হরমুজ প্রণালি বন্ধ: তেলের চেয়েও বড় ধাক্কা খেতে পারে এলএনজি বাজার
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সোমবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে।
তবে এই জলপথ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাজার তেলের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। এর কারণ হলো অপরিশোধিত তেলের চেয়ে এলএনজি পরিবহন করা অনেক বেশি কঠিন এবং এর উৎপাদনও মূলত নির্দিষ্ট একটি জায়গাকেন্দ্রিক।
বিশ্বের মোট এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়, যার সিংহভাগই আসে কাতার থেকে। গত সপ্তাহে ইরানের ড্রোন হামলার পর কাতার তাদের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর ২০২২ সালের মার্চের পর গত সপ্তাহে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ৬৩ শতাংশ বেড়েছে। এশিয়ায় এই দাম আরও চড়া।
সোমবার সকালে তা ২৩.৪০ ডলার/এমএমবিটিইউ দরে লেনদেন হয়েছে। কারণ কাতারের এলএনজির প্রধান ক্রেতা হলো এশিয়া। এশিয়ার দেশগুলো এখন ঘাটতি মেটানোর মরিয়া চেষ্টা করছে।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গ্যাসের দামের পার্থক্য বেড়ে যাওয়ায়, ইউরোপের দিকে যাওয়া কিছু এলএনজিবাহী জাহাজ এখন মাঝরাস্তা থেকে গতিপথ পাল্টে এশিয়ার দিকে ছুটছে।
সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের অপরিশোধিত তেলের কিছু অংশ পাইপলাইনের মাধ্যমে বিকল্প পথে পাঠাতে পারলেও, গ্যাসের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা নেই। অন্য কথায়, গ্যাস দূরপাল্লায় পাঠাতে হলে জাহাজের কোনো বিকল্প নেই।
র্যাপিডান এনার্জি-এর গ্লোবাল গ্যাস ও এলএনজি গবেষণা বিভাগের পরিচালক অ্যালেক্স মুনটন বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তেল উৎপাদন করলেও গ্যাস উৎপাদন মূলত কাতারের একটিমাত্র শিল্প কমপ্লেক্সেই সীমাবদ্ধ। এই একক নির্ভরতা বাজারকে ভবিষ্যতে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলবে।'
মুনটনের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো— প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলেও কাতারের 'রাস লাফান' কমপ্লেক্সে এলএনজি উৎপাদন পুনরায় শুরু করা কতটা কঠিন হবে, তা নিয়ে।
গ্যাস তরল করার এই জটিল শিল্প প্রক্রিয়ার কারণে তেল উৎপাদনের চেয়ে এটি পুনরায় শুরু করতে অনেক বেশি সময় লাগবে।
র্যাপিডানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি জাহাজের জন্য শতভাগ নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চল থেকে এলএনজি রপ্তানি শুরু হবে না। এর একটি বড় কারণ হলো বিমা বা ইন্স্যুরেন্স। একেকটি এলএনজি ট্যাঙ্কারের দাম ২৫০ মিলিয়ন বা ২৫ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
তাছাড়া, উৎপাদন প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেই হুট করে উৎপাদন কমানো বা বাড়ানো যায় না। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পুরোপুরি উৎপাদন শুরু করতে দিনের বদলে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগে কখনোই এই পুরো প্ল্যান্টটি একসঙ্গে বন্ধ করা হয়নি।
মুনটন সিএনবিসিকে বলেন, 'সংঘাতের মাত্র এক সপ্তাহ পার হয়েছে। আমার মনে হয় না কাতার কত দিন উৎপাদন বন্ধ রাখবে এবং বিশ্ববাজার ও সরবরাহে এর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে এখনো মানুষ পুরোপুরি সচেতন।'
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র হলেও তাদের উৎপাদন ইতিমধ্যে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চলছে।
বিশ্বজুড়ে বাড়তি সরবরাহের খুব একটা সুযোগ না থাকায় শেষমেশ চাহিদা কমানোর মাধ্যমেই হয়তো বাজারের ভারসাম্য আনতে হবে। এর মানে হলো, মানুষ হয়তো তুলনামূলক সস্তা বিকল্প হিসেবে কয়লার দিকে ঝুঁকবে।
তবে মুনটন সতর্ক করে বলেন, সংঘাত বাড়লে এবং কাতারের এলএনজি অবকাঠামোতে আরও হামলা হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
র্যাপিডান মনে করে, রাস লাফানে ইরানের আগের হামলাগুলো ছিল মূলত 'সতর্কবার্তা', আসল আঘাত নয়।
ওই শিল্প কমপ্লেক্সটি সম্পর্কে মুনটন বলেন, 'এটি একটি অরক্ষিত লক্ষ্যের মতো। ইরান চাইলে কাতারের এলএনজি সক্ষমতার বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।ইরান যদি প্ল্যান্টটির ক্ষতি করতে বদ্ধপরিকর হয়, তবে তাদের হামলা থেকে পুরোপুরি বাঁচার কোনো উপায় নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'একটি কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সব তেল উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ এখানে অনেক তেলক্ষেত্র, অনেক দেশ এবং প্রচুর অবকাঠামো রয়েছে। কিন্তু এলএনজির ক্ষেত্রে এটি শুধু একটি স্থাপনা। এটি বিশাল এক কমপ্লেক্স হলেও আসলে একটিমাত্র স্থাপনাই।'
এদিকে, ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী কাতারএনার্জি তাদের গ্যাস সুবিধার সম্প্রসারণ কার্যক্রম ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দিচ্ছে।
