ট্রাম্পের জাহাজ উদ্ধারের ঘোষণার পরই হরমুজের কাছে এলেই হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের
ইরানের সামরিক বাহিনী সোমবার যুক্তরাষ্ট্রকে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ না করতে সতর্ক করে দিয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে মুক্ত করতে সহায়তা শুরু করবে, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে আটকা পড়েছে।
ট্রাম্প এ পরিকল্পনা সম্পর্কে খুব বেশি বিস্তারিত জানাননি। তিনি বলেন, দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে আটকে থাকা জাহাজ ও তাদের ক্রুরা খাদ্য ও অন্যান্য সরবরাহ সংকটে পড়েছে।
রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তিনি বলেন, 'আমরা এসব দেশকে জানিয়েছি, আমরা তাদের জাহাজগুলোকে নিরাপদে এই সীমাবদ্ধ জলপথ থেকে বের করে দেব, যাতে তারা স্বাভাবিকভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে।'
এর জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ইউনিফায়েড কমান্ড যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলে, তারা যদি কোনো হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে 'কঠোরভাবে জবাব' দেওয়া হবে।
তারা বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো ধরনের চলাচল না করতে।
ইউনিফায়েড কমান্ডের প্রধান আলি আবদুল্লাহি বলেন, 'আমরা বারবার বলেছি যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা আমাদের হাতে এবং জাহাজ চলাচল আমাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই হতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা সতর্ক করছি—যেকোনো বিদেশি সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে আক্রমণাত্মক ইউএস আর্মি, যদি এই প্রণালির কাছে আসতে বা প্রবেশ করতে চায়, তাহলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে।'
অন্যদিকে, ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা এই মিশনে ১৫ হাজার সেনা, ১০০টির বেশি বিমান, যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন দিয়ে সহায়তা করবে।
সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, 'এই প্রতিরক্ষামূলক মিশনে আমাদের সহায়তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে শত শত জাহাজ ও প্রায় ২০ হাজার নাবিক এই প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পরপরই ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানায়, একটি ট্যাংকার অজ্ঞাত উৎস থেকে নিক্ষিপ্ত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, ঘটনাটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ থেকে ৭৮ নটিক্যাল মাইল উত্তরে ঘটেছে, তবে ক্রুরা নিরাপদ রয়েছে।
গত দুই মাস ধরে ইরান নিজের জাহাজ ছাড়া প্রায় সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে, যার ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।
কিছু জাহাজ গুলির মুখে পড়েছে, আবার কিছু জাহাজ ইরান আটক করেছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দর থেকে আসা জাহাজের ওপর অবরোধ (blockade - ব্লকেড) আরোপ করে।
ট্রাম্প প্রশাসন একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে, যাতে এই প্রণালি নিরাপদ রাখা যায়। সেন্টকম জানিয়েছে, এতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও সামরিক সমন্বয় একসঙ্গে থাকবে।
তবে কোন কোন দেশ এতে অংশ নেবে বা এটি কীভাবে কাজ করবে—তা এখনো পরিষ্কার নয়।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য দেয়নি।
ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'এই অভিযানে কেউ বাধা দিলে শক্তভাবে মোকাবিলা করা হবে।'
শান্তি প্রস্তাবের মার্কিন প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে ইরান
সোমবার ইকুইটি মার্কেট বা শেয়ার বাজার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল, তবে অপরিশোধিত তেলের দাম খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি, যা গত সপ্তাহে সংঘাতের অনিশ্চয়তার কারণে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে উঠে গিয়েছিল।
রোববার ইরান জানায়, তারা তাদের সর্বশেষ শান্তি আলোচনার প্রস্তাবের বিপরীতে মার্কিন প্রতিক্রিয়া পেয়েছে; যার একদিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি সম্ভবত ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবেন কারণ 'তারা যথেষ্ট বড় মূল্য দেয়নি'। রোববার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প কোনো বিস্তারিত তথ্য না দিয়েই বলেন যে আলোচনা "খুব ভালো" চলছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, ওয়াশিংটন পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের ১৪-দফা প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং তেহরান এখন সেটি পর্যালোচনা করছে। তবে ওয়াশিংটন বা ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন প্রতিক্রিয়ার কোনো তাৎক্ষণিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইকে উদ্ধৃত করে বলেছে, "এই পর্যায়ে আমাদের কোনো পারমাণবিক আলোচনা নেই"। এই মন্তব্যটি স্পষ্টতই যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং উভয় পক্ষের অবরোধ তুলে নিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা সরিয়ে রাখার ইঙ্গিত ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল চার সপ্তাহ আগে ইরানের বিরুদ্ধে তাদের বোমাবর্ষণ অভিযান স্থগিত করেছিল এবং মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা এক দফা আলোচনা করেছিলেন। তবে পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাব বনাম ওয়াশিংটনের দাবি
পারমাণবিক আলোচনার বিষয়টি পরবর্তী ধাপের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার এই প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের সেই দাবির সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে হচ্ছে, যেখানে তারা বারবার বলেছে যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে ইরানকে অবশ্যই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ গ্রহণ করতে হবে।
ওয়াশিংটন চায় তেহরান তাদের ৪০০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করুক, যা যুক্তরাষ্ট্রের মতে বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। ইরান দাবি করে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, যদিও তারা নিষেধাজ্ঞার অবসানের বিনিময়ে কিছু বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা করতে ইচ্ছুক। ইরান ২০১৫ সালের একটি চুক্তিতে এই ধরনের বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল যা ট্রাম্প পরবর্তীতে বাতিল করেছিলেন।
ট্রাম্প বারবার বলছেন যে তার কোনো তাড়া নেই, তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে তিনি অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে আছেন। এই প্রণালির অচলাবস্থা বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল বা গ্যাসোলিনের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী সংসদীয় নির্বাচনে উচ্চ মূল্যের কারণে ভোটারদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের ১৪-দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে কাছাকাছি এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা, ক্ষতিপূরণ প্রদান, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং প্রণালীর জন্য একটি নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা।
