ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে লাভবান হবে যে দেশ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে যখন তেলের সংকট, ঠিক তখনই এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ফায়দা লুটতে যাচ্ছে রাশিয়া। বিশ্বের অন্যতম বড় দুই জ্বালানি বাজার ভারত ও চীনের জন্য এখন রুশ তেলই হয়ে উঠেছে বড় ভরসা।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে হু হু করে, আর পাল্লা দিয়ে ধস নামছে শেয়ার বাজারে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই অচলাবস্থা আরও কয়েক সপ্তাহ চললে তেলের দাম ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরল গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। কিন্তু ইরানি বাহিনী এই পথ দিয়ে যাওয়া জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ রুটটি এখন কার্যত বন্ধ।
এর ফলে বিশ্ববাজারে তেল যত দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল হচ্ছে, ভারত ও চীনের ওপর চাপ তত বাড়ছে। কারণ এই দুই দেশ তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'আইসিআইএস'-এর পরিচালক অজয় পারমার বলেন, 'যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকলে বিশ্বের সব দেশ প্রতি ফোঁটা তেলের জন্য প্রতিযোগিতায় নামবে।'
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হুড়োহুড়িতে সবচেয়ে লাভবান হবে রাশিয়া। মস্কো দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও চীনের অন্যতম তেল সরবরাহকারী। যদিও ওয়াশিংটন ভারতকে রুশ তেল থেকে সরে আসার জন্য বারবার চাপ দিয়ে আসছিল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় এখন রুশ তেলই সহজলভ্য বিকল্প। ট্যাঙ্কারে করে ভারতে এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে তেল পাঠাতে প্রস্তুত রাশিয়া। দুই দেশই ইতিমধ্যে তাদের কেনাকাটা বাড়িয়েছে।
'সিআরইএ'-এর প্রধান বিশ্লেষক লরি মাইলিভিরটা বলেন, 'এর মূল প্রভাব হলো রাশিয়া আরও বেশি টাকা কামাবে। আর ভারত ও চীনের মতো আমদানিকারকদের তেলের জন্য গুনতে হবে বাড়তি দাম।'
ভারতের জ্বালানি চাহিদার ৮৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর। আর এর অর্ধেক আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে, যা হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। ভারত সরকার দাবি করছে তাদের ৭৪ দিনের রিজার্ভ আছে, তবে কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে তা মাত্র ২৫ দিনের হতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন চাপে ভারত রুশ তেল কেনা কমিয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গত জানুয়ারি নাগাদ ভারতের মোট আমদানির ২০ শতাংশেরও কম ছিল রুশ তেল, যা ছিল চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে সৌদি আরব থেকে আমদানি বেড়েছিল।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। 'অ্যাক্টিভট্রেডস'-এর বিশ্লেষক রিকার্ডো ইভানজেলিস্টা বলেন, 'দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে দুই দেশই রুশ তেল কেনা বাড়ানোর কথা ভাববে।'
তবে অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো মনে করেন, চীনের জন্য রুশ আমদানি বাড়ানো সহজ হলেও ভারতের জন্য তা কঠিন হতে পারে। কারণ ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের অন্তর্বর্তী চুক্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তবুও ভারতের সরকারি সূত্র জানিয়েছে, তারা ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বিকল্প উৎসের খোঁজ করছে। এদিকে রাশিয়া তেল সরবরাহের জন্য তৈরি। রুশ উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক রাষ্ট্রীয় টিভিতে বলেছেন, মস্কো ভারত থেকে বাড়তি তেল কেনার 'নতুন আগ্রহের সংকেত' পাচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার অন্তত তিনটি ট্যাঙ্কার প্রায় ২১ লাখ ব্যারেল রুশ তেল নিয়ে ভারতের পথে রওনা হয়েছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে একটি জাহাজ ভারতের পূর্ব উপকূলে পৌঁছেছে, একটি পশ্চিম উপকূলের দিকে যাচ্ছে এবং তৃতীয়টি সিঙ্গাপুরের পথ বদলে ভারতের দিকে রওনা দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই তিনটি জাহাজই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে।
চীনের অবস্থান ভিন্ন হলেও গন্তব্য একই। বেইজিং রুশ তেল কেনা কমানোর কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি, তবে তাদের জাতীয় তেল কোম্পানিগুলো কেনাকাটা কিছুটা কমিয়েছিল। অজয় পারমার মনে করেন, এই সংযম বেশি দিন টিকবে না।
তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে চীনে রুশ তেলের সরবরাহ জানুয়ারির তুলনায় দিনে ৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল বেড়েছে। এটি ভেনেজুয়েলা থেকে আসা তেলের ঘাটতি পূরণের সমান।
চীন এ বছর তার দুই প্রধান সরবরাহকারী—ইরান ও ভেনেজুয়েলা—নিয়ে সংকটে পড়েছে। এর পেছনেও হাত রয়েছে ওয়াশিংটনের। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার পর থেকে ইরানি রপ্তানি চাপের মুখে। আর জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের পর সেখান থেকেও তেল আসা বন্ধ হয়ে গেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ভারত ভেনেজুয়েলার তেল কিনে রাশিয়ার অভাব পূরণ করবে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার উৎপাদন এখন তলানিতে, আর তাদের অবকাঠামো ঠিক করতে হাজার কোটি ডলার লাগবে। তাছাড়া ভৌগোলিক দূরত্বও একটা বড় বাধা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানেই রাশিয়ার সুবিধা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সাগরে ভাসমান রুশ তেলের ট্যাঙ্কারগুলো এখন ভারতীয় শোধনাগারগুলোর জন্য সহজলভ্য। আর চীন সরাসরি পাইপলাইনে তেল পায় বলে তাদের সরবরাহ আরও নিরাপদ।
বিশ্লেষক ক্রিস রাইট বলেন, সাগরে ভাসমান প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল রুশ তেল এখন অনেক সস্তা হবে। তিনি বলেন, 'হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয় এমন যেকোনো তেল বা গ্যাস উৎপাদক এখন বিশ্ববাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।'
রাশিয়া ছাড়াও ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ—যাদের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা আছে—তারাও তেলের দাম বাড়ার সুবিধা পাবে।
কিন্তু ভারত ও চীনের মতো বিশাল বাজারের (যারা দিনে ২২-২৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করে) চাহিদা মেটানোর মতো কৌশলগত অবস্থানে একমাত্র মস্কোই আছে।
অবশ্য রাশিয়ারও কিছু সমস্যা আছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তাদের একটি বড় তেল টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বাল্টিক বন্দরে বরফ জমার কারণে তেল লোড করতে সমস্যা হচ্ছে।
ভারতের জন্য মস্কোর দিকে ঝোঁকার একমাত্র বাধা রাজনৈতিক। তবে সেটাও এখন কমছে। 'আইইইএফএ'-এর দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক বিভূতি গর্গ বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার মনে হয় না যুক্তরাষ্ট্র কিছু বলবে।' কারণ যে রুট বন্ধ করতে ওয়াশিংটন সাহায্য করেছে, তার বিকল্প খুঁজতে গেলে ভারতকে শাস্তি দেওয়ার মতো অবস্থানে তারা নেই।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স পদক্ষেপ নিচ্ছে। ট্রাম্প উপসাগর দিয়ে যাওয়া জাহাজের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমার ঘোষণা দিয়েছেন এবং ফ্রান্স ভূমধ্যসাগরে বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ভারত ও চীনের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে দ্রুত ও সহজ পথটি এখনো মস্কোর মধ্য দিয়েই যাচ্ছে।
