কালি ও ধ্বংসস্তূপ: ইরানের বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তার ওপর পরিকল্পিত আঘাত
যুদ্ধ ধ্বংসের সূচনা করে, বয়ে আনে নিষ্ঠুরতা। যুদ্ধের আগুনেই ঝড়ে হাজারো মানবজীবন। একই সঙ্গে আক্রান্ত দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাও পড়ে সংকটে। ইরান যুদ্ধে মানবিক ট্রাজেডি যেমন ঘটেছে দেশটির বাসিন্দাদের, তেমনি বুদ্ধিবৃত্তিক আঘাতও এসেছে দেশটির ওপর। পাকিস্তানের একজন প্রখ্যাত গবেষক ও কৌশলবিদ জহরা আলী সৈয়দ। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরানের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গভীরতা—তিনি তুলে ধরেছেন ইরান ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে তুলনা করে। আরও তুলে ধরেছেন পশ্চিমা অপপ্রচারের ডামাডোলে ইরানের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে ক্ষেত্রটি উপেক্ষিত থাকে সেটিকেও। একটি সমৃদ্ধ সভ্যতার ওপর নগ্ন আগ্রাসনে তার হ্রদয়ের যে রক্তক্ষরণ এবং এটি বৈশ্বিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্যও যে অপরিসীম ক্ষতিও—সেটিও নিজ লেখায় তুলে ধরে বিশ্বের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় ও আপামর জনতার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অন্যায্য এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। দেশটির প্রথমসারির ইংরেজি দৈনিক দ্য ডনে ছাপা হয়েছে এনিয়ে তার লেখা। টিবিএসের পাঠকদের জন্য সেটির ভাবানুদিত ও সংক্ষেপিত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো তারই জবানিতে—
গত বছর ইরানে ঈদ উদযাপনের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছিল এই অঞ্চলে হঠাৎ শুরু হওয়া আগ্রাসনের তীব্রতায়। যা হওয়ার কথা ছিল একান্তই এক ব্যক্তিগত তীর্থযাত্রা, তা শেষ পর্যন্ত ভূ-রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়।
তবে ভাগ্যের এক অদ্ভুত মোড় আসে গত সেপ্টেম্বরে। কোনো ছুটি কাটাতে নয়, বরং তেহরানের ইমাম খোমেনী (ইকেএ) বিমানবন্দরে আমার পা পড়ে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ গবেষকদের জন্য প্রবর্তিত 'মুসলিম বিশ্বের নোবেল' খ্যাত 'মুস্তাফা (সা.) পুরস্কার' অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে। ৬ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই পুরস্কার সপ্তাহটি আয়োজন করে 'মুস্তাফা (সা.) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফাউন্ডেশন', যা মূলত মানুষের জ্ঞানানুসন্ধানের অবিনাশী ক্ষমতারই এক সাক্ষ্য।
ভেবেছিলাম, চারদিকের যুদ্ধাবস্থার কারণে অনুষ্ঠানটি হয়তো হবে বিষাদময় ও নিস্তব্ধ।
কোমের মরমী জগৎ
মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে পবিত্র নগরী কোম পরিদর্শনের ইচ্ছা ছিল আমার। আয়োজকরা আমার জন্য দুই নারী গাইড নিয়োগ করেন। প্রফুল্ল চিত্তের ওই দুই নারী আমাকে শহরের নজরকাড়া লবণের পাহাড় আর খনিজ সমৃদ্ধ রংধনু রঙের পাথুরে এলাকা ঘুরিয়ে দেখান।
