বিবিসির বিশ্লেষণ: এক দশক পর আরো শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী চীনে ফিরলেন ট্রাম্প
চলতি সপ্তাহে বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন তাঁর মার্কিন সমকক্ষকে আতিথেয়তা দেবেন, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনে পড়ে যেতে পারে ২০১৭ সালের সেই সফরের স্মৃতি। সেবার তাঁকে তুষ্ট করতে কোনো কমতি রাখা হয়নি; এমনকী চীনের সম্রাটদের বাসস্থান–ফরবিডেন সিটি- খ্যাত প্রাসাদে তাঁকে নৈশভোজে আপ্যায়িত করা হয়েছিল—যা এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাগ্যে জোটেনি।
এবারের অভ্যর্থনাও ঠিক ততটাই রাজকীয় হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকছে 'ঝংনানহাই'-তে যাত্রাবিরতি, যা চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের বসবাস ও কর্মস্থল হিসেবে পরিচিত এক সংরক্ষিত এলাকা। তবে এবারে আলোচনার বিষয়গুলো হবে বেশ জটিল। বিশেষ করে বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং তাইওয়ান ইস্যুর পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে উত্তেজনার এক নতুন উৎস হিসেবে যোগ হয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্প যখন এই শক্তিশালী এবং অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী চীনে ফিরছেন, তখন অনেক কিছুই বদলে গেছে। নজিরবিহীন তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা উচ্চাভিলাষী শি জিনপিং এখন 'নতুন উৎপাদনশীল শক্তি'-র ওপর জোর দিচ্ছেন, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিশাল বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার প্রশাসন যদি গত এক দশকে বেইজিং যে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়েছে তার এক ঝলক দেখতে চান, তবে তাঁদের রাজধানী বেইজিংয়ের রাজকীয় গণ্ডির বাইরেও নজর দিতে হবে, যেখানে তারা তাদের এবারের সফরের বেশিরভাগটা কাটাবেন।
চীনের দুর্গম ও রুক্ষ উত্তরাঞ্চলে এখন বিশাল অঞ্চলজুড়ে সৌর ও বায়ুশক্তি আধিপত্য করছে। অন্যদিকে শিল্পসমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা— কারখানা ও সাপ্লাই চেইনগুলোকে নতুন রূপ দিচ্ছে। এমনকি চংকিংয়ের মতো মেগাসিটিগুলো এখন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
বিপুল সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একসময়ের সাধারণ উৎপাদন কেন্দ্র চংকিংকে এখন চীনের পরিবর্তনের এক শক্তিশালী প্রতীকে রূপান্তর করা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি, নতুন বাণিজ্য এবং 'ট্রেন্ডি' বা আধুনিক এক তকমা নিয়ে—শহরটি বিশ্বের কাছে চীনের এক বন্ধুসুলভ ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মার্কিন-চীন সম্পর্কের সিনিয়র রিসার্চ ও অ্যাডভোকেসি অ্যাডভাইজার আলি ওয়েন বলেন, ২০১৭ সালে চীন মূলত আমেরিকার সমকক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল।
তিনি বলেন, "আমার মনে হয়, সে সময় চীনা প্রতিনিধিদল প্রেসিডেন্ট শি যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূ-রাজনৈতিক সমকক্ষ—সেই ধারণাটি দেওয়ার জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তবে এবার লক্ষণীয় বিষয় হলো, চীনকে আর সে ধরণের দাবির কোনো প্রয়োজন হচ্ছে না।"
ওয়েনের মতে, ওয়াশিংটন এখন চীনকে একটি 'নিয়ার-পিয়ার' বা প্রায়-সমকক্ষ শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনি বেইজিংকে "যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মোকাবিলা করা সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী" হিসেবে বর্ণনা করেন।
'আমেরিকা ফার্স্ট' বনাম চীনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
অন্যদিকে, শি জিনপিং এপর্যন্ত যত বিদেশি নেতার মুখোমুখি হয়েছেন, ট্রাম্প তাদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে অস্থিরমতি বা পরিবর্তনশীল। এখানে তার একটি ডাকনামও রয়েছে—'চুয়ান জিয়ানগুও', যার অর্থ 'দেশ নির্মাতা ট্রাম্প'।
অনলাইনে অনেক চীনা নাগরিক এমন মন্তব্য করেছেন যে, ট্রাম্পের বিভেদমূলক নীতি এবং বাণিজ্য যুদ্ধ মূলত আমেরিকার বৈশ্বিক অবস্থানকে দুর্বল করে চীনের উত্থানে সাহায্য করেছে।
চংকিংয়ে ছুটি কাটাতে আসা এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি বলেন, "তিনি (ট্রাম্প) পরিণতির কথা মোটেও ভাবেন না। তাঁর জানা উচিত যে আমরা সবাই একই বিশ্বে বাস করি। এটি একটি গ্লোবাল ভিলেজ। তার সবসময় কেবল 'আমেরিকা ফার্স্ট' বা আমেরিকাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়।"
