ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্থগিত ইতালির; ‘মেলোনির সাহস নেই’, বললেন ট্রাম্প
ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি আর নবায়ন করবে না ইতালি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এ কথা জানিয়েছেন।
মেলোনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তার সরকার এই চুক্তি নবায়ন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। উল্লেখ্য, প্রতি পাঁচ বছর পর পর চুক্তিটি নবায়ন হয়।
ঐতিহাসিকভাবে রোম ও তেল আবিবের সম্পর্ক বেশ মজবুত হলেও সম্প্রতি তাতে ফাটল ধরেছে।
গত সপ্তাহে ইতালিতে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল রোম। লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে থাকা ইতালির একটি বহরের দিকে ইসরায়েলি বাহিনীর ফাঁকা গুলি ছোড়ার জেরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ওই ঘটনায় একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ হতাহত হননি।
অন্যদিকে লেবাননে বেসামরিক মানুষের ওপর ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছিলেন ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি। এর প্রতিবাদ জানাতে সোমবার ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ইসরায়েল।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য মতে, ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে ইতালির অবস্থান তৃতীয়। তবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলের মোট অস্ত্র আমদানির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ এসেছে ইতালি থেকে। ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলাকালে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত বা সীমিত করেছে। গত কয়েক বছর ধরে অনেক ইতালীয় নাগরিক তাদের সরকারের কাছে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছেন। এর প্রতিবাদে আন্দোলনও হয়েছে।
তা সত্ত্বেও মেলোনির ডানপন্থী জোট সরকার ইউরোপে ইসরায়েলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। এমনকি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর দলেও যোগ দেয়নি তারা।
কিন্তু গত মার্চের শেষের দিকে বিচারিক সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর একটি গণভোটে হেরে যায় মেলোনির শিবির। অনেকেই একে তার সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের ভোট হিসেবে দেখেছেন। বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এই হার তাৎপর্যপূর্ণ।
আগামী সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র ১৮ মাস বাকি। তাই ইতালীয় ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা বিষয়গুলো থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে মেলোনি নিজের বক্তব্যে পরিবর্তন আনছেন।
গণভোটে হেরে যাওয়ার পর থেকেই মেলোনির কথায় পরিবর্তন এসেছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে তিনি 'আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন' বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য দেশের ওপর এমন হস্তক্ষেপকে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
গত সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও সমালোচনা করেন মেলোনি। পোপ চতুর্দশ লিওকে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবমাননাকর মন্তব্যকে তিনি 'অগ্রহণযোগ্য' বলে উল্লেখ করেন। পরে তিনি জানান, পোপের প্রতি তাঁর পূর্ণ সংহতি রয়েছে।
এর পরপরই ইতালীয় সংবাদপত্র 'কোরিয়েরে দেল্লা সেরা'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেলোনির কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, মেলোনির কথায় তিনি 'হতবাক'।
ট্রাম্প বলেন, 'আমি ভেবেছিলাম তার (মেলোনির) সাহস আছে, কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।' তিনি আরও বলেন, 'ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক বা না থাকুক, তাতে মেলোনির কিছু যায় আসে না। সুযোগ পেলে ইরান দুই মিনিটেই ইতালিকে উড়িয়ে দেবে।'
মেলোনি হয়তো আশা করছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি সম্পর্কে এই ফাটল তাকে হারানো ভোট ফিরে পেতে সাহায্য করবে।
একসময় মেলোনির প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য সহানুভূতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে তাকে এক বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। মেলোনির সমর্থকেরা এটিকে বড় সম্পদ হিসেবেই দেখতেন।
কিন্তু এখন ট্রাম্প ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে ওঠায় তার সঙ্গে এই সখ্যতা মেলোনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গত জানুয়ারিতে হওয়া এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ ইতালীয় ভোটার যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর মেলোনির মিত্ররা তার পক্ষে অবস্থান নেন। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতালির জোট 'পারস্পরিক বিশ্বস্ততা, সম্মান ও সততার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।'
তাজানি আরও বলেন, 'আর পোপ চতুর্দশ লিওকে নিয়ে তিনি (মেলোনি) ঠিক সেটাই বলেছেন, যা আমরা সব ইতালীয় মনে করি। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকার কেবল ইতালির স্বার্থই রক্ষা করে এবং ভবিষ্যতেও তা-ই করবে।'