কোম শহরটি আপনাকে স্বাগত জানাবে স্বচ্ছ নির্মল বাতাস আর স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা দিয়ে। দিনটি ছিল শুক্রবার, তাই পুরো শহরেই এক নির্ভার প্রশান্তি বিরাজ করছিল। জুমার নামাজের জন্য রাস্তাঘাট লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠলেও—কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা বা চাপের ছাপ ছিল না। অষ্টম শিয়া ইমাম, ইমাম আলী রেজা (আ.)-এর বোন বিবি মাসুমার মাজারের দিকে বাগানঘেরা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আমি বুঝতে পারলাম, কেন কোমকে 'সুফি-সাধকদের ভূমি' বলা হয়। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করা বিবি মাসুমা শিয়া ইসলামে অত্যন্ত সম্মানিত এক নারী, যাঁর উপস্থিতিতে এই শহরটি ইরাকের নাজাফের মতোই আধ্যাত্মিকতা ও শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তবে কোমকে কেবল একটি সংজ্ঞায় বেঁধে রাখা কঠিন।
মাজারের বিপরীত দিকে এক ভারতীয়ের দোকানের জানালায় তাকাতেই বলিউড সিনেমার পোস্টার আমার চোখে পড়ে। তার পাশেই সারিবদ্ধ জ্ঞানগর্ভ বইয়ের দোকান এবং নিঝুম ক্যাফেগুলো পর্যটকদের স্বাগত জানাচ্ছে।
এর আগেরবার যখন ইরান এসেছিলাম, কোম থেকে কাশান যাওয়ার বাসে বসে আমি ফারসি ভাষায় ডাবিং করা 'মিশন ইম্পসিবল' সিনেমা দেখেছিলাম। সেখান থেকেই আমি 'যোধা আকবর' সিনেমার ডাবিং করা সংস্করণটি কিনি। মোগল সম্রাট আকবরের দরবারের ভাষা ফারসি হওয়ায়, ওই সংস্করণটি আমার কাছে আরও বেশি ইতিহাসসম্মত বলে মনে হয়েছে।
ইরানের এই বিষয়টিই আমাকে বারবার অনুপ্রাণিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে এই সভ্যতার নাড়ির টান অনেক গভীর—ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলের ভাষা, নন্দনতত্ত্ব ও ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে ইরানের প্রভাবে।
কোমের অন্যতম দর্শনীয় স্থান জামকারান মসজিদ পরিদর্শনের আগে আমরা পাহাড়ের কাছে দুপুরের খাবার সারলাম। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল ঝলসানো কাবাব, গ্রিল করা টমেটো আর জাফরান চালের ভাত। কোমের উপকণ্ঠে অবস্থিত মসজিদের বিশাল প্রাঙ্গণ, আঙিনা আর বইয়ের দোকানগুলো আমাদের ভাবনার এক নতুন খোরাক জোগাল, যা পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রচারিত ইরানের 'যুদ্ধবিধ্বস্ত' প্রতিচ্ছবির ঠিক উল্টো।
কিন্তু আমার মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে সেখানকার জীবনযাত্রার সাবলীলতা—যেখানে আধ্যাত্মিকতা, সুস্থ জীবনযাপন আর নগর পরিকল্পনা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি সুসংগত কাঠামোর অংশ। শহরটি সবুজ, পায়ে হাঁটার জন্য চমৎকার এবং গল্পরত পরিবার, হাসিখুশি শিশু আর আলাপচারিতায় মগ্ন দম্পতিদের পদচারণায় মুখরিত। সবচেয়ে বড় কথা, কারও মাথা মুঠোফোনের স্ক্রিনে ঝুঁকে ছিল না।
আমি দেখলাম মাথায় 'আমামা' (এক ধরনের পাগড়ি) পরা একজন আলেমকে, আবার অন্যজনকে দেখলাম তাঁর পরিবারের সঙ্গে পিৎজা খাচ্ছেন। ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একপেশে প্রচারণার ভিড়ে এমন দৃশ্য কল্পনা করাও কঠিন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা কঠোর বয়ানগুলো এই বাস্তবতাগুলোকে আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু কোম সেই খণ্ডিত ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
