‘আমাকে এগুলো রক্ষা করতে হবে’: মৌরিতানিয়ায় দুর্লভ ইসলামিক পাণ্ডুলিপি আগলে রাখা এক ব্যক্তির গল্প
গ্রন্থাগারিক মুহাম্মদ গোলাম আল-হাবোত তার সরু হাতে আলতো করে একজোড়া সাদা দস্তানা পরলেন। এরপর উঁচু ছাদওয়ালা, ইস্পাতের বুকশেলফে সাজানো একটি ঠান্ডা ঘরে নিজের দৈনন্দিন কাজ শুরু করলেন।
তিনি আরবিতে ছাপা একটি মোটা পাণ্ডুলিপি খুললেন। বাদামি রঙের জীর্ণ পাতাগুলো উল্টে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করলেন। এরপর সন্তুষ্ট মনে বইটি বন্ধ করে, এর কুঁচকানো চামড়ার মলাটের ওপর হাত বুলিয়ে, খুব সাবধানে একটি সাদা কার্ডবোর্ডের বাক্সে রেখে দিলেন।
কাঠের খোলা দরজা দিয়ে তখন দুপুরের রোদ এসে পড়ছিল পাঠাগারে। আল-হাবোত বললেন, 'এই বইগুলো আমার এবং আমার পরিবারের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'
মৌরিতানিয়ায় প্রচলিত হাসানিয়া আরবিতে কথা বলছিলেন তিনি। তার কণ্ঠ ছিল নিচু এবং প্রতিটি বাক্য কাব্যিক। কাজ করার সময় তার লম্বাটে ডিম্বাকৃতি মুখের চারপাশে মোটা মাছি ভনভন করছিল।
তিনি বলেন, 'এই বইগুলোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটা বাবা আর ছেলের মতো। ঈশ্বর এই পৃথিবী এবং এর সব মানুষকে তুলে না নেওয়া পর্যন্ত আমাদের এই বইগুলো রক্ষা করতে হবে।'
মৌরিতানিয়ার উত্তরে আদ্রার অঞ্চলের এক মধ্যযুগীয় দুর্গ শহর শিনগেটি। সেখানে এখনো টিকে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি পাঠাগারের একটি হলো এই আল-হাবোত পরিবারের পাঠাগার।
১৩ থেকে ১৭ শতকের মধ্যে এই শহরটি বাণিজ্য এবং ইসলামি শিক্ষার এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে স্থানীয়রা বড় শহরে চলে যাওয়ায় এটি এখন প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
শিনগেটি শহরটিকে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও লড়াই করতে হচ্ছে।
উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ার ৯০ শতাংশই সাহারা মরুভূমি এবং কয়েক শতাব্দী ধরেই দেশটি মরুকরণের সঙ্গে লড়াই করছে। এখন মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন একে আরও ত্বরান্বিত করেছে। বালুঝড় আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে, আর তীব্র গরম বা শীতের মৌসুমও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকছে।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিংয়ের গবেষক অ্যান্ড্রু বিশপ সাহারান সংস্কৃতির ওপর জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, মূল্যবান বইগুলোর জন্য এই জলবায়ুর পরিবর্তন 'মারাত্মক ক্ষতিকর'।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, 'তীব্র তাপ এবং অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিপাতের মানে হলো, বইগুলো পানি বা তাপের কারণে আগের চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে অনেক পাণ্ডুলিপিই আর সংস্কারের অবস্থায় নেই। শুধু তা-ই নয়, মাটির তৈরি এই পাঠাগারগুলো আকস্মিক বৃষ্টি এবং ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরের দীর্ঘ গ্রীষ্মের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়।'
শিনগেটির ৪ হাজার ৫০০ বাসিন্দার অনেকেই এখন পরিত্যক্ত জারের (উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী দুর্গ এলাকা) আদি সীমানার বাইরে সিমেন্টের তৈরি বাড়িতে থাকেন। এই জার শুকনো পাথর ও লাল মাটির ইট দিয়ে তৈরি। প্রাগ শহরের সমান প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটারের এই পুরো এলাকাটি একসময় বালিয়াড়িতে চাপা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও ঠিক কবে এমনটা হতে পারে তা এখনো অজানা।
ইসলামের 'সপ্তম পবিত্র শহর'
আল-হাবোত সব সময় গ্রন্থাগারিক হতে চাননি। কিন্তু ২০০২ সালে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়েই প্রায় ১ হাজার ৪০০ পাণ্ডুলিপির দায়িত্ব নেন। তিনি জানান, এই কাজের জন্য নির্বাচিত হওয়াটা তাদের সংস্কৃতিতে অত্যন্ত সম্মানের বিষয়।
