নৌ-অবরোধের মধ্যেই মার্কিন নৌসচিবকে বরখাস্ত করল পেন্টাগন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সচিব (নেভি সেক্রেটারি) জন ফেলানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বুধবার পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, ফেলানের এই বিদায় 'অবিলম্বে কার্যকর' হবে। তার জায়গায় নৌবাহিনীর আন্ডার সেক্রেটারি হাং কাও ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে বিদায় নেওয়া উচ্চপদস্থ সামরিক নেতাদের মধ্যে ফেলান সর্বশেষ সংযোজন। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে। এর মাঝেই নৌবাহিনীর সচিবকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো।
শন পার্নেল তার পোস্টে লেখেন, 'প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আমরা জন ফেলানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। মার্কিন নৌবাহিনী এবং এই দপ্তরের প্রতি তার সেবার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভকামনা রইল।' তবে ফেলানকে কেন সরিয়ে দেওয়া হলো, সে বিষয়ে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো কারণ জানানো হয়নি।
কয়েক সপ্তাহ আগেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ র্যান্ডি জর্জকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এছাড়া, সেনাবাহিনীর আরও দুই শীর্ষ কর্মকর্তা—জেনারেল ডেভিড হডন এবং মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিনকেও তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
পেন্টাগনে যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এখন পর্যন্ত নৌবাহিনীর প্রধান ও বিমানবাহিনীর ভাইস চিফ অব স্টাফসহ এক ডজনের বেশি জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন।
মার্কিন নৌবাহিনীর সচিবের পদটি মূলত একটি প্রশাসনিক পদ। নীতি প্রণয়ন, লোকবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও নৌবাহিনীকে সজ্জিত করার পাশাপাশি নৌযানের মেরামত ও বাজেটের দিকটি দেখভাল করা তার দায়িত্ব।
জন ফেলান মূলত একজন বেসামরিক ব্যবসায়ী, যার কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বড় অঙ্কের অর্থ অনুদান দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে নৌবাহিনীর সচিব হিসেবে মনোনীত করেন এবং ২০২৫ সালের মার্চে তিনি শপথ নেন।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প যখন তার নিজের নামে নৌবাহিনীর নতুন সিরিজের ভারী অস্ত্রবাহী 'যুদ্ধজাহাজ' চালুর ঘোষণা দেন, তখন মার-এ-লাগোতে তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ফেলান। ট্রাম্পের এই 'গোল্ডেন ফ্লিট' পরিকল্পনায় ফেলানের সমর্থন ছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অ্যান্ড্রু পিক বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্প দেশের বাণিজ্যিক ও বেসামরিক নৌবহর সম্প্রসারণের বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ছিলেন। তিনি বলেন, 'এই কাজে ধীরগতির জন্য কাউকে না কাউকে তো বলির পাঁঠা হতেই হতো। আমার ধারণা, ফেলানকে সরানোর পেছনে ৩০ শতাংশ কারণ হলো এটি।'
পিক আরও বলেন, 'বাকি ৭০ শতাংশ কারণ হলো রাজনৈতিক। ফেলানের জায়গায় যাকে আনা হচ্ছে, তিনি কট্টর ট্রাম্প সমর্থকদের (মাগা বেস) কাছে খুব পরিচিত। আমার মনে হয়, ট্রাম্প এমন একজনকে বেছে নিয়েছেন, যাকে তিনি বেশি পছন্দ করেন এবং বেশি ভরসা করেন।'
ফেলানের স্থলাভিষিক্ত হতে যাওয়া হাং কাও একজন নৌ-সেনা হিসেবে ২৫ বছর কাজ করেছেন। তিনি ২০২৫ সালের অক্টোবরে নৌবাহিনীর আন্ডার সেক্রেটারি হন।
২০২৪ সালে ভার্জিনিয়া থেকে মার্কিন সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টিম কেইনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন কাও। ট্রাম্পের সমর্থন থাকলেও সেই নির্বাচনে তিনি হেরে যান। নির্বাচনী বিতর্কের সময় সামরিক বাহিনীতে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি।
নৌবাহিনীতে নিয়োগের বিষয়ে ওই বিতর্কে কাও বলেছিলেন, 'আমাদের এমন আলফা পুরুষ ও নারী দরকার, যারা নিজেদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে খেয়ে ফেলবে এবং আরও চাইবে। এ রকম তরুণেরাই যুদ্ধে জয় এনে দেবে।'
অবরোধ চলবে, জানালেন ট্রাম্প
নৌবাহিনীর এই শীর্ষ পদে রদবদলের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি চললেও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বের তেল সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে এখনো সংঘাত চলছে। এরই মধ্যে প্রণালি থেকে দুটি জাহাজ 'জব্দ' করার কথা জানিয়েছে ইরান।
এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ইরানি বন্দরগুলোতে চলমান মার্কিন নৌ-অবরোধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট 'সন্তুষ্ট'। তিনি বুঝতে পেরেছেন যে, 'ইরান এখন অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।'
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রধান ইরানি মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বুধবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া অসম্ভব।