এখানে আধ্যাত্মিকতা জগতসংসার থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং জগতকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। নারী ও পুরুষ উভয়কেই শরীরচর্চা, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, শেষ রাতে 'সালাতুল লায়ল' বা তাহাজ্জুদ পড়ার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা করাকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করা হয়। এখানে কবিতা এবং ঐতিহ্য জাদুঘরে বন্দি কোনো প্রত্নবস্তু নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনে মিশে থাকা এক জীবন্ত শক্তি।
নন্দনতত্ত্বের বিউপনিবেশায়ন
তেহরানে ফেরার পথে প্রবল যানজট দুই ঘণ্টার পথকে চার ঘণ্টায় পরিণত করল, যা মনে করিয়ে দিল শহরটি কতটা প্রাণবন্ত।
মুস্তাফা (সা.) পুরস্কার সপ্তাহ শুরু হলো এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, যা আমার কাছে ঘরে ফেরার মতো মনে হয়েছে। এমএসটিএফ-এর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের পরিচালক মাহদি আমিনী আমাকে যে অভিবাদন জানালেন, তাতে পুরো সপ্তাহের মূল সুরটি ফুটে ওঠে: "আমি ইমাম হোসেনকে (আ.) ভালোবাসি; আপনি যে এখানে নিরাপদে পৌঁছাবেন, তা নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না।"
এই আধ্যাত্মিক আবহটি আমাকে সর্বত্রই অনুসরণ করেছে। আমার হোটেলের রুমে একটি মার্জিত বাক্সে থ্রিডি প্রিন্টেড কলম উপহার হিসেবে রাখা ছিল, যার গায়ে কোরআনের সেই আয়াতটি উৎকীর্ণ: "নুন। শপথ কলমের এবং তারা যা লিখে তার।" (সূরা আল-কলম)।
সঙ্গে একটি বার্তাও ছিল: "কলমের শপথ এবং যা কিছু এটি লিখে রাখে... জ্ঞানকে লেখনীর মাধ্যমে আবদ্ধ করো।"
আলোর রশ্মির মতো আকৃতির ওই কলমটি একটি গূঢ় অর্থ বহন করছিল—এটি মূলত ব্যবহারকারীর হাতের 'আলো' হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
এই দর্শনটি অনুষ্ঠানের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে ছিল, এমনকি গভীর রাতের খাবারেও। জাফরান ও পেস্তা মিশ্রিত চা পান শেষে আমরা রাতের শেষ খাবারটি খেতে বের হলাম। রেস্তোরাঁয় পৌঁছে মুগ্ধ হই। নকশাদার টেবিল ক্লথ, দেয়ালে সূক্ষ্ম কারুকাজ আর লাইভ মিউজিক বা জীবন্ত সংগীতের উপস্থিতি কোনো 'ঔপনিবেশিক হ্যাংওভার' বা রেশ রাখেনি। ওই পরিবেশটি অন্য কোনো জায়গা থেকে তার নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব ধার করেনি।
প্রকৃতিঘেরা স্মার্ট সিটি
পরের দিন সকালে বিশ্বজুড়ে মুসলিম বিজ্ঞানীরা একত্রিত হলেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মূল কার্যক্রম শুরু হলো। অধিবেশনগুলোতে অংশ নিতে আমরা আমির কবির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে শুরু করে পারদিস টেকনোলজি পার্কের চূড়া পর্যন্ত ভ্রমণ করলাম।
একজন স্থায়িত্বশীলতা বা টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি তেহরানের প্রেমে পড়ে গেলাম। দীর্ঘ সবুজ বেষ্টনী, ঘন বৃক্ষরাজি এবং আধুনিক 'স্মার্ট সিটি' মডেল—যেখানে কংক্রিটের চেয়ে মানুষের সামাজিক সংযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতি-নির্ধারণী গোলটেবিল বৈঠকে নারী বিজ্ঞানীদের সরব উপস্থিতি আমাকে অবাক করেছে। তাঁরা কেবল অংশগ্রহণই করছিলেন না, বরং নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের 'ইয়াং সায়েন্টিস্ট মেডেল' জয়ী ড. বুসে সেভাতেমরে'র কথা বলা যায়। ক্যানসার বায়োলজি নিয়ে তাঁর কাজ আগামী প্রজন্মের জন্য এক আলোকবর্তিকা।
পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুজন ছিলেন নারী—একজন ইরানের স্থানীয় এবং অন্যজন তুরস্কের; এ ছাড়া মালয়েশিয়ার একজন পুরুষ বিজ্ঞানীও তাঁর গবেষণার জন্য পুরস্কৃত হন। অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়েছিল তেহরান বুক গার্ডেনে, যা রোজমেরি আর ল্যাভেন্ডারের বাগানে ঘেরা এক অনন্য স্থাপত্য। তাঁদের দেখে মনে হলো, একটি অঞ্চলের পতন নিয়ে পশ্চিমাদের যে বয়ান, তার এক জোরালো জবাব এটি।
পাকিস্তানের একজন শিয়া মুসলিম হিসেবে আমার কাছে অনুষ্ঠানের সবচেয়ে চমৎকার দিকটি ছিল সেখানকার মিউজিক্যাল সেটিং বা সংগীতের আবহ। মঞ্চের পেছনে আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির ছবি থাকলেও সেখানে অবলীলায় সংগীতের মূর্ছনা বাজছিল, যা ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের এক বিরল মিলনমেলা।
পাকিস্তানে ধর্মীয় বা জ্ঞানগর্ভ অনুষ্ঠানে সংগীতের তেমন সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু ইরানে এই জগতগুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, যা জীবন যাপনের অনেক বেশি সুসংহত ও টেকসই উপায় বলে আমার মনে হয়েছে।
এক সন্ধ্যায় 'ব্লাড মুন' বা রক্তিম চন্দ্রগ্রহণের নিচে আমরা পারদিস টেকনোলজি পার্কের উচ্চ প্রযুক্তির গবেষণাগারগুলো ঘুরে দেখলাম। উদ্ভাবনের গল্পের ভিড়েও আমার চোখ আটকে গেল অলংকারিক ঘাসের মাঝখানে এক খিলানযুক্ত স্থাপনায়। সেখানে দেশের সুরক্ষায় জীবন উৎসর্গ করা দুজন শহীদের কবর। ইরানে পবিত্রতা আর বিজ্ঞানের অবস্থান কখনোই খুব দূরে নয়। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই শহীদরা 'জীবিতদের মাঝেই বিচরণ করেন'।
পরে পরিবেশ বিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে আমি সৌদি আরব থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলাম। আমরা অনেকেই যৌথ গবেষণাপত্র তৈরির জন্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছি, যা এই অনুষ্ঠানের রেশ বহুদূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
সবুজ রূপরেখা
একই ধরনের অভিজ্ঞতা হলো মাশহাদ শহরেও। স্বনির্ভর নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই শহরটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মাশহাদ ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সে গিয়ে আমি দেখলাম স্বাস্থ্যসেবাকে সেখানে নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়। প্রতিটি পাড়ায় রয়েছে নিজস্ব স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যেখানে পুষ্টি সহায়তা থেকে শুরু করে মানসিক স্বাস্থ্যের কাউন্সিলিং পর্যন্ত সব সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান। এমনকি যেকোনো যুগল বিয়ের আগে বাধ্যতামূলক কাউন্সিলিং এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়।
আমি ভাবছিলাম, দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মধ্যে থেকেও কীভাবে এমন চমৎকার স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে শহরের পরিবেশগত দূরদর্শিতা আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। আমি সেখানকার নগর কৃষি প্রকল্পগুলো ঘুরে দেখলাম, যেখানে অব্যবহৃত জায়গাগুলোতে পেস্তা, ডালিম আর এপ্রিকটের বাগান করা হয়েছে। এগুলো কেবল বাগান নয়, বরং এক উন্নত সবুজ জ্বালানি ইকোসিস্টেমের অংশ।
