বিমার টাকার জন্য এভারেস্ট অভিযাত্রীদের বিষ খাইয়ে অসুস্থ করে ভুয়া উদ্ধার অভিযানের অভিযোগ গাইডদের বিরুদ্ধে
২ কোটি ডলার বা দেড় কোটি পাউন্ডের বিশাল এক বিমা জালিয়াতির অংশ হিসেবে এভারেস্টের গাইডদের বিরুদ্ধে বিদেশি পর্বতারোহীদের গোপনে ওষুধ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। মূলত আকাশপথে অত্যন্ত ব্যয়বহুল উদ্ধার অভিযান চালানোর অজুহাত অযথাই তৈরি করতেই তারা এই কাজ করতেন। নেপাল পুলিশের এক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এই ভয়ংকর তথ্য।
পুলিশের এই অভিযানের অংশ হিসেবে নেপালের পাহাড়ি উদ্ধারকারী কোম্পানিগুলোর পরিচালকদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের একজন মুখপাত্র দ্য ইনডিপেনডেন্ট-কে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত মোট ৩২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই জালিয়াতির ব্যাপ্তি বেশ বিশাল। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৭৮২ জন বিদেশি পর্বতারোহী এর শিকার হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ভুয়া উদ্ধারের অন্তত তিন শতাধিক ঘটনা তাদের নজরে এসেছে। এসব ঘটনায় পর্বতারোহী এবং বিমা কোম্পানিগুলোর কাঁধে সব মিলিয়ে প্রায় ২ কোটি ডলারের বিল চাপানো হয়েছিল।
গত ৩০ মার্চ থেকে এ বছরের বসন্তকালীন আরোহন মৌসুম শুরু হয়েছে। ঠিক এই সময়ে এমন কেলেঙ্কারির খবর সামনে আসায় ট্যুর অপারেটর ও গাইডদের ওপর নতুন করে নজরদারি শুরু হয়েছে। তদন্তকারীরা বলছেন, ট্রেকিং ব্যবসার পুরো চক্রটিই এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে শেরপা, ট্রেকিং কোম্পানির মালিক, হেলিকপ্টার অপারেটর এবং হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
পুলিশ জানায়, গত ২৫ জানুয়ারি প্রথম ধাপে উদ্ধারকারী কোম্পানির ছয়জন পরিচালক ও ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করা হয়। ট্রেকিংয়ের সময় বিদেশি পর্যটকরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন—এমন ভুয়া নাটক সাজিয়ে বিমার টাকা দাবি করার অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
অপ্রয়োজনীয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বানোয়াট এসব উদ্ধার অভিযান দেখিয়ে আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রায় ২ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। নেপাল পুলিশের সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (সিআইবি) জানিয়েছে, এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড 'আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নেপালের জাতীয় অহংকার, সম্মান ও মর্যাদাকে' মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
জালিয়াতির ধরন সম্পর্কে তদন্তকারীরা জানান, ট্রেকারদের হেলিকপ্টারে উদ্ধার হতে বাধ্য করার জন্য গাইডরা নানা ধরনের জঘন্য কৌশল ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে ছিল ভুয়া চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা তৈরি করা এবং খাবারের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে বেকিং পাউডার মিশিয়ে দেওয়া। এর ফলে পর্বতারোহীদের পেটে এমন এক ধরনের সমস্যা তৈরি হতো, যা দেখতে হুবহু উচ্চতাজনিত অসুস্থতার (অ্যালটিটিউড সিকনেস) মতো মনে হয়। শারীরিক উপসর্গ তৈরি করার জন্য কাউকে কাউকে অতিরিক্ত পানিসহ বিভিন্ন ওষুধ খেতে দেওয়া হতো।
