সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের ফাটল: এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা কেন এখন প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী?
গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত যখন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়, তখন এর প্রভাব কেবল বৈশ্বিক তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই প্রভাবশালী দেশ—সৌদি আরব ও আমিরাতের এক সময়ের নিবিড় অংশীদারিত্বে বড় ধরনের ফাটল এবং তা প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেওয়ার সর্বশেষ শক্তিশালী ইঙ্গিত।
ঐতিহাসিকভাবেই তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ওপেকে সৌদি আরবের আধিপত্যই চলে আসছে বরাবর। সৌদি আরব তার বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশ্ববাজারের তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে আসত। এই পরিস্থিতিতে চলতি মে মাসেই ওপেক জোট ছাড়ার আমিরাতের সিদ্ধান্ত— দীর্ঘদিনের একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হচ্ছে, যে ব্যবস্থাটি মূলত সৌদি নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত বলে মনে করা হয়।
সৌদি ও আমিরাতি নেতাদের মধ্যে এই মতপার্থক্য রাতারাতি তৈরি হয়নি।
এক দশক আগে সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং আমিরাতের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে আদর্শগতভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখা হতো। দুজনেই ছিলেন উচ্চাভিলাষী এবং 'আরব বসন্ত' পরবর্তী সময়ে নিজেদের শাসনব্যবস্থার ওপর আসা হুমকি মোকাবিলায় এবং মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন রূপ দিতে তারা একযোগে কাজ করেছেন।
তারা সম্মিলিতভাবে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এমনকি সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগে (যা কাতার অস্বীকার করেছিল) প্রতিবেশী কাতারকে একঘরে করার ক্ষেত্রেও তারা একজোট হয়ে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এছাড়া তাদের অভিন্ন আঞ্চলিক শত্রু ইরানের বিরুদ্ধেও তাদের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় ছিল।
কিন্তু বর্তমানে সেই সম্পর্কের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই দুই দেশ এখন আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোতে ক্রমবর্ধমানভাবে একে অপরের বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে, সাংঘর্ষিক জ্বালানি কৌশল অবলম্বন করছে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ নিজদের ঘরে টানতে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে।
তেল ও অর্থনীতির লড়াই
কয়েক দশক ধরে দুবাই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অর্থায়ন, লজিস্টিকস এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু গত ১০ বছরে সৌদি আরবকে ব্যবসা ও পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিশাল পরিকল্পনা দেশটিকে আমিরাতের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে।
সৌদি কর্মকর্তারা এই উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে ঘোষণা দেন, যেসব বহুজাতিক কোম্পানি সৌদি সরকারের লাভজনক চুক্তি পেতে চায়, তাদের অবশ্যই রাজধানী রিয়াদে আঞ্চলিক সদর দপ্তর স্থাপন করতে হবে। গত বছরের মার্চে সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন যে, ইতোমধ্যে ৬০০টিরও বেশি কোম্পানি রিয়াদে তাদের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করেছে।
আমিরাতি কর্মকর্তাদের কাছে এই বার্তাটি ছিল দ্ব্যর্থহীন: সৌদি আরব আর কেবল তেল সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে রাজি নয়, তারা এখন আমিরাতের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যে সরাসরি ভাগ বসাতেও উদ্যত হয়েছে।
উভয় দেশই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈশ্বিক অবকাঠামোর মতো উদীয়মান খাতগুলোতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে—যেখানে তাদের লক্ষ্য মূলত একই বিনিয়োগকারী ও বাজার।
সৌদি আরব দীর্ঘসময় ধরে ওপেক নিয়ন্ত্রণ করে আসলেও, আমিরাতও নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে তেলের উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এখন আমিরাত তার বর্ধিত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বাধীনতা চায়। আমিরাতি কর্মকর্তারা খোলামেলাভাবেই তাদের হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ওপেক তাদের পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করে আরও মুনাফা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।