সান অ্যান্ড এয়ার রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসএআরআই বা সারি) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ১০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন উইন্ড টারবাইন বা বায়ুকল তৈরি করছে। এখানে গবেষণাগার থেকে শুরু করে ফলের বাগান—সবখানেই নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এসব গবেষণাগারের ভেতরেই আমার দেখা হলো লেবাননের এক স্টেম সেল বিজ্ঞানীর সঙ্গে, যাঁর জীবনে এক ভয়াবহ দ্বৈততা কাজ করছে। এক মুহূর্তে তিনি কোষের পুনর্জন্ম নিয়ে কথা বলছেন, আর পরের মুহূর্তেই বর্ণনা করছেন দক্ষিণ লেবাননে তাঁর বসতবাড়ি ধ্বংস হওয়ার গল্প।
তিনি বলছিলেন, কীভাবে সুন্দর বাগানগুলো কামানের গোলা আঘাতে গর্তে পরিণত হয়েছে। বললেন, স্বজনদের মরদেহ উদ্ধারের নিদারুণ যন্ত্রণার কথা। আমাদের 'দ্য গ্রিন পিলগ্রিম' সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীদের জন্যও এই যুদ্ধ ছিল খুবই ব্যক্তিগত। আমাদের একজন ২৩ বছর বয়সী ডেটা সায়েন্টিস্ট বৈরুতে বোমাবর্ষণের মধ্যে আশ্রয়ে ছুটতে বাধ্য হয়েছিলেন। কোনো নিয়মিত কাজ না থাকায় তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতিবেশীদের উদ্ধারে দিন কাটিয়েছেন।
জ্ঞানযুদ্ধের শরীর ব্যবচ্ছেদ
আমি এই স্মৃতিগুলো পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি, কারণ যুদ্ধের বর্তমান কাঠামোটি অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে বাস্তবতাকে আড়াল করছে। আমরা যা দেখছি তা হলো একটি সমাজের ভিত্তি—তাদের সন্তান, পণ্ডিত এবং চিকিৎসকদের ওপর এক সুপরিকল্পিত হামলা।
মিনাব স্কুলে হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হওয়া, যাঁদের অধিকাংশ স্কুলছাত্রী—তা আন্তর্জাতিক আইনের এক চরম লঙ্ঘন।
একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো মূলত একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যৎকে পঙ্গু করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত চেষ্টা। শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (ইরানের এমআইটি), ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং শহীদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটির ওপর হামলা মূলত ইরানের আত্মিক শক্তির ওপর আঘাত।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো তৌফিক দারু'র মতো ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানাগুলোর ওপর হামলা, যেখানে ক্যানসারের মতো রোগের জরুরি ওষুধ তৈরি করা হয়।
এরপর গত ১৪ মার্চ ইসরায়েলি হামলা আঘাত হানে ইউনেস্কো স্বীকৃত চেহেল সোতুন-এর পাশে। ইসফাহানের সপ্তদশ শতাব্দীর এই বাগানটি কেবল স্থাপত্য নয়, বরং ইরানের ঐতিহ্যের ধারক। ২০টি প্রদেশের অন্তত ১৩১টি ঐতিহাসিক স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলা চালানোর খবর নিশ্চিত করেছেন ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দ রেজা সালেহি-আমিরি।
অবিনাশী কালির শক্তি
যখন আমি ওই পুরস্কার সপ্তাহের কথা ভাবি, আমার চোখে ভেসে ওঠে জ্ঞানানুসন্ধানের সম্মিলিত উদযাপন, নেতৃত্বের আসনে আসীন নারী এবং দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো গেড়ে থাকা 'শ্বেতাঙ্গ জটিলতা' থেকে মুক্ত এক স্বাধীন চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
