ইরানের নতুন নেতা, আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতবা এক রহস্যে ঘেরা চরিত্র
ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে মোজতবা হোসাইনি খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার ভোরে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শীর্ষ আলেমদের এক বিবৃতির বরাতে এই তথ্য জানানো হয়। মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার মুখে এই নিয়োগ ইরানে কট্টরপন্থি ধর্মতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি ইরানের ভেতরেও অনেকটা রহস্যময় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার অন্তরালে থেকে তার বাবার কার্যালয়ে সামরিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশটির প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনিই ছিলেন এই বাহিনীর পছন্দের প্রার্থী।
বাবার মতো মোজতবাও একজন 'আয়াতুল্লাহ'। সর্বোচ্চ নেতার পদে আরোহণের মুহূর্তে তার পূর্ণ ধর্মীয় যোগ্যতা রয়েছে। তিনি শিয়া ধর্মতত্ত্বের জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবেও পরিচিত। তবে বাবার ঘনিষ্ঠ মহলের বাইরে তার ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। তাকে খুব একটা জনসমক্ষে কথা বলতে বা দেখা যায় না। এখন তিনি ইরানের নতুন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ইরান বিশেষজ্ঞ ওয়ালি আর নাসর বলেন, মোজতবার নিয়োগ চমকপ্রদ হলেও এটি একটি বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'মোজতবার নির্বাচন মূলত তার বাবার শাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষারই নামান্তর। পাশাপাশি দ্রুত ক্ষমতা সুসংহত করা এবং ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি অন্য প্রার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত।'
ইরানি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, প্রয়াত আয়াতুল্লাহ খামেনি তার ছেলেকে উত্তরসূরি করতে চাননি, কারণ তিনি এই পদটিকে বংশগত করতে চাননি। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্যই ছিল বংশপরম্পরায় ক্ষমতা হস্তান্তর বন্ধ করে তা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। তবে বর্তমান যুদ্ধ ও চরম সংকটের মুখে আলেম সমাজ, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানির মতো প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা একজোট হয়ে মোজতবাকে সমর্থন দিয়েছেন। আলী লারিজানি এবং মোজতবা খামেনি পুরোনো বন্ধু।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলার মুখে বর্তমানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীই মূলত এই অঞ্চল থেকে ইসরায়েল, পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশ এবং মার্কিন ঘাঁটি ও দূতাবাসগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করছে।
৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমকে নিয়ে গঠিত 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' (বিশেষজ্ঞ পরিষদ) মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করে। আলেমরা যখন তার বিষয়ে আলোচনা করছিলেন, ঠিক তখনই ইসরায়েল পবিত্র শহর কোম-এর সেই ভবনটিতে হামলা চালায় যেখানে সাধারণত পরিষদ ভোট দেওয়ার জন্য মিলিত হয়। তবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ফারস জানিয়েছে, হামলার সময় ভবনটি খালি ছিল এবং আলেমরা নিরাপত্তার স্বার্থে ভার্চুয়ালি বৈঠক করছিলেন।
বৈঠকে অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ আলেম মোজতবা খামেনির পক্ষে অবস্থান নেন। তাদের যুক্তি ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তার রয়েছে। কোনো কোনো আলেম বলেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের হাতে আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলেকে বেছে নেওয়া হবে তার উত্তরাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।
তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক মেহেদী রহমতি বলেন, 'নিরাপত্তা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিচালনার কাজের সঙ্গে মোজতবা আগে থেকেই নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনিই সবথেকে বিজ্ঞ পছন্দ।'
রহমতি স্বীকার করেছেন যে এই নিয়োগ ইতোমধ্যে গভীরভাবে বিভক্ত ইরানি জনগণের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ অনেক ইরানিই বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। তিনি বলেন, 'জনসাধারণের একটি অংশ এই সিদ্ধান্তের প্রতি অত্যন্ত নেতিবাচক ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং এর ফলে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হবে।'
প্রয়াত আয়াতুল্লাহ খামেনি রাষ্ট্রের সকল প্রধান বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতেন। তিনি অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ক্ষেত্রে খুব একটা নমনীয়তা দেখাননি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণবিক আলোচনায় ছাড় দেওয়ার বিষয়েও ছিলেন অনড়। গত জানুয়ারিতে তার শাসনের অবসানের দাবিতে শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভে তিনি প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সেই অভিযানে অন্তত ৭,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে এবং যাচাই-বাছাই শেষ হলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ইরান সরকার জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় মোজতবা খামেনি কেবল তার বাবাকেই হারাননি, বরং তার স্ত্রী জোহরা আদেল, মা মানসুরেহ খোজাস্তে বাঘেরজাদেহ এবং এক ছেলেও নিহত হয়েছেন।
সর্বোচ্চ নেতার পদের জন্য অন্য যেসব চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম আলোচনায় ছিল, তারা হলেন আলিরেজা আরাফি এবং সৈয়দ হাসান খোমেনি। আরাফি একজন আলেম ও আইনবিদ, যিনি আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর গঠিত তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদের সদস্য ছিলেন। অন্যদিকে হাসান খোমেনি হলেন ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি। এই দুজনেই উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং হাসান খোমেনি ইরানের কোণঠাসা হয়ে পড়া সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ।
তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, বাবার কট্টরপন্থা সত্ত্বেও মোজতবা খামেনি সংস্কারের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাদের মতে, তিনি নতুন ও বাস্তববাদী প্রজন্মের একজন আলেম এবং বংশীয় পরিচয়ের কারণে তাকে কট্টরপন্থী বা রক্ষণশীলদের পক্ষ থেকে কম বাধার সম্মুখীন হতে হবে।
তেহরান থেকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ আবদুররেজা দাভারি বলেন, বাবার উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা সৌদি আরবের নেতা মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো একজন আধুনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন, যিনি তার সমাজে বেশ কিছু উদারপন্থী পরিবর্তন এনেছেন।
দাভারি বলেন, 'যদি এমন কেউ থাকেন যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উত্তেজনা হ্রাসের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন, তবে তিনি মোজতবাই। অন্য কেউ এই উদ্যোগ নিলে শাসক শ্রেণি ও রক্ষণশীলদের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তেন। তিনি কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে চান।'
ওয়াশিংটন তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তার সরকার যাদের ইরানের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে মনে করত, লড়াই শুরুর পর থেকে তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, 'খুব শীঘ্রই আমরা কাউকে চেনার মতো পাব না।' ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে সবথেকে খারাপ দিক কোনটি হতে পারে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'আমার মনে হয় সবথেকে খারাপ হবে যদি আমরা এসব করার পর এমন কেউ ক্ষমতায় আসে যে আগের জনের মতোই খারাপ। এমনটা হতেই পারে। আমরা চাই না তেমন কিছু ঘটুক।'
