যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে ইরান
ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসার ইচ্ছা তাদের নেই—বুধবার এমনটাই জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, তেহরান তাদের শর্ত পূরণ হলে যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী হতে পারে। যদিও শুরুতে ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনার সম্ভাবনাকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আরাকচি বলেন, 'মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'তারা তাদের বার্তায় কিছু প্রস্তাব দিয়েছে, যা শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান জানানো হবে।'
এছাড়া, ছয়টি আঞ্চলিক সূত্র জানায়, ইরান মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বুধবার ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, 'ইরানি নেতারা আলোচনা করছেন এবং তারা একটি চুক্তি করতে এতটাই মরিয়া যে বলার মতো নয়। কিন্তু তারা তা বলতে ভয় পাচ্ছেন কারণ তারা তাদের নিজেদের জনগণের হাতে নিহত হতে পারেন। এছাড়া তারা আমাদের হাতে নিহত হওয়ার ভয়ও পাচ্ছেন।'
পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো ট্রাম্পের ১৫-দফার প্রস্তাবে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে ফেলা, সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার তিনটি সূত্র এই পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেছে।
হোয়াইট হাউস এই প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছে এবং উল্টো হামলা আরও জোরদার করার হুমকি দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, 'তারা যদি বুঝতে ব্যর্থ হয় যে তারা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিত করবেন যে তাদের আগে কখনও যতটা আঘাত করা হয়নি, তার চেয়েও কঠিনভাবে আঘাত করা হবে।'
ইসরায়েলের একজন ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, ইরান এই শর্তে রাজি হবে কি না তা নিয়ে ইসরায়েল সংশয়ে আছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকরা কোনো ছাড় দিতে পারে কিনা—তা নিয়েও উদ্বিগ্ন ইসরায়েল।
অন্য একটি সূত্র জানায়, ইসরায়েল চায় যেকোনো চুক্তিতে যেন তাদের 'প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক' বা আগাম হামলার বিকল্পটি সংরক্ষিত থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে ১০ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং ইরানের সীমান্তের বাইরে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা সীমিত করার পথে রয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ইরানের বড় নৌযানের ৯২ শতাংশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের হার ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌযান উৎপাদন স্থাপনার দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেছে।
তবে এর পরও যুদ্ধ থামেনি। ইরানের ওপর বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং ইরানও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
বুধবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর নতুন কয়েক দফা হামলার কথা জানায়, যার মধ্যে জাহাজ ও সাবমেরিন নির্মাণ প্রকল্পে হামলাও রয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি এসএনএন নিউজ এজেন্সি জানায়, তেহরানে একটি আবাসিক এলাকায় হামলা হয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ চলছে। কুয়েত ও সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা নতুন ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে।
বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পাঠানোর খবর প্রকাশের পর বিশ্ব শেয়ারবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং তেলের দাম কমেছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কমবে।
এদিকে, পেন্টাগন আরও হাজার হাজার এয়ারবর্ন সেনা উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে স্থল অভিযানের বিকল্পগুলো খোলা থাকে।
রয়টার্সকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইতোমধ্যে দুটি মেরিন কন্টিনজেন্ট পথে রয়েছে। একটি বিশাল উভচর যুদ্ধজাহাজে থাকা প্রথম মেরিন ইউনিটটি মাসের শেষের দিকে পৌঁছাতে পারে।
ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম বার্তা সংস্থা জানায়, যদি তাদের ভূখণ্ডে হামলা হয়, তাহলে ইরান লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে। ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝামাঝি বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে তারা 'বিশ্বাসযোগ্য হুমকি' সৃষ্টি করতে সক্ষম।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, কোনো প্রতিবেশী দেশ যদি তাদের দ্বীপ দখলে 'শত্রুদের' সহায়তা করে, তাহলে ইরান সেই দেশকে আক্রমণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায়, 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরুর পর থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে—যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়।