চংকিংয়ের নিয়ন আলোয় ঝলমলে আকাশছোঁয়া ভবনগুলোর দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় করা পর্যটকদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই ব্যক্তি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।
বিশ্বের 'সাইবারপাঙ্ক রাজধানী' হিসেবে পরিচিত এই শহর যখন গোধূলিলগ্নে আলোকিত হয়ে উঠছে, তখন তিনি যোগ করেন, "চীন কয়েক দশক ধরে সুদূরপ্রসারী কৌশল তৈরি করে আসছে।"
চংকিং শহরটি পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে, কারণ নির্মাতাদের ওপরের দিকে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। এখানকার রাস্তাগুলো খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে পেঁচিয়ে ওপরে উঠে গেছে, আর সাবওয়ে বা পাতাল রেল নিচ দিয়ে এবং স্তরে স্তরে সাজানো ভবনগুলোর মধ্য দিয়ে চলাচল করে। সবকিছু একে অপরের ওপর এমনভাবে অবস্থান করছে যে ভ্রমণ সাংবাদিকরা একে চীনের '৮-ডি শহর' বলে অভিহিত করেছেন।
পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটকদের মতো নিচ দিয়ে বয়ে চলা ইয়াংজি নদীর নৌকাগুলো থেকেও পর্যটকরা সেরা ছবিটি তোলার চেষ্টা করেন। বৈদ্যুতিক নীল, ম্যাজেন্টা এবং লাল রঙের আলোয় ঝলমলে ল্যান্ডস্কেপ নদীর ওপর এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।
এই শহরটি মূলত আমেরিকার শক্তির মোকাবিলায় বেইজিংয়ের বহুমুখী প্রচেষ্টার একটি জানালা। চীন তার সফট পাওয়ার বা সাংস্কৃতিক প্রভাবকে শাণিত করছে এবং বিদেশি পর্যটকদের ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। গত বছর বেইজিং ও সাংহাইয়ের পাশাপাশি প্রায় ২০ লাখ পর্যটক চংকিংকে তাদের ভ্রমণ তালিকায় রেখেছিলেন।
তবে চংকিংয়ের এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির একটি বড় ব্যয়ও রয়েছে। এটি নির্মাণে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী নগর নির্মাণ প্রচেষ্টা চালাতে হয়েছে। ৩ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার এই অঞ্চলের স্থানীয় সরকার এখন বিপুল ঋণে জর্জরিত। ধীরগতির অর্থনীতি এবং ধুঁকতে থাকা আবাসন খাতও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
শহরের এই আধুনিক দিগন্তের ওপারেই রয়েছে পুরনো এলাকাগুলো, যেখানে শ্রমিকরা প্রতিদিন কয়েক ডলার উপার্জনের আশায় পার্সেল গোছানো বা ফলমূল ও শাকসবজি বিক্রির কাজ করেন। ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ চীনের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে বাড়ির দাম কমছে, বেকারত্ব বাড়ছে এবং মানুষের খরচ করার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
এই সবকিছুর মধ্যেও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ অটুট রয়েছে। অনেক চীনা নাগরিক রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন। ট্রাম্পের জন্য তাদের মনে বার্তা থাকলেও, বিবিসির প্রতিবেদকের কাছে অনেকেই নাম প্রকাশ করতে চাননি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দাবস্থার কারণে বিনিয়োগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এক নেইল টেকনিশিয়ান বলেন, "আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলতে চাই, সবকিছুতে অস্থিরতা তৈরি করা বন্ধ করুন।"
তবুও কিছু চীনা তরুণ এখনও যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীনতা ও সুযোগের এক আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখেন।
বান্ধবীর সাথে ঘুরতে আসা এক ফ্যাশন স্টুডেন্ট বলেন, "আমি যখন আমেরিকার কথা ভাবি, তখন আমার মাথায় তাদের স্বাধীনতার কথা আসে। সেখানে মানুষ তাদের ব্যক্তিত্ব ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়।"
তিনি আরও যোগ করেন, "এটি সৃজনশীলতা ও প্রজ্ঞায় ভরপুর একটি দেশ। চীনের অনেক সেখানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়।"
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই পরাশক্তির মধ্যে টানাপোড়েনের কারণে সেই স্বপ্ন এখন অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে এর ফলে অনেক চীনা প্রকৌশলী দেশের ভেতরেই উদ্ভাবনী শক্তিকে সামনে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছেন।
প্রতিযোগিতা: রোবট থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি
চংকিংয়ের অনেক নতুন বিজনেস হাবের মধ্যে একটি ফ্ল্যাগশিপ ল্যাবরেটরিতে দেখা গেল একদল শিশু আনন্দে চিৎকার করছে। তারা একটি রোবট মাছকে ট্যাঙ্কের ভেতর সাঁতার কাটতে দেখছে।
অন্যান্য হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো দেখতে রোবটগুলো তাদের কুংফু বা নাচের মুদ্রা প্রদর্শন করছে। শিশুরা বিবিসির ক্যামেরার সামনে উৎসাহী হয়ে তাদের শিক্ষকের সাহায্য নিয়ে সমস্বরে ইংরেজিতে বলতে শুরু করল: "এই রোবটটি নাচতে পারে!"
