তেলের বাজারে অস্থিরতা ও শেয়ার বাজারে ধস: জরুরি বৈঠকে বসছে জি-৭
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে আলোচনা করতে সোমবার জরুরি বৈঠকে বসছে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো।
যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসসহ বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা এই বৈঠকে যোগ দেবেন। সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলাই এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে লন্ডনের এফটিএসই ১০০ শেয়ার সূচক ১.৫ শতাংশ পড়ে গেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জি-৭-এর এই বৈঠকে জরুরি তেলের মজুত বা রিজার্ভ থেকে তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ)-এর সমন্বয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যদি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর এটিই হবে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ বড় ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়লে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পক্ষে সুদের হার কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্বের তেলের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু এক সপ্তাহ আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সরু জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
রবিবার ইরান ঘোষণা করেছে যে, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব নেবেন। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হলো যে, সংঘাতের এক সপ্তাহ পার হলেও ইরানের কঠোরপন্থীরাই দেশটির ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। তারা তেল ডিপোসহ বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের একটি প্রধান তেলক্ষেত্রের দিকে ধেয়ে আসা ড্রোন তারা আকাশে ধ্বংস করেছে।
সোমবার এশিয়ায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এক পর্যায়ে ২৫ শতাংশ বেড়ে ১১৯.৫০ ডলারে পৌঁছায়, পরে তা ১০৭ ডলারের আশেপাশে নেমে আসে। ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড অয়েলের দামও একই রকম অস্থিরতা দেখেছে এবং এটি ১০৪ ডলারের আশেপাশে লেনদেন হয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও অনেকটা বেড়েছে। সোমবার লেনদেন শুরুর পর যুক্তরাজ্যের গ্যাসের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি থার্ম ১৭১ পেন্স পর্যন্ত ওঠে, পরে তা ১৫৬ পেন্সের আশেপাশে স্থির হয়।
ইউরোপের শেয়ার বাজারগুলোও পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু করে। জার্মানির ড্যাক্স (Dax) এবং ফ্রান্সের ক্যাক ৪০ (Cac 40) সূচক প্রায় ২.৫ শতাংশ নিচে নেমে গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচকের প্রায় সব শেয়ারের দরপতন হয়েছে, ব্যতিক্রম ছিল কেবল তেল জায়ান্ট বিপি (BP) ও শেল (Shell)।
এর আগে এশিয়ার বাজারে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫.২ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক ৬ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে আতঙ্কিত বিক্রি ঠেকাতে ২০ মিনিটের জন্য 'সার্কিট ব্রেকার' ব্যবহার করে লেনদেন স্থগিত রাখতে হয়েছিল।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্স-এর আদনান মাজারেই বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সংকেত পাওয়ায় তেলের দামের এই লাফ প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি বলেন, 'মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে এই লড়াই দ্রুত শেষ হওয়ার নয়।'
বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি বারবার এড়িয়ে গেছেন। রবিবার তিনি 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, 'ইরানের পারমাণবিক হুমকির বিনাশ ঘটার পর তেলের দাম দ্রুতই কমে আসবে। আমেরিকা ও বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এটি সামান্য মূল্য। শুধু বোকারাই এর উল্টোটা ভাববে!'
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়া নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট রবিবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ইসরায়েল—যুক্তরাষ্ট্র নয়—ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানছে।
মোটরিস্ট গ্রুপ 'এএএ'-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত গ্যাসোলিনের গড় দাম ১১ শতাংশ বেড়ে প্রতি গ্যালন ৩.৩২ ডলারে পৌঁছেছে।
