হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগরে হামলা; যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ার মুখে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি
সোমবার হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে দুই পক্ষ যখন আলোচনার টেবিলে সমঝোতায় পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।
সোমবার সকালে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ার এবং সেগুলোর পেছনে থাকা দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় হামলার শিকার হয়। এটি ওই জলপথে মার্কিন সামরিক তৎপরতা বাড়ানোরই একটি অংশ। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি জ্বালানি কেন্দ্রে ইরানি হামলার খবর দিয়েছে। এছাড়া, ওমানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও সে দেশে একটি হামলার কথা জানানো হয়েছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, ইরান মার্কিন নৌযান ও বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ছুড়লেও কোনোটিই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি। তিনি আরও জানান, ইরান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর পেছনে ছয়টি গানবোট পাঠালে মার্কিন বাহিনী সেগুলো লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং ধ্বংস করে দেয়।
তবে এই হামলার ফলে যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
পৃথক এক ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, 'সম্ভবত দক্ষিণ কোরিয়ার এখন এই মিশনে যোগ দেওয়ার সময় এসেছে!'
এর আগে সোমবার সকালেই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান সতর্ক করে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো মার্কিন নৌযানকে 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
আইআরজিসি নেতা আহমদ ওয়াহিদি এক্সে এক পোস্টে বলেন, 'মার্কিন প্রেসিডেন্টের টুইটে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না; এই জলপথের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কেবল ইরানের হাতেই রয়েছে।'
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেহরানের প্রণালি 'ব্যবস্থাপনায়' যুক্তরাষ্ট্রের 'হস্তক্ষেপের' যেকোনো চেষ্টা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। তেল ও গ্যাস পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি গত ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে চলা কয়েক সপ্তাহের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ইরান এই পথে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
উভয় পক্ষ পাকিস্তানে সরাসরি বৈঠক এবং বেশ কিছু প্রস্তাব বিনিময় করলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন প্রধান ইস্যু নিয়ে বড় ধরণের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইরানের একটি দাবি; তারা এই প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তাদের জব্দ করা সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বড় ধরনের বিমান হামলা চালানোর পর তেহরান এই প্রণালির বিভিন্ন অংশে মাইন বসায়। এরপর থেকে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর জন্য ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে এবং তেহরান এখন জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল দাবি করছে। অন্য জাহাজগুলো হামলার শিকার হচ্ছে।
তেহরান এই জলপথটি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে অনেক দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন আকাশচুম্বী। এর জবাবে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে।
সোমবার অ্যাডমিরাল কুপার জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরে আটকা পড়া ৮৭টি দেশের শত শত জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ করছে যুক্তরাষ্ট্র, যাতে তাদের এই প্রণালি নিরাপদে পার হতে সহায়তা করা যায়। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তারা এই জলপথ সচল করতে আরও সামরিক পদক্ষেপ নেবে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের একটি যৌথ উদ্যোগ শুরু করেছে।
রোববার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো সেই সব মানুষ, কোম্পানি এবং দেশগুলোকে মুক্ত করা যারা কোনো অন্যায় করেনি—যারা স্রেফ পরিস্থিতির শিকার।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই মিশনের নাম দেওয়া হয়েছে 'প্রজেক্ট ফ্রিডম'। সেন্টকম সোমবার জানিয়েছে, এই অভিযানে গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, নৌ ও বিমানবাহিনীর ১০০-এর বেশি যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং ১৫ হাজারেরও বেশি সেনা অংশ নিচ্ছে।
অ্যাডমিরাল কুপার জানান, সোমবার যে দুটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার প্রণালি পার হয়েছে, সেগুলো কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দিচ্ছিল না। বরং ওই জলপথটি জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ ও পরিষ্কার করার কাজ করছিল তারা।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, সোমবার তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। প্রায় এক মাসের মধ্যে দেশটিতে এটিই প্রথম বড় কোনো হামলার ঘটনা। তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ফুজাইরাহতে ইরানি হামলার কারণে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
এছাড়া আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি অ্যাডনকের একটি ট্যাংকার ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। তবে হামলার সময় ট্যাংকারটি খালি ছিল।
ওমানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এক 'নিরাপত্তা সূত্রে'র বরাতে জানিয়েছে, মুসানদাম উপদ্বীপের একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় দুইজন আহত হয়েছেন। ওই হামলায় ভবনের জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে এবং চারটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ এখনো কঠোরভাবে বহাল রয়েছে। দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং একঝাঁক যুদ্ধজাহাজ বর্তমানে সেই সব বাণিজ্যিক জাহাজকে আটকাচ্ছে যারা ইরানি বন্দরে গিয়েছিল অথবা ইরানি তেল ও পণ্য বহন করছে।
মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা এ পর্যন্ত ৪৮টি জাহাজকে হয় ইরানে ফেরত পাঠিয়েছে অথবা মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজকে অকেজো করতে গুলিও চালানো হয়েছে, কারণ সেটি অবরোধ ভেঙে পালানোর চেষ্টা করছিল।