চীনের কারখানাগুলোতে ইতিমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শিল্প রোবট রয়েছে। দেশটির সরকার এ বছর কেবল রোবোটিক্স খাতে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এই বিনিয়োগের কেন্দ্রে থাকা চংকিংয়ের লক্ষ্য হলো পশ্চিম চীনের 'সিলিকন ভ্যালি' হওয়া। তবে এখানে এবং পুরো দেশজুড়ে চীনা রোবোটিক্সের ক্ষেত্রে আমেরিকার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে।
রোবটগুলোর জন্য দ্রুতগতির মস্তিষ্কের প্রয়োজন এবং সে কারণেই চীন মার্কিন প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া থেকে আরও বেশি হাই-এন্ড এআই চিপ কিনতে আগ্রহী। চলতি সপ্তাহের ট্রাম্প-শি বৈঠকে এটি একটি বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে।
২০২২ সালে বাইডেন প্রশাসন অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ বন্ধ করে চীনের এআই এবং রোবোটিক্সের অগ্রযাত্রাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই নীতি কিছুটা শিথিল করেছেন। গত বছর তিনি এনভিডিয়াকে চীনে কিছু উন্নত চিপ বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন, তবে সবচেয়ে আধুনিক চিপগুলো এখনও অনুমোদিত তালিকার বাইরে রয়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াইয়ে লিপ্ত, তখন বিশ্লেষকরা মনে করেন যে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের ফলে আরও বড় উদ্বেগের বিষয় রয়েছে।
অনেকে আশঙ্কা করছেন যে, কোনো একটি বাঙ্কারে বসে ল্যাপটপ হাতে থাকা একজন খারাপ মানুষও স্বাস্থ্য পরিষেবায় হ্যাকিং করতে পারে বা পারমাণবিক অস্ত্রের লঞ্চ কোড খুঁজে পেতে পারে। তারা মনে করেন, এটি দুই নেতার জন্য বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার চেয়ে মানবজাতির বৃহত্তর মঙ্গলের কথাও ভাবার সময়।
তবে প্রতিযোগিতাই মূলত বৈঠকের এজেন্ডা নির্ধারণ করবে। চীন ইতিমধ্যে আমেরিকার ওপর প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে নির্ভরতা কমাতে সব ধরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর আমেরিকা এখন চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের গত সফরে সময়ে করা রাজকীয় আয়োজন যুক্তরাষ্ট্রকে চীনা পণ্যের ওপর বিশাল শুল্ক আরোপ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বেইজিং সেই শিক্ষা থেকে নতুন কিছু শিখেছে।
২০২৪ সালে ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট পদের প্রধান দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হন, তখন থেকেই চীনা কর্মকর্তারা কাজ শুরু করেন। তাঁরা ওয়াশিংটনের থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলোর মিটিংয়ে অংশ নেন এবং আবারও শুনতে পান যে ট্রাম্প চীনের 'অন্যায়' বাণিজ্য চর্চা বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।
গত বছর যখন শুল্ক আরোপ করা হয়, তখন চীনই একমাত্র দেশ ছিল যারা পিছু হটেনি। ভঙ্গুর এই বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে নাকি কোনো বড় চুক্তির দিকে যাবে, সেটিই চলতি সপ্তাহের বড় প্রশ্ন। তবে গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহ বেইজিংকে অবশ্যই সাহসী করে তুলেছে।
চংকিংয়ের একটি প্রতিষ্ঠান সাহাইয়ু-র বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রয়কারী লুসিয়া চেন বলেন, "আমরা মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভর করি না।" চংকিং এখন গাড়ি উৎপাদনে চীনের নেতৃত্বে রয়েছে, যা চীনকে বিশ্বের বৃহত্তম গাড়ি উৎপাদনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।
শি জিনপিং এখান থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত সরাসরি রেল সংযোগ তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। চেন এই রেল সংযোগ ব্যবহার করে এখন গ্রাহকদের কাছে আরও বেশি পণ্য বিক্রি করছেন।
