতে হয় না। অর্থাৎ, কোনো মিশন ব্যর্থ হলে হাজার খানেক ডলারের একটি ড্রোনই নষ্ট হয়, কারও জীবন যায় না।
ইউক্রেন এখনো স্নাইপার ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রও তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু ইউক্রেনে স্নাইপারের ব্যবহার আগের চেয়ে কমেছে এবং তাদের কাজের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। কোভালস্কির মতো অনেক স্নাইপারই এখন মনে করেন, স্নাইপিংয়ের যুগ শেষ হয়ে গেছে।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ-এর সামরিক কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের সদস্য কোভালস্কি বলেন, 'ড্রোন এখন অনেক বেশি কার্যকর এবং এতে খরচও কম।'
৬০ বছর বয়সী সাবেক ব্যবসায়ী কোভালস্কি প্রথম বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একটি সংবাদের মাধ্যমে। ওই সংবাদে জানানো হয়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনের দাবি করা সেই রেকর্ড সৃষ্টিকারী গুলির পেছনের মানুষটিই হলেন কোভালস্কি।
যুদ্ধক্ষেত্রে তরুণ সেনারা কোভালস্কির সঙ্গে সেলফি তুলতেন, তার সন্তানদের কাছে বন্ধুরা তাদের বাবার বীরত্বের গল্প জানতে চাইতেন এবং শীর্ষস্থানীয় মার্কিন র্যাপার ইয়েট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি শেয়ার করেছিলেন।
কিন্তু রণক্ষেত্রে কোভালস্কির সেই তারকাখ্যাতি ফিকে হতে শুরু করেছিল। তার ইউনিট এখন আগের চেয়ে অনেক কম লক্ষ্যবস্তুর খোঁজ পাচ্ছিল। চারদিকে ড্রোনের উপস্থিতির কারণে রুশ সেনারা আরও নিখুঁতভাবে নিজেদের লুকিয়ে রাখার কৌশল রপ্ত করে ফেলেছিলেন। ২০২৪ সালে পাঁচটি অভিযানে গিয়েও কোভালস্কি একটি লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারেননি।
সেবার তার দল প্রায় দেড় মাইল দূরে একটি বাঙ্কারের (ডাগআউট) কাছে রুশ সেনাদের দেখতে পায়। কিন্তু রুশরা দিনের বেলা মাটির নিচেই থাকত এবং রাতের অন্ধকারে গুলি করার মতো উপযুক্ত অপটিক্যাল সাইট কোভালস্কির কাছে ছিল না।
পরে ইউক্রেনীয় ড্রোনগুলো ওই বাঙ্কারে বোমা মারে। পরদিন সকালে রুশ সেনারা ক্ষয়ক্ষতি দেখতে বেরিয়ে এলে কোভালস্কি গুলি ছোড়েন। কিন্তু তিনি কেবল শতভাগ নিশ্চিত হলেই কোনো আঘাতকে নিজের সফলতার খাতায় যোগ করেন।
এরপর তিনি আর খুব একটা যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি।
ড্রোন অপারেটরদের সহকারী
এখন তিনি মূলত ড্রোন অপারেটরদের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। অপারেটরদের পজিশন নিতে সাহায্য করা, ড্রোনে বিস্ফোরক লাগানো এবং মাঝে মাঝে ড্রোনের পথ দেখাতে সাহায্য করেন তিনি। এর পাশাপাশি কোনো বিপদ হলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য কুইক-রিয়্যাকশন ফোর্সের অংশ হিসেবেও তিনি প্রস্তুত থাকেন।
স্নাইপারের চেয়ে ড্রোনের অনেক সুবিধা রয়েছে। নজরদারির ক্ষেত্রে, একটি ড্রোন ওপর থেকে (বার্ডস-আই ভিউ) যতটা দেখতে পারে বা যত দ্রুত চলতে পারে, একজন স্নাইপার তা কখনোই পারেন না। ড্রোন বাঁক নিতে পারে, গুলি পারে না। তাছাড়া, একটি ড্রোন গুলির চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করতে পারে।
২০২২ সালে আইভ্যানহো ছদ্মনামের এক ইউক্রেনীয় স্নাইপার আড়াই মাইল দূর থেকে শত্রুদের চলাফেরা খেয়াল করে গোলন্দাজ বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দিতেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় তিন থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগত।
আইভ্যানহো বলেন, 'এখন ড্রোন অপারেটর শত্রুকে দেখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হামলা করতে পারে।' আইভ্যানহো এখন নিজেই একজন ড্রোন অপারেটরে পরিণত হয়েছেন।
লুকানোর জায়গা নেই
