ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় শীর্ষস্থানীয় এয়ারলাইনগুলোর বাজারদর কমেছে ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি
করোনা মহামারির পর ফের চরম সংকটের মুখে পড়েছে এয়ারলাইন শিল্প। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একের পর বাতিল হয়েছে অনেকগুলো ফ্লাইট। এ যুদ্ধের জেরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমান সংস্থাগুলোর বাজারদর কমেছে ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে, তাতে প্রবল জ্বালানি সংকটেরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিমান পরিবহন শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে রীতিমতো সতর্কবার্তা দিয়েছেন শীর্ষ নির্বাহীরা। এমনিতেই তেলের দাম টানা বাড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে উপসাগরীয় এলাকার প্রধান বিমানবন্দরগুলোর সেবা। এর ফলে বিশ্বজুড়ে যাত্রীদের চাহিদাতেও টান পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিজেদের লাভের অঙ্ক ধরে রাখতে আগামী কয়েক মাসে টিকিটের দাম এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়াতে পারে বিমান সংস্থাগুলো। এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে উপসাগরীয় এলাকার বাইরের দূরপাল্লার ফ্লাইটগুলোতেও।
যেকোনো এয়ারলাইনের মোট খরচের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয় জেট ফুয়েল খাতে। গত মাসে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই জেট ফুয়েলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তা এখনও ঊর্ধ্বমুখী।
তেলের দামের ওঠানামা সামাল দিতে অনেক বিমান সংস্থারই আগাম আর্থিক সুরক্ষা (হেজিং) নেওয়া থাকে। তা সত্ত্বেও শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, চলতি মাসে জেট ফুয়েলের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে যাত্রীভাড়া বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
বিমান সংস্থা ইজিজেট-এর প্রধান নির্বাহী কেন্টন জারভিস বলেন, '২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলার পরেও জ্বালানির দাম অনেকটা বেড়েছিল ঠিকই, কিন্তু এবার তা সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে।' তিনি আরও বলেন, ২০২০ সালে মহামারির জেরে গোটা বিশ্বের আকাশপথ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর এই যুদ্ধই এ শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়টিও স্পষ্ট। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)-এর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিশ্বের বৃহত্তম ২০টি এয়ারলাইনের বাজার মূলধন প্রায়য় ৫৩ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে।
আগামী দিনে শেয়ারের দাম আরও কমার আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। ইউরোপের সাশ্রয়ী বিমান সংস্থা উইজ এয়ার এখন এফটিএসই ১০০ সূচকে সবচেয়ে বেশি 'শর্টেড' কোম্পানির তালিকায় রয়েছে। একই পরিস্থিতি ইজিজেট-এরও।
মহামারির পর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল এয়ারলাইন শিল্প। যাত্রীদের চাহিদাও টানা বাড়ছিল। বেশ কয়েকটি কপমানি রেকর্ড লাভের মুখও দেখেছিল। কিন্তু তার পরেই এল এই নতুন সংকটের ধাক্কা। টিকিটের দাম বিপুল হারে বেড়ে গেলে যাত্রীদের সেই চাহিদা আদৌ কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে রীতিমতো সন্দিহান শীর্ষ নির্বাহীরা।
জার্মানির বৃহত্তম এয়ারলাইন লুফথানসা-র প্রধান নির্বাহী কার্স্টেন স্পোর বলেন, দীর্ঘমেয়াদে টিকিটের এই চড়া দাম যাত্রীদের চাহিদায় কোপ বসাতে পারে। তবে যাত্রীভাড়া বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্পও নেই।
তিনি বলেন, 'মাথাপিছু যাত্রীতে আমাদের গড় লাভের পরিমাণ ১০ ইউরোর কাছাকাছি। তাই এই বাড়তি খরচের বোঝা সামাল দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।'
এই বিপর্যয়ের জেরে গোটা বিমান পরিবহণ শিল্প কীভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, তা আরও একটি বিষয় থেকে স্পষ্ট। সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের পরিস্থিতি সামাল দিতে আগেভাগেই আপৎকালীন পরিকল্পনা তৈরি রাখছে এয়ারলাইনগুলো।
এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম-এর প্রধান নির্বাহী বেন স্মিথ বলেন, জ্বালানির জোগানে ঘাটতি সামাল দিতে তারাও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে এশিয়ার কিছু অংশে ফ্লাইটের সংখ্যা কমানো হতে পারে।
নির্বাহীরা বলছেন, এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো উপসাগরীয় অঞ্চল। আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ওই অঞ্চলের পর্যটন শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ার কারণে রাষ্ট্রীয় সহায়তাপুষ্ট তিন এয়ারলাইন—এমিরেটস, ইতিহাদ ও কাতার এয়ারওয়েজ বাধ্য হয়েই তাদের শিডিউলের সংখ্যা এক ধাক্কায় অনেকটা কমিয়েছে।
এয়ারলাইনগুলোর লবি গ্রুপ আইএটিএ)-র প্রধান ও ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ-এর সাবেক প্রধান উইলি ওয়ালশ বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের সংস্থাগুলির কাছে এটি একটি বড় সঙ্কট।' তবে তার মতে, মহামারিকালে এই শিল্প যে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, তার তুলনায় এই সংকট এখনও বেশ কিছুটা ছোট।
এয়ারলাইন খাতের এই ধাক্কার প্রভাব এসে পড়েছে পণ্য পরিবহণেও। বিশ্বজুড়ে জাহাজে পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হওয়ার জেরে অনেকেই এখন কার্গো বিমানের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে কিছু কিছু বিমানবন্দরে উপচে পড়ছে ভিড়।
জেনেভা বিমানবন্দরের অপারেশনস-এর প্রধান জিওভান্নি রুসো জানান, সুইজারল্যান্ডের এই বিমানবন্দর থেকে যাওয়া উড়োজাহাজগুলো কানায় কানায় পূর্ণ থাকছে। ফলে জেনেভা বিমানবন্দরে পাঠানো পণ্য বাধ্য হয়েই সড়কপথে প্যারিসে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