কারখানা পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, "আমি চংকিংয়ের ইভি শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আশাবাদী। আমার পরিবার এবং বন্ধুরা সবাই প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ি ছেড়ে ইভি বেছে নিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে পেট্রলের দাম অনেক বেড়ে গেছে এবং অনেক ক্রেতা প্রথমবারের মতো ইভি কেনার কথা ভাবছেন।"
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলেও, ট্রাম্প মূলত যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েই চীনে আসছেন। তিনি তেহরানের বন্ধু বেইজিংয়ের সাহায্য নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা করবেন—যা বিশ্বমঞ্চে চীনের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার আরেকটি ইঙ্গিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের কথা গর্ব করে বলতে পছন্দ করেন এবং তিনি হয়তো মনে করছেন তিনি চীনা নেতার সাথে দরকষাকষি করতে পারবেন।
তিনি এই সম্মেলন থেকে বাস্তবসম্মত কিছু অর্জন করতে চাইবেন। বেইজিং সফর শেষে তিনি যদি বলতে পারেন যে তিনি চীনাদের আরও বেশি মার্কিন পণ্য কিনতে রাজি করিয়েছেন, তবে তিনি একে নিজের বিজয় হিসেবেই দেখবেন।
ভবিষ্যতের এক ঝলক?
চীনের জন্য বিজয় হতে পারে একটি মসৃণ এবং সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সফর।
একটি বাণিজ্য চুক্তি হলে তা অনেক বড় স্বস্তির বিষয় হবে, তবে সেটি ছাড়াও প্রায় এক দশক পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফর শি জিনপিংয়ের সেই বার্তাকেই প্রতিষ্ঠিত করবে যে—চীন বিশ্ব এবং বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত।
বিবিসির প্রতিবেদককে চংকিংয়ের একজন ফটোগ্রাফার বলেন, "আমার মনে হয় চীন বিশ্বের সাথে আরও বেশি যুক্ত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে আরও সমন্বিত হচ্ছে। আগে আপনার মতো সোনালী চুলের মানুষ দেখা এখানে কঠিন ছিল—কিন্তু এখন আমি অনেক বিদেশির দেখা পাই। আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো।"
নদীর ওপারে চংকিংয়ের সেই বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে একটি ট্রেন একটি আবাসিক টাওয়ারের মাঝ দিয়ে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, সেদিকে একদল পর্যটক হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
একজন নারী উচ্ছ্বসিতভাবে তাঁর স্বামীকে ট্রেনের ছবি তোলার জন্য নির্দেশনা দিচ্ছেন—আর তিনি এমনভাবে মুখ নাড়ছেন যেন একটি সুস্বাদু খাবার শেষ করেছেন। এটি হয়তো হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু 'চংকিং ট্রেন ইটিং' ভিডিও এখন ভাইরাল।
৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ কৌতুক করে বলেন যে, সোশ্যাল মিডিয়ার এই পাগলামিতে অংশ নিয়ে তিনি মনে মনে "আরও তরুণ হয়ে উঠছেন।"
শি জিনপিং বিশ্বকে চীনের এই রূপটিই দেখাতে চান। তিনি নিজেকে এক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন, যা অস্থিরমতি ট্রাম্পের ঠিক বিপরীত। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই বিশ্বব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যা বেইজিংয়ের হাতকে শক্তিশালী করেছে।
তাঁর 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয় পক্ষই শুল্কের অস্থিরতায় ভুগছে। ঠিক সেই সময়ে বেইজিং যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং জার্মানিসহ পশ্চিমের একের পর এক দেশের নেতার জন্য লাল গালিচা সংবর্ধনা বিছিয়ে দিয়েছে।
অবশ্যই এটি পুরো চিত্র নয়। চীনে ব্যাপক নজরদারি রয়েছে, সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং সরকার বা দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরণের সমালোচনা সহ্য করা হয় না।
কিন্তু চংকিংয়ে অনেক পর্যটক যা দেখছেন, তা ভবিষ্যতের কোনো সিনেমাটিক দৃশ্যের মতো মনে হতে পারে।
চংকিং শহরের এই রূপান্তরকে সফলতার গল্প বা সতর্ক সংকেত—উভয়ভাবেই দেখা যেতে পারে। তবে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, এটি বিশ্বকে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চীনের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের এক ঝলক উপহার দিচ্ছে।
