হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ‘মস্কিটো ফ্লিট’ কেন বড় হুমকি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের নৌবন্দর ও আশপাশের এলাকায় অনেক ডুবে যাওয়া জাহাজ বা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ রয়েছে। তবে এসব হামলার মধ্যেও ঠিকই টিকে আছে একটি বাহিনী, যাকে কখনো কখনো বলা হচ্ছে 'মসকিউটো ফ্লিট' বা 'মশা নৌবহর'।
এটি মূলত ছোট ও খুব দ্রুতগামী নৌকার বহর। প্রতিপক্ষের জাহাজে হামলা বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এসব নৌকা তৈরি করা হয়েছে। এই নৌকাগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর মূল শক্তি। এটি ইরানের সাধারণ নৌবাহিনী থেকে আলাদা।
এসব নৌকা আর এগুলো থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, এসবই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। আবার কখনো কখনো এসব ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র স্থলভাগে গোপন কোনো জায়গা থেকেও ছোড়া হয়।
ইরান এর আগে বলেছিল, লেবাননে যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখবে। শুক্রবার ইরানের কর্মকর্তারা এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেন। কেউ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ থাকায় প্রণালিটি খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। আবার আইআরজিসির নৌবাহিনী প্রধান বলেন, যদি খোলা হয়, তাহলে সব জাহাজ চলাচল সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে ইরানের প্রণালিটি খুলে দেওয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, পরিস্থিতি "শেষ হয়েছে''। তবে তিনি বলেছিলেন, শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরে অবরোধ চালিয়ে যাবে।
আইআরজিসি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও টেনিসি ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর সাঈদ গোলকার বলেন, আইআরজিসি নৌবাহিনী সমুদ্রের গেরিলা বাহিনীর মতো কাজ করে। তারা বড় যুদ্ধজাহাজ বা সরাসরি যুদ্ধের ওপর নির্ভর না করে হঠাৎ আক্রমণ করে আবার দ্রুত সরে যায়। এটাই তাদের কৌশল।
যুদ্ধের সময় অন্তত ২০টি জাহাজে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এজেন্সি। এসব হামলার দায় আইআরজিসি খুব কমই স্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেশিরভাগ হামলাই স্থলভাগ থেকে ছোট ছোট লঞ্চার থেকে ছোড়া ড্রোন দিয়ে করা হয়েছে, যেগুলো শনাক্ত করা কঠিন।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এক মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছিলেন, ইরানের প্রধান যুদ্ধজাহাজগুলোসহ এর নিয়মিত নৌবাহিনীর ৯০ শতাংশের বেশি জাহাজ ডুবে গেছে।
তিনি বলেন, আইআরজিসির নৌবাহিনীর ছোট আক্রমণকারী নৌকারও প্রায় অর্ধেক ধ্বংস হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, তবে সুনির্দিষ্ট করে সংখ্যাটা বলা কঠিন। মোট সংখ্যা কয়েকশ থেকে হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নৌকাগুলো এতটাই ছোট যে অনেক সময় স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে না। এগুলো উপকূলের কাছে পাহাড়ি গুহার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই হামলার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
সাবেক মার্কিন নৌ কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল গ্যারি রাফহেড বলেন, ''সব মিলিয়ে এই বাহিনী এখনো বড় হুমকি। তারা কখন কী করবে, তা বোঝা কঠিন।"
যেখানে নিয়মিত নৌবাহিনী ব্যর্থ, সেখানে এসব নৌকা
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পরপরই আইআরজিসির স্থল সেনা গঠন করা হয়। কারণ, তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি নতুন সরকারকে রক্ষা করার জন্য নিয়মিত সেনাবাহিনীর ওপর ভরসা করতে পারছিলেন না।
১৯৮৬ সালের দিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী গঠন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ফারজিন নাদিমি বলেন, ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনী কুয়েত ও সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে আক্রমণ করতে অসম্মতি জনায়। এই দেশগুলো ইরাককে অর্থ সহায়তা দিচ্ছিল।
পরে আক্রমণ বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দিতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। এর মধ্যে একটি ছিল ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস জাহাজ। এটি ইরানের পাতা মাইনের আঘাতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পরবর্তীতে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের দুটি ফ্রিগেটসহ আরও কয়েকটি জাহাজ ধ্বংস করে।
তিন বছর পর প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরান পর্যবেক্ষণ করে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করছে।
নাদিমি বলেন, এই ঘটনাগুলো ইরানকে বুঝিয়ে দেয় যে সরাসরি যুদ্ধে তারা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে হারাতে পারবে না। তাই তারা উপসাগরে জাহাজগুলোকে হয়রানি করার জন্য গোপন ও দ্রুত আক্রমণকারী একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করে।
তার মতে, আইআরজিসির নৌবাহিনীতে প্রায় ৫০ হাজার সদস্য রয়েছে। তারা পারস্য উপসাগরজুড়ে পাঁচটি সেক্টরে তাদের বাহিনী ভাগ করেছে। ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা ৩৮টি দ্বীপের অনেকগুলোতেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে। সব মিলিয়ে তারা অন্তত ১০টি সুরক্ষিত ও গোপন ঘাঁটি তৈরি করেছে, যেখানে আক্রমণকারী এই নৌকাগুলো রাখা হয়। এর মধ্যে "ফারুর" নামের একটি ঘাঁটি নৌ বিশেষ বাহিনীর প্রধান কেন্দ্র। এখানে তাদের সরঞ্জাম, এমনকি সানগ্লাস পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর আদলে তৈরি।
