রাশিয়া ও চীনের যৌথ পরিকল্পনায় থাকা ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইন কী?
চলতি সপ্তাহে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত রাশিয়া-চীন শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে আলোচনায় অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল—দীর্ঘদিনের বিলম্বিত 'পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২' (পিওএস-২) প্রকল্প। এটি একটি প্রস্তাবিত ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন, যা রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়া থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে চীনে গ্যাস সরবরাহ করবে।
গতকাল বুধবার দুই দেশ পাইপলাইনের রুট ও নির্মাণের বিষয়ে একটি যৌথ সমঝোতায় পৌঁছালেও, দাম নির্ধারণসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্তাবলী এখনও চূড়ান্ত করা বাকি রয়েছে।
নির্মাণ সম্পন্ন হলে, এই পাইপলাইনের বার্ষিক ধারণক্ষমতা হবে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস। এর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলে তা হবে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় দ্বিগুণ। এটি রাশিয়ার ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির সাবেক প্রধান পাইপলাইন 'নর্ড স্ট্রিম ১' বার্ষিক ৫৫ বিলিয়ন ঘনমিটার-এর প্রায় কাছাকাছি সক্ষমতার।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া থেকে এটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যেতে পারে। এর আগের 'পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ১' পাইপলাইনটির চুক্তি ২০১৪ সালে হওয়ার পর প্রথম সরবরাহ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে এবং এটি পূর্ণ সক্ষমতা লাভ করে ২০২৪ সালে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর ইউরোপে গ্যাস বিক্রির বাজার হারানোর পর রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি 'গ্যাজপ্রম' চরম রাজস্ব সংকটে ভুগছে। তাদের সামনে চীনের কাছে গ্যাস বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো বড় বিকল্প নেই।
চীন রাশিয়ার এই চরম সংকটকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করছে। চীন জানে যে রাশিয়ার পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাই তারা গ্যাসের দাম চাইছে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারের ভর্তুকিযুক্ত হারের কাছাকাছি (প্রতি ১,০০০ ঘনমিটারে মাত্র ৫০ ডলারের মতো)। অথচ বর্তমানে চীন রাশিয়ার 'পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ১' থেকে যে গ্যাস কেনে, তার জন্য প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ২৫৮ ডলার দেয়। রাশিয়া এই বিশাল লোকসান মেনে নিতে পারছে না বলেই আলোচনা আটকে আছে।
চীনের জন্য এই পাইপলাইনের মূল আকর্ষণ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা।
বর্তমানে চীনের আমদানিকৃত এলএনজি চালানের একটি বিশাল অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এরপর এটি মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনে পৌঁছায়।
যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বাযুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো বিরোধ তৈরি হলে—এই দুটি সামুদ্রিক রুটের নিয়ন্ত্রণ হারানো চীনের জন্য হবে এক বড় বিপর্যয়। স্থলপথের এই পাইপলাইন চীনকে সেই 'সামুদ্রিক অবরোধের' ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেবে।
নির্ভরশীলতার ভয় এবং চীনের বিকল্প পরিকল্পনা
জ্বালানির জন্য চীন কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে চায় না। রাশিয়া থেকে ২০% এর বেশি গ্যাস আমদানি করার ঝুঁকি তারা ভালো করেই বোঝে। সেই কারণেই চীন মঙ্গোলিয়া হয়ে আসা এই পাইপলাইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে দেরি করছে। এর পাশাপাশি তারা তুর্কমেনিস্তান থেকে 'লাইন ডি' নামক মধ্য এশীয় পাইপলাইন সম্প্রসারণের কাজও সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি রাশিয়ার জন্য একটি 'বাধ্যতামূলক' প্রকল্প, কিন্তু চীনের জন্য এটি কেবলই একটি 'বিকল্প সুবিধা'। চীন চাইলে অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু রাশিয়ার হাতে সেই সময় নেই। এই মূলগত পার্থক্যের কারণেই প্রকল্পটির রুট বা নির্মাণ কৌশল নিয়ে দুই দেশ একমত হলেও, মূল চুক্তির মুখ দেখতে এখনো দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