ইয়েমেন যুদ্ধ: জোট থেকে সংঘাত
পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনে এই ফাটল এখন সবচেয়ে স্পষ্ট। ২০১৫ সালে যখন সৌদি আরব এবং আমিরাত হুথি বিদ্রোহীদের দমনে বিমান হামলা শুরু করেছিল, তখন তাদের লক্ষ্য ছিল ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটিকে হটিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করা। কিন্তু, সময়ের সাথে সাথে সেই লক্ষ্য বিভক্ত হয়ে পড়ে।
ইয়েমেনের সাথে দীর্ঘ ও অরক্ষিত সীমান্ত থাকায়— সৌদি আরব দেশটিকে অখণ্ড রাখার পক্ষপাতি ছিল, যাতে কোনো শত্রুশক্তি তাদের দক্ষিণ সীমান্তে হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়। অন্যদিকে, ইয়েমেনের সাথে কোনো সীমান্ত না থাকা আমিরাত সেখানে নিজস্ব বলয় তৈরি করে। তারা মূলত 'সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল' নামক একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়, যারা দক্ষিণ ইয়েমেনে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করছে। এই মিত্রতার মাধ্যমে আমিরাত আরব উপদ্বীপের দক্ষিণে কৌশলগত বন্দর এবং নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
তবে ২০২৫ সালের শেষদিকে এই ভিন্ন স্বার্থ সরাসরি সংঘাতের দিকে মোড় নেয়— যখন আমিরাত-সমর্থিত বাহিনী দক্ষিণ ও পূর্ব ইয়েমেনের খনিজ সম্পদ-সমৃদ্ধ এলাকাগুলো দখল করে নেয়। এই পদক্ষেপ ছিল সৌদি আরবের কৌশলগত স্বার্থের পরিপন্থী।
এই সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় গত বছরের ডিসেম্বরে, যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে পাঠানো একটি আমিরাতি অস্ত্র চালানের ওপর বিমান হামলা চালায়।
সুদানের ভিন্ন মেরু
সুদানের গৃহযুদ্ধ ঘিরেও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটে উঠেছে, যেখানে লড়াইয়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পতনের পর— সৌদি ও আমিরাত উভয়ই সুদানের রাজনৈতিক পালাবদল নিজেদের অনুকূলে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু সংঘাত বাড়ার সাথে সাথে তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়। সৌদি আরব সরাসরি সুদানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে। রিয়াদ মনে করে সুদানের স্থিতিশীলতা তাদের মিত্র দেশ মিশরের নিরাপত্তা এবং লোহিত সাগর অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, আমিরাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী আধাসামরিক বাহিনী 'র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস'-কে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও আমিরাত এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবে এর সপক্ষে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ফাটল ধরলেও সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি
এই টানাপোড়েন এমনকি হোয়াইট হাউস পর্যন্ত গড়িয়েছে। জানা গেছে, গত নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমিরাতি নেতার সাথে এক ফোনালাপে জানান যে, সুদানের আধাসামরিক বাহিনীকে সমর্থনের অভিযোগে সৌদি যুবরাজ তাকে আমিরাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ করেছিলেন। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততা জনসমক্ষে চলে আসে, যা কয়েক দশকের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের উষ্ণতাকে মুছে দেয়।
তবে এতকিছুর পরেও কোনো দেশই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার ইঙ্গিত দেয়নি। দুই দেশের কর্মকর্তারাই এই সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, বড় কোনো সংকটের সময় তারা সবসময় একজোট হয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন।
গত সোমবার ইরান কর্তৃক আমিরাতের ওপর নতুন করে হামলার পর— সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাৎক্ষণিকভাবে শেখ মোহাম্মদকে ফোন করে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং আমিরাতের নিরাপত্তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
তবে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগের সিদ্ধান্তটি প্রমাণ করে যে, ইরানের সাথে যুদ্ধও দুই নেতার মধ্যে বিদ্যমান মৌলিক উত্তেজনা এবং তিক্ততাকে মুছে দিতে পারছে না। উপসাগরীয় এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার এই শীতল সম্পর্ক আগামী কয়েক বছর এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