ইরানের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার শত শত বছরের পুরনো। ইসলামের স্বর্ণযুগে (৮ম-১৩৩ম শতাব্দী) পারস্যের পণ্ডিতরাই মানুষের জ্ঞানকে রক্ষা ও প্রসারের কেন্দ্রে ছিলেন। আল-খোয়ারিজমি, যিনি বীজগণিতের জনক, কিংবা ইবনে সিনা, যাঁর চিকিৎসা বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে—তাঁরা সবাই এই ঐতিহ্যের অংশ। আজ সেই ঐক্য আর উত্তরাধিকার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি।
আমার সহকর্মী, যেসব শিক্ষার্থী আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল এবং যেসব বিজ্ঞানীর সঙ্গে আমি চা পান করেছি—আমি আপনাদের জন্য দোয়া করি। যদি এই বিদ্যাপীঠগুলো ধ্বংস করার সময় আমরা নীরব থাকি, তবে আমরা এক সমৃদ্ধ ও লিঙ্গ-সমতাপূর্ণ সংস্কৃতি মুছে ফেলার অপরাধে অংশীদার হব।
আমাদের মনে রাখতে হবে: যদি পণ্ডিতের কলমের কালি সত্যিই পবিত্র হয়ে থাকে, তবে সেই কালির বিনাশ এমন এক ক্ষতি যা গোটা বিশ্ব একদিন হাড়ে হাড়ে টের পাবে। আমি লিখছি যাতে ইতিহাস কেবল 'লক্ষ্যবস্তু'দেরই মনে না রাখে, বরং সেই উজ্জ্বল মস্তিষ্ক আর প্রাণবন্ত জীবনগুলোকেও মনে রাখে যাদের তারা প্রতিনিধিত্ব করত।
আমরা আজ যা দেখছি তা কেবল সংঘাত নয়; এটি হলো একটি লড়াই—কারা জ্ঞান উৎপাদন করবে, কারা সংস্কৃতি রক্ষা করবে আর কারা ভবিষ্যৎ কল্পনা করার অধিকার রাখবে—তা নির্ধারণের লড়াই। বয়ানও এখন বিপজ্জনকভাবে পাল্টে গেছে। এখন 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ প্রকাশ্যে গণহত্যার ঘোষণা দেওয়া হয়। যা শুরু হয়েছিল ইরানে 'ক্ষমতা পরিবর্তনের' কথা বলে, তা এখন 'সভ্যতার সমাপ্তি' ঘটনার মতো প্রলয়ংকরী হুমকিতে রূপ নিয়েছে।
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে কাজ করার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, কীভাবে এই ধ্বংসযজ্ঞ পরিবেশগত জ্ঞানকেও মুছে দেয়। এসব অঞ্চলের তথ্যাদি বৈশ্বিক ডেটাবেইজ থেকে গায়েব হয়ে যায়। যখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক করি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো ততক্ষণে সেই বিপৎসীমা অতিক্রম করে ফেলে। বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো ধ্বংস করা কেবল মানবিক সংকট নয়, বরং এটি তথ্যের এক অন্ধকার জগত তৈরি করে। জীববৈচিত্র্য আর আদি জ্ঞান ভস্মীভূত হয় আগুনের লেলিহান শিখায়।
বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। প্রাচ্য যখন পুড়ছে, তখন বিচ্ছিন্নভাবে কেবল ডেটা নিয়ে পড়ে থাকা আর গ্রহণযোগ্য নয়। জ্ঞান, নথিপত্র এবং পরিবেশগত ব্যবস্থা রক্ষা করা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। অন্যথায় সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যের এই ক্ষতি কেবল ইরানের জন্য নয়, বরং গোটা মানবজাতির জন্যই এক চরম ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: জহরা আলী সৈয়দ একজন প্রখ্যাত গবেষক ও স্ট্র্যাটেজিস্ট, যার কাজের মূল ক্ষেত্র হলো সামাজিক আচরণ পরিবর্তন এবং জলবায়ু সহনশীলতা। উন্নয়ন খাতে প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই বিশেষজ্ঞ বর্তমানে কমিউনিটি পর্যায়ে পরিবেশগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে টেকসই 'মেন্টাল মডেল' তৈরিতে কাজ করছেন। তিনি 'দ্য গ্রিন পিলগ্রিমস' (The Green Pilgrims) এবং 'লার্নিং গার্ডেনস বাই ক্রপস ইন পটস' (Learning Gardens by Crops in Pots)-এর প্রতিষ্ঠাতা।
