হরমুজের পর তেলের বৈশ্বিক লাইফলাইন লোহিত সাগরও যেভাবে ঝুঁকির মুখে
চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর অব্যাহত হামলার কারণে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালী' কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বিশ্ব তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের জ্বালানি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিকল্প রুটের সন্ধান করছে।
হরমুজ প্রণালীর অন্যতম প্রধান বিকল্প হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে লোহিত সাগর। বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান 'সৌদি আরামকো' জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দর ইয়ানবুতে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে লাখ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাঠাচ্ছে।
ট্রেড ডেটা ও অ্যানালিটিক্স কোম্পানি 'কেপলার'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের দৈনিক গড়ের তুলনায় এই মাসে ইয়ানবু বন্দরে দৈনিক তেল লোডিংয়ের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু এখন তেলের এই বিকল্প 'লাইফলাইন' বা জীবনরেখাটিও চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
২০২৩ সালের শেষের দিকে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে জাহাজগুলোতে আক্রমণ শুরু করে। এই নিরাপত্তা সংকটের কারণে শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের জাহাজগুলোকে আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং জ্বালানি, বিমা ও নাবিকদের মজুরি বাবদ খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার সোমবার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাত এবং "বাণিজ্যিক জাহাজের প্রতি হুতি বাহিনীর ক্রমাগত শত্রুতামূলক অবস্থানের" কারণে লোহিত সাগরে হুমকির মাত্রা এখন 'ব্যাপক'। তারা সতর্ক করে বলেছে, "এই গোষ্ঠীটি ওই অঞ্চলে সামুদ্রিক হামলা চালানোর সক্ষমতা এবং অভিপ্রায়—উভয়ই বজায় রেখেছে।"
গত সপ্তাহে একটি ইসরায়েলি সূত্র সিএনএন-কে জানিয়েছে, হুতি বিদ্রোহীরা সরাসরি ইসরায়েলে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম ঘটনা হতে পারে।
'বের হওয়ার কোনো পথ নেই'
সৌদি আরামকোর মতে, সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটি পূর্ণ সক্ষমতায় চললে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করতে পারে। এটি হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন পরিবাহিত হওয়া ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি কিছুটা হলেও পূরণ করতে সক্ষম।
তবে বিশ্লেষকরা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এই বিকল্প পথে তেলের প্রবাহও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে বিদ্যমান আতঙ্ক আরও বাড়বে এবং দাম আকাশচুম্বী হবে।
কেপলার-এর জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক নবীন দাস বলেন, লোহিত সাগরে যদি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারগুলো হামলার শিকার হয়, তবে তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যাবে। তিনি বলেন, "এটি মূলত বাজারকে এই সংকেত দেবে যে তেল পরিবহনের সব কটি বিকল্প পথকেই এখন লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে... আসলে বের হওয়ার আর কোনো পথ থাকবে না।"
ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর অক্সলি জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে যদি সহিংসতা ফিরে আসে এবং তেলসমৃদ্ধ এই অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহকে 'পুরোপুরি আটকে' ফেলে, তবে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বর্তমানের ১০০ ডলার থেকে বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১৩০ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। তেলের দাম যত বেশি সময় উচ্চপর্যায়ে থাকবে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব তত বেশি পড়বে। এর ফলে বিমান ভাড়া থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম—সবই বেড়ে যাবে।
কন্টেইনার জাহাজের যাতায়াত
বিপরীত দিকে, লোহিত সাগরে কোনো হামলার প্রভাব কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলোর ওপর খুব একটা পড়বে না। কারণ ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকেই এসব জাহাজের সিংহভাগ এই পথ এড়িয়ে চলছে।
শিপিং ডেটা ফার্ম জেনেটা-এর প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ডের অনুমান অনুযায়ী, লোহিত সাগর দিয়ে যাতায়াত করা কন্টেইনার শিপিং সক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশই এখন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গত জানুয়ারির শুরুতে ডেনিশ শিপিং জায়ান্ট 'মেয়ার্সক' লোহিত সাগর দিয়ে কিছু যাতায়াত শুরুর কথা বলেছিল। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলের জন্য তারা এটিকে 'সবচেয়ে দ্রুত, টেকসই এবং দক্ষ পথ' হিসেবে অভিহিত করেছিল। কিন্তু মার্চ মাসের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তারা পুনরায় এই রুটটি স্থগিত করে।
সামগ্রিকভাবে শিপিং শিল্পের বিষয়ে লজিস্টিক ফার্ম ফ্রেইটোস-এর গবেষণা প্রধান জুডাহ লেভাইন সিএনএন-কে বলেছেন, "বর্তমান পরিস্থিতি লোহিত সাগরে সামুদ্রিক যাতায়াত পূর্ণমাত্রায় শুরু করার সময়সীমাকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে।"
একইভাবে পিটার স্যান্ড সিএনএন-কে জানান, অনেক শিপিং কোম্পানি সম্ভবত বছরের বাকি সময় লোহিত সাগর এড়িয়ে চলবে। তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচলের বিমা খরচ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, "হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে যদিও হুতি বিদ্রোহীদের সরাসরি বড় কোনো আক্রমণ দেখা যায়নি, তবে তাদের দেওয়া হুমকিই কন্টেইনারবাহী জাহাজগুলোকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট।"