৫০ বছর বয়সী এই গ্রন্থাগারিক মনে করেন, তার দুই ছেলে এই দায়িত্ব নিতে চাইবে না। কারণ, তাদের বয়সী অনেকেই ইতিমধ্যে রাজধানী নওয়াকচত বা অন্য কোথাও কাজের খোঁজে চলে গেছে।
যদিও আল-হাবোত বলেন, 'এটা আমাদের করতেই হবে; এটা পারিবারিক দায়িত্ব। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।'
পরিবারের এই পাণ্ডুলিপিগুলো অত্যন্ত পবিত্র, কারণ এগুলো খুবই বিরল। আল-হাবোতের পূর্বপুরুষ সিদি মোহাম্মদ ওলদ হাবোত ছিলেন শিনগেটির প্রায় দুই ডজন পণ্ডিতের একজন। তারা ১৮ ও ১৯ শতকের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের জন্য মিসর থেকে আন্দালুসিয়া পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন।
এই পণ্ডিতেরা মিলে প্রায় ৬ হাজার পাণ্ডুলিপির এক বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় প্রতিটি বিষয়ই ছিল: ইসলামি আইনশাস্ত্র, হাদিস বা মহানবী (সা.)-এর বাণী, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কবিতা। কিছু কাজ এই পণ্ডিতদের নিজেদেরও ছিল, যার মধ্যে প্রবীণ আল-হাবোতের পদ্য বিষয়ক বইও রয়েছে।
বইগুলো শিনগেটির প্রায় ৩০টি পাঠাগারে রাখা হতো, যা সারা বিশ্বের মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
সে সময় ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে শহরটি বেশ বিখ্যাত ছিল। যাযাবর বার্বার ব্যবসায়ীরা উটের ক্যারাভানে করে উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণাঞ্চলের সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে পণ্য (মূলত লবণ ও সোনা) পরিবহন করতেন। তারা এই শহরটিকে একটি বিরতিস্থল হিসেবে ব্যবহার করতেন, যা এটিকে একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করেছিল।
মক্কায় পায়ে হেঁটে বা উটে চড়ে হজ করতে যাওয়া মুসলিম তীর্থযাত্রীরা শিনগেটিতে এসে জড়ো হতেন। কায়রোর দিকে রওনা দেওয়ার আগে তারা এই দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রার জন্য নিজেদের আধ্যাত্মিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করতেন। এই শহরে ইসলামিক ও বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন বই আদান-প্রদান এবং কেনাবেচা হতো।
পশ্চিম আফ্রিকার লোককথায় শিনগেটিকে ইসলামের সপ্তম পবিত্র শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনেসকোর মতে, অনেকে একে 'সাহারার সোরবোন' (প্যারিসের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়) বলেও ডাকত।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পাঠাগারগুলো পরিচালিত হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয়দের নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কারের ফলে ক্যারাভান বাণিজ্য কমে গেলে, পুরোনো এই শহরটি জনশূন্য হতে শুরু করে এবং অনেক পাঠাগার বন্ধ হয়ে যায়।
আল-হাবোত বলেন, 'শিনগেটি ছিল সব মানুষের মা।' একসময় এই শহরটি এই অঞ্চলের প্রধান রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে যা মৌরিতানিয়া নামে পরিচিত, সেই এলাকাকে আগে 'বিলাদ শিনকিত' বা শিনগেটির দেশ বলা হতো।
আল-হাবোত বলেন, 'মানুষ এখান থেকে চলে গিয়েছিল কারণ খাবারের জন্য, সন্তানদের শিক্ষার জন্য এবং ভালো সুযোগের জন্য তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।' তিনি জানান, আশপাশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাও হাতে গোনা।
এই গ্রন্থাগারিক জানান, তার পরিবারের অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু তার মতো যারা থেকে গেছেন, তারা মূলত তাদের পূর্বপুরুষের তিনটি ইচ্ছা রক্ষা করতেই রয়ে গেছেন।
আল-হাবোত ব্যাখ্যা করে বলেন, 'তার (পূর্বপুরুষের) ইচ্ছা ছিল—এই পাঠাগার যেন শিনগেটিতেই থাকে, এটি যেন সব জ্ঞানপিপাসুর জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং তার কোনো এক পুরুষ বংশধর, যিনি ধার্মিক ও নৈতিকভাবে সৎ, তিনি যেন এর গ্রন্থাগারিক হন।' তিনি বিশ্বাস করেন, এই নির্দেশ অমান্য করলে ঈশ্বরের ক্রোধ নেমে আসতে পারে।