অসুস্থতার জেরে ট্রেকাররা যখন বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা শরীরে ব্যথার কথা জানাতেন, তখন গাইডরা তাদের নিচে নেমে আসতে বলতেন। একই সঙ্গে তাদের ব্যয়বহুল জরুরি হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযানে রাজি করানো হতো। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এরপর জাল চিকিৎসা সনদ ও ফ্লাইটের নথিপত্র ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে খরচের টাকা দাবি করত অপারেটররা।
একবার কোনো 'উদ্ধার' কাজ শুরু হলে অপারেটররা একেকজন যাত্রীর জন্য আলাদা হেলিকপ্টার ফ্লাইটের বিল তৈরি করে খরচ বাড়িয়ে দেখাত। অথচ বাস্তবে অনেক সময় কয়েকজনকে একসঙ্গে একই ফ্লাইটে আনা হতো। এরপর বিমার টাকার বড় অঙ্ক দাবি করার জন্য ফ্লাইটের ভুয়া রেকর্ড এবং চিকিৎসার জাল কাগজপত্র জমা দেওয়া হতো। এই জালিয়াতিতে পিছিয়ে ছিল না হাসপাতালগুলোও। তারা ভর্তির এবং চিকিৎসার ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করত। এমনকি এমন পর্যটকদের নামেও চিকিৎসার বিল করা হতো, যারা আসলে কোনো সেবাই নেননি।
নেপালে এ ধরনের ভুয়া উদ্ধারকারী চক্রের তথ্য প্রকাশ্যে আসার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে কাঠমান্ডু পোস্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসে সরকার। তারা ৭০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল এবং এ খাতে সংস্কার আনারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু সেই জালিয়াতি থামেনি, বরং এর ডালপালা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সিআইবি প্রধান মনোজ কুমার কেসি কাঠমান্ডু পোস্টকে জানান, 'শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় শিথিলতার' কারণেই এমনটা ঘটেছে। তিনি বলেন, 'অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তা ফুলেফেঁপে ওঠে। এর ফলেই বিমা জালিয়াতিও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।'
জালিয়াতি চলতে থাকলে নেপালে বিমা সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি এর আগেই দিয়েছিল ভ্রমণ বিমা কোম্পানিগুলো।
২০১৯ সালের বেশ কিছু প্রতিবেদনে আরও চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, কিছু বিদেশি দর্শনার্থীও ট্রেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগসাজশ করতেন। কম খরচে এভারেস্ট অভিযানের সুযোগ পাওয়ার বিনিময়ে তারা পাহাড়ি অসুস্থতার ভান করতেন, যাতে করে হেলিকপ্টারে উদ্ধারের প্রয়োজন হয়। যাত্রায় অংশ নেওয়ার আগেই তাদের বিমার কাগজপত্র যাচাই করা হতো। মূলত হেলিকপ্টার প্রতিষ্ঠান এবং এর 'এজেন্ট' যেন ঠিকমতো টাকা পায়, তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
অন্যদিকে, এই চক্রের জালিয়াতি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র না জানা অনেক সাধারণ ট্রেকারকে ইচ্ছাকৃতভাবে সাময়িক অসুস্থ করার ভয়াবহ অভিযোগও রয়েছে। তাদের খাবারের সঙ্গে বেকিং সোডা, কাঁচা মুরগির মাংস কিংবা এমনকি ইঁদুরের মল পর্যন্ত মিশিয়ে দেওয়া হতো।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর ভ্রমণ প্রতিবেদক সাইমন ক্যালডার বলেন, 'যাঁরা নেপালে যাওয়ার, সেখানকার চমৎকার মানুষদের সঙ্গে মেশার এবং বিশ্বের সেরা কিছু ট্রেকিং উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন, তারা এই জালিয়াতির কথা জেনে বিস্মিত হবেন। আমরা ২০১৯ সালেই প্রথম এই জালিয়াতির কথা ফাঁস করেছিলাম।'
তিনি আরও বলেন, 'নেপালের পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত বিশাল অংশের মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট সৎ। পর্যটকদের সেরা অভিজ্ঞতা দেওয়ার দিকেই তাদের মূল মনোযোগ থাকে। তাই নিজের ভ্রমণের জন্য কোনো কোম্পানি বেছে নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য কারও পরামর্শ নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি।'
