সমাবেশে পদপিষ্টের ধাক্কা সামলে যেভাবে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে বিজয়
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কারুর জেলায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক দল তামিলাগা ভেট্টরি কাজাগাম বা টিভিকে'র সমাবেশে গরমে আর ভিড়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৪০ জনের বেশি মানুষের। এই দলের প্রধান জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয় থালাপতি। তবে এই প্রাণহানির ঘটনা অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া এই নেতার জনপ্রিয়তাকে একটুও ম্লান করতে পারেনি। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়েই ঐতিহাসিক জয়ের পথে দলটি।
তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা স্থানীয় সময় আজ সকাল ৮টায় শুরু হয়। এর পর থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে দলটির এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া যায়।
স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, টিভিকে ১০৫টিরও বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজগম (ডিএমকে) মাত্র ৫৮টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজগম (এআইএডিএমকে) এগিয়ে রয়েছে ৪৫টি আসনে।
তবে থালাপতির এই বিজয়ের পথ একেবারে মসৃণ ছিল না। কারুর জেলায় টিভিকে'র সমাবেশে হতাহতের ঘটনা তার রাজনৈতিক যাত্রায় বড় ধাক্কা দেয়। ঘটনার পর তার আচরণ নিয়েও সমালোচনা হয়। তবে প্রাণঘাতী এ ঘটনার দাগ লাগলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ আগামীর নেতৃত্ব হিসেবে থালাপতির দলের ওপরেই আস্থা রেখেছেন। প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই এমন ফলাফল একটি নতুন দলের জন্য চমকপ্রদ সাফল্য বলাই যায়।
টিভিকে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের মাধ্যমে জনগণের সামনে নিজেদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়। ইশতেহারে তারা নারী অধিকার ও বেকার স্নাতকদের মতো গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর ওপর জোর দেয়।
নির্বাচনি প্রচারণায় থালাপতির দল তামিলনাড়ুর প্রত্যেক নারীকে মাসে আড়াই হাজার রুপি, বেকার স্নাতকদের জন্য ১০ হাজার রুপি, সমবায় কৃষিঋণ মওকুফ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মন্ত্রণালয় গঠনের মতো বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়। আর এসব প্রতিশ্রুতি তামিলনাড়ুর ভোটারদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।
২০০৯ সালে যেভাবে শুরু
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, থালাপতির এই জয় একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উত্থানের ফল, যেখানে ভক্তদের সমর্থন শক্তিশালী নির্বাচনি যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। আর এই মুহূর্তটি বহু বছর ধরে তৈরি হচ্ছিল।
২০০৯ সালে 'বিজয় মক্কাল ইয়াক্কাম' নামে ভক্তদের সংগঠিত করে সামাজিক কাজের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ভিত্তি তৈরি করেন থালাপতি। পরে ধীরে ধীরে সেই সংগঠনই রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়। এর পর ২০২১ সালে স্থানীয় নির্বাচনে সংগঠনটি ব্যাপক জনসমর্থনও পায়। রাজনৈতিক দল গঠন করার পর থেকেই বিশাল জনপ্রিয়তা পাচ্ছিলেন থালাপতি। তার সভায় মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। এবার সেই জনসমর্থনই ভোটে পরিণত হয়েছে।
সংগঠন গড়ে তোলার পাশাপাশি থালাপতির রাজনৈতিক বার্তাও পরিবর্তিত হয়। জনসমক্ষে উপস্থিতিতে তিনি বেকারত্ব, শিক্ষা, দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার ওপর জোর দেন, যা ভোটারদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
তামিল রাজনীতিতে এতদিন ডিএমকে ও এআইএডিমকের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে টিভিকে গঠনের সময়ের মধ্যেই থালাপতি নিজেকে এম কে স্টালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। কোনো দলের সঙ্গে জোট গড়ার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
গত বছরের ডিসেম্বরে থালাপতি চলচ্চিত্র জগৎ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিন দশকের ক্যারিয়ার শেষে তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। পরবর্তী কয়েক মাসে তার দলকে টিভিকের নাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে যায় তার দলের ব্যাপ্তি। বহু মানুষ তার দলে যোগ দেন।
থালাপতির উত্থানকে তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামাচন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তিনিও অভিনয় ছেড়ে রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। তার দল ছিল এআইএডিএমকে। ১৯৭৭ সালে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