গবেষক বিশপ বলেন, শিনগেটির এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার মূল কারণ হলো এর ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার জন্য তেমন সহায়তা না পাওয়া। ১৯৭০ সাল থেকে মৌরিতানিয়ায় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৩৫ শতাংশ কমে গেছে, যার ফলে পশুপালকদের পশু চরানো এবং খেজুরের ফলন কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৯৯৬ সালে ইউনেসকো শিনগেটি এবং মৌরিতানিয়ার আরও তিনটি জারকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। পুরোনো শহরে এখনো যারা বসবাস করছেন, তাদের বাড়িঘর সংস্কারের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তা খুবই সামান্য পরিসরে। মূলত পাথরের আদি স্থাপত্য এবং মুরিশ ধাঁচের কাঠামো বজায় রাখতেই এই কড়াকড়ি। এখানকার বাড়িগুলো এমনভাবে তৈরি যে এগুলো সরু গলি দিয়ে একটি চতুষ্কোণ মিনারওয়ালা মসজিদে গিয়ে মেশে।
শিনগেটির ঠিক বাইরেই রয়েছে আবেইরের ধ্বংসাবশেষ। ধারণা করা হয়, এটি ৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেখানে ২৫ হাজার মানুষ বাস করত। স্থানীয়দের মতে, এটিই ছিল 'আসল' শিনগেটি। ১২৬৪ সালের দিকে কোনো এক সংঘাতের পর বাসিন্দারা এই এলাকা ছেড়ে চলে যায় বলে ধারণা করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকাটি বালুর নিচে চাপা পড়ে যায়।
পাণ্ডুলিপি বাঁচানোর লড়াই
আল-হাবোত স্বীকার করেন যে তার এই কাজটি মাঝেমধ্যে বেশ কষ্টকরও বটে।
পুরোনো ও জীর্ণ পাণ্ডুলিপিগুলো পড়ার অযোগ্য হওয়ার আগেই সেগুলো পুনরায় ছাপানো বা ডিজিটালাইজ করাটা বেশ ব্যয়বহুল। বইখেকো পোকামাকড় দূরে রাখতে তার প্রায়ই রাসায়নিকের প্রয়োজন হয় এবং বইগুলোকে আরও ভালো অবস্থায় সংরক্ষণের জন্য অর্থেরও দরকার পড়ে।
এর বাইরে রয়েছে আবহাওয়া, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মৌরিতানিয়ায় এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের শুষ্ক মৌসুমে প্রচণ্ড গরম থাকে এবং এরপরের শীতের মাসগুলোতে থাকে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা।
আল-হাবোত বলেন, পুরোনো পাতাগুলো চরম গরম ও ঠান্ডা—উভয় ক্ষেত্রেই খুব সংবেদনশীল। অনেক সময় খুব গরম পড়লে তিনি পাঠাগারের চারপাশে বালতিভর্তি পানি রেখে আর্দ্রতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে, আকস্মিক বন্যা এই বইগুলোর জন্য পানিজনিত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে।
পাঠাগারে আসা দর্শনার্থীরা সাধারণত সামান্য ফি দেন। কিন্তু ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিদেশিদের ওপর হামলা শুরু করে, তখন মৌরিতানিয়াজুড়ে পর্যটকদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়। এরপর কোভিড-১৯ মহামারিও পর্যটকদের আগমন কমিয়ে দেয়।
পরে অবশ্য মৌরিতানিয়া সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করেছে। আল-হাবোত জানান, পর্যটকরা এখন ধীরে ধীরে ফিরে আসছেন এবং যেসব স্থানীয় মানুষ এলাকা ছেড়েছিলেন, তাদেরও কেউ কেউ ফিরে আসছেন।
২০২৪ সালে ইউনেসকো ১ লাখ ডলারের একটি সংস্কার প্রকল্পের আওতায় ১৩টি পারিবারিক পাঠাগারকে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, কম্পিউটার, প্রিন্টার এবং শেলফ ও স্টোরেজ বক্স সরবরাহ করে। কিন্তু বেশির ভাগ পাঠাগারই এখনো বন্ধ এবং সেগুলোর বইগুলো পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
বিশপ বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শিনগেটির সংস্কৃতি সংরক্ষণে আগ্রহের অভাব আগামী দিনে এই খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পাঠাগারের ভেতরে আল-হাবোত আবারও তার কাজে মনোযোগ দিলেন। জীর্ণ পাণ্ডুলিপির ওপর ঝুঁকে পড়ল তার হালকা-পাতলা শরীর। তিনি একটি বই খুলে বেশ উৎসাহ নিয়ে পাতাগুলো দেখালেন: সেখানে চাঁদের বিভিন্ন পর্যায় এবং চন্দ্রগ্রহণের চিত্র আঁকা ছিল। আরেক পাতায় পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার ছবি আঁকা ছিল।
নিচু স্বরে আল-হাবোত বলেন, 'আমাকে এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে হবে। আমার নিজের জন্য এবং সমগ্র মানবতার জন্য।'