স্নাইপাররা সাধারণত কমপক্ষে দুজনের দলে কাজ করেন। তাদের ভারী বন্দুক, নজরদারি ড্রোন, ক্যামেরা, এমনকি ছোট জেনারেটরসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম বহন করতে হয়।
ড্রোনের চোখে পড়া এড়াতে এবং এই ভারী সরঞ্জাম নিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে তাদের প্রায় ৬ মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হয়। শত্রুর নজর এড়িয়ে তারা এক সপ্তাহ পর্যন্ত এক জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারেন এবং এরপর আবার হেঁটে ফিরে আসেন।
কোভালস্কি বলেন, 'এর বিপরীতে বাঙ্কারে বসে থাকা একজন তরুণ পাইলটকে শুধু তার ড্রোনটি বের করতে হয় এবং এটি নিজের কাজ নিজেই করে।'
ড্রোন স্নাইপারের ঐতিহ্যবাহী কাজকে—শত্রুর খুব কাছাকাছি গিয়ে দিনের পর দিন লুকিয়ে থাকাকে—অনেক বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে। এখন লুকানোর মতো প্রায় কোনো জায়গাই নেই। এমনকি কোনো স্নাইপার যদি লুকানোর জায়গাও পান, তবু তার শরীরের তাপ সেই জায়গাকে এতটাই উষ্ণ করতে পারে, যা থার্মাল ইমেজযুক্ত ড্রোনের চোখে সহজেই ধরা পড়ে যাবে।
ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি ব্রিগেড জানিয়েছে, তারা এখন ঐতিহ্যবাহী স্নাইপারের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে।
স্নাইপারের প্রয়োজনীয়তা ফুরোয়নি
তবে অনেকে বলছেন, পদাতিক বাহিনীর মধ্যে বিশেষজ্ঞ নিশানাবাজ হিসেবে স্নাইপারের এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা দেশগুলো জানিয়েছে, তারা স্নাইপারদের ওপর থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে না। পেন্টাগনের এক মুখপাত্র জানান, মার্কিন সেনাবাহিনী আগের মতোই স্নাইপারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং ড্রোনের বিস্তারের কথা মাথায় রেখে তাদের কোর্সেও পরিবর্তন এনেছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র লে. কর্নেল ভনি এল. রাইট বলেন, 'আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একজন মানব স্নাইপার এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। তাদের কাজ জ্যাম করা যায় না।'
কয়োটে ছদ্মনামের এক ইউক্রেনীয় স্নাইপার কমান্ডার বলেন, কোনো অবস্থান দখল করতে বা ধরে রাখতে এখনো পদাতিক সেনার প্রয়োজন, আর স্নাইপাররা সেই পদাতিক বাহিনীরই অংশ।
উদাহরণস্বরূপ, তার স্নাইপাররা এমন রুশ সেনাদের নিশানা করেন, যারা ইউক্রেনীয় লাইনের পেছনে অনুপ্রবেশ করেছে অথবা ইউক্রেনীয় বাহিনী এগিয়ে যাওয়ার পর যারা আটকা পড়েছে।
২৮ সদস্যের একটি স্নাইপার ইউনিটের কমান্ডার কয়োটে বলেন, স্নাইপাররা যেকোনো আবহাওয়ায় কাজ করতে পারে। কিন্তু মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে ড্রোনের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে পূর্ব ইউক্রেনের তোরেৎস্ক শহরে তার প্রায় ১৫ জন স্নাইপার উঁচু ভবনে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে তারা প্রায় ৩৫ জন রুশ সেনার একটি দলকে দেখতে পান, যা ড্রোনের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। রুশরা তিনটি দলে ভাগ হয়ে এগিয়ে আসার সময় স্নাইপাররা তাদের ১৬ জনকে হত্যা করেন। এই ঘটনায় শুধু একজন ইউক্রেনীয় স্নাইপার নিহত হন। রুশ বাহিনী শহরটি ঘেরাও করার সময় ইউক্রেনীয় পদাতিক বাহিনীকে নিরাপদে পিছু হটতে স্নাইপাররা এই সাহায্য করেছিলেন বলে জানান কয়োটে।
স্নাইপাররা এখন ড্রোন ঠেকানোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থারও অংশ। ইউক্রেন এখন দূরপাল্লার শাহেদ ড্রোন ভূপাতিত করতে স্নাইপার ব্যবহারের পরীক্ষাও চালাচ্ছে।
একজন স্পোর্টসম্যান হিসেবে শ্যুটিং শেখার সময় কোভালস্কিকে শেখানো হয়েছিল যে কখনোই কোনো মানুষের দিকে রাইফেল তাক করা যাবে না। তিনি বলেন, তার পুরোনো পেশার এমন একটি দিক রয়েছে যা তিনি মোটেও মিস করেন না; আর তা হলো—মানুষ হত্যা।
