রাষ্ট্রদূত নিয়োগে কেলেঙ্কারি: পদত্যাগের চাপে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী
পদত্যাগের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এবার ক্ষোভ উগরে দিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিয়োগের আগে যে নিরাপত্তা যাচাইয়ে (সিকিউরিটি ভেটিং) ব্যর্থ হয়েছিলেন, সেই তথ্য খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই জানানো হয়নি বলে দাবি তার। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন তিনি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টিকে ঐতিহাসিক জয় এনে দিলেও স্টারমারের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। আগামী মাসেই ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচন। ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক এসব বিতর্কের জেরে এই নির্বাচনে তার দলকে চরম মাশুল গুনতে হবে।
প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সখ্যের জেরে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের পদ ছাড়তে বাধ্য হন লেবার পার্টির প্রবীণ নেতা পিটার ম্যান্ডেলসন। এই কেলেঙ্কারির পর তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন স্টারমার। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা সীমিত করার ঘোষণা দিয়ে সেই চাপ কিছুটা হলেও সামলে উঠেছিলেন তিনি।
কিন্তু বৃহস্পতিবার নতুন এক তথ্য সামনে আসায় পরিস্থিতি আবারও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। জানা যায়, রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে হওয়া নিরাপত্তা যাচাইয়ে বাদ পড়েছিলেন ম্যান্ডেলসন। স্টারমারের কার্যালয় বলছে, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি জানতেন না। কিন্তু বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য প্রধানমন্ত্রী কীভাবে না জেনে থাকতে পারেন? তাই তারা স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
'আমাকে না জানানোটা ক্ষমার অযোগ্য'
ইরান সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য শুক্রবার ফ্রান্সে ছিলেন স্টারমার। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি পার্লামেন্টে বলেছিলাম যে নিয়োগে যথাযথ নিয়ম মানা হয়েছে। অথচ ম্যান্ডেলসন যে নিরাপত্তা যাচাইয়ে বাদ পড়েছিলেন, সেটাই আমাকে জানানো হয়নি। এটি ক্ষমার অযোগ্য।'
পদত্যাগ করবেন কি না—এমন প্রশ্নে স্টারমার জানান, সোমবার পার্লামেন্টে তিনি 'প্রাসঙ্গিক সব তথ্য' তুলে ধরবেন। এদিকে তার এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা নেই।
তবে এই কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে বৃহস্পতিবার রাতেই তড়িঘড়ি করে পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা অলি রবিন্সকে বরখাস্ত করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
২০২৪ সালে ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত করার সিদ্ধান্তকে স্টারমার নিজেই একটি দারুণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। অথচ তার কার্যালয় এখন বলছে, চলতি সপ্তাহের আগে প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা যাচাইয়ের এই ব্যর্থতার কথা জানতেনই না। ফলে সরকারের ওপর প্রধানমন্ত্রীর আদৌ কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেবার পার্টির এক এমপি বলেন, দল এখনই স্টারমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেবে না ঠিকই, তবে ম্যান্ডেলসন-কাণ্ড বিরোধীদের জন্য এক 'অফুরন্ত উপহার'। আগামী ৭ মের স্থানীয় নির্বাচনে দলের বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে; তার আগে এই কেলেঙ্কারি প্রধানমন্ত্রীকে বেশ ভোগাবে।
আরেক লেবার এমপির দাবি, বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির পদত্যাগ করা উচিত। কারণ, ম্যান্ডেলসনের নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময় তিনিই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ওই এমপির ভাষায়, 'প্রতারণার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি অনেক বড় অযোগ্যতা।'
পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের লেবার সদস্য জর্জ ফুকস অবশ্য রয়টার্সকে বলেন, স্টারমার আরও অনেকগুলো বিষয় খুব ভালোভাবে সামলাচ্ছেন। তাই এখনই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়াটা হঠকারিতা হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, লেবার পার্টির ২০ শতাংশ এমপি (অন্তত ৮১ জন) যদি বিকল্প কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করেন, তবেই স্টারমারের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
পার্লামেন্টকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ স্টারমারের বিরুদ্ধে
বিরোধী রাজনীতিকদের মূল অভিযোগ হলো, স্টারমার জেনেবুঝেই পার্লামেন্টকে বিভ্রান্ত করেছেন কি না। কারণ, তিনি এর আগে পার্লামেন্টে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ম্যান্ডেলসনের নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত কিছু নথিতে এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর গত সেপ্টেম্বরে তাকে রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এপস্টেইনের কাছে সরকারি নথি ফাঁসের সন্দেহে ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে এখন পুলিশের তদন্ত চলছে। তবে তিনি নিজে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ম্যান্ডেলসন মিথ্যা বলেছিলেন—এমন অভিযোগ করে তাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য এর আগে ক্ষমা চেয়েছিলেন স্টারমার।
বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক স্টারমারের এই আত্মপক্ষ সমর্থনকে 'অযৌক্তিক' বলেছেন। অন্যদিকে লেবার পার্টির প্রধান নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী রিফর্ম ইউকে পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজের মতে, এটি 'নির্লজ্জ মিথ্যাচার'।
