ট্রাম্পের বাণিজ্য বন্ধের হুমকির জবাবে ‘যুদ্ধকে না’ বললেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকির জবাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি যুদ্ধের প্রতি তার বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং ট্রাম্পের হুমকিকে 'আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন' বলে অভিহিত করেছেন।
১০ মিনিটের এক টেলিভিশন ভাষণে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি ২০ বছরেরও বেশি সময় আগের ইরাক যুদ্ধের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্পেন সরকারের অবস্থানকে কেবল 'যুদ্ধকে না' এই শব্দগুলো দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
ইরানে হামলার জন্য মোরোন এবং রোটা সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকার করায় ট্রাম্প স্পেনের ওপর পূর্ণ বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।
গত মঙ্গলবার জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বলেন, 'স্পেনের আচরণ অত্যন্ত জঘন্য। আমরা স্পেনের সাথে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করতে যাচ্ছি। আমরা স্পেনের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না।'
চ্যান্সেলর মের্ৎস পরে জানান, তিনি ট্রাম্পকে খুব পরিষ্কারভাবে বলেছেন—জার্মানি বা পুরো ইউরোপের সাথে আলাদা করে বাণিজ্য চুক্তি করা সম্ভব নয় যদি সেখানে স্পেনকে অন্তর্ভুক্ত না করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক হুমকির মুখে এলিসি প্যালেস জানিয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখো বুধবার সানচেজের সাথে ফোনালাপে স্পেনের প্রতি তার 'সংহতি' প্রকাশ করেছেন।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তাও স্প্যানিশ নেতার সাথে কথা বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ন্যাটোর লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে না বাড়িয়ে স্পেন ন্যাটোর জন্য 'খুবই খারাপ অংশীদার' হিসেবে আচরণ করছে।
এর আগে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কথা বলে সানচেজ ট্রাম্পের রোষানলে পড়েছিলেন।
বুধবার মাদ্রিদে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে সানচেজ বলেন, সংঘাতের কারণে স্পেনের নাগরিকদের ওপর যে অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে, তা মোকাবিলায় সরকার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে। তবে তিনি সরাসরি ট্রাম্পের বাণিজ্য হুমকির কথা এড়িয়ে যান।
তিনি বলেন, 'প্রশ্নটি এটি নয় যে আমরা আয়াতুল্লাহদের (ইরানের ধর্মীয় শাসক) পক্ষে কি না—কেউই তাদের পক্ষে নয়। প্রশ্নটি হলো আমরা শান্তি এবং আন্তর্জাতিক বৈধতার পক্ষে কি না।'
তিনি আরও বলেন, 'আপনি একটি অবৈধতার উত্তর অন্য একটি অবৈধতা দিয়ে দিতে পারেন না, কারণ এভাবেই মানবতার বড় বিপর্যয়গুলো শুরু হয়।'
স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইউক্রেন ও গাজার বিষয়ে তাদের অবস্থান যেমন ছিল, বর্তমান অবস্থানও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচক ছিলেন সানচেজ।
গাজা ইস্যুতে ইউরোপের অন্যতম সোচ্চার সরকার হিসেবে স্পেন ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে 'গণহত্যা' বলে বর্ণনা করেছে এবং অনেক ইইউ সদস্যের আগেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের কথা উল্লেখ করে সানচেজ বলেন, সেই যুদ্ধ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও খারাপ করে তুলেছিল। তিনি সতর্ক করেন যে ইরানে হামলার ফলে কোটি কোটি মানুষের ওপর একই ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।
ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ স্পেনের অনেক ভোটারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় স্পেনের রক্ষণশীল পিপলস পার্টি সরকারের ওই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন অত্যন্ত অজনপ্রিয় ছিল এবং দেশজুড়ে ব্যাপক যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছিল। অনেকের মতে, সেই গণঅসন্তোষই ২০০৪ সালের মার্চে সমাজতান্ত্রিক দলের অভাবিত জয়ের পথ তৈরি করেছিল।
সানচেজ স্প্যানিশদের 'অ্যাজোরেস থ্রি'-র কথা মনে করিয়ে দেন—তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, যুক্তরাজ্যের টনি ব্লেয়ার এবং স্পেনের রক্ষণশীল নেতা হোসে মারিয়া আজনার। তারা ইরাক আক্রমণের কয়েক দিন আগে একটি পর্তুগিজ ঘাঁটিতে মিলিত হয়েছিলেন। সানচেজ বলেন, তারা ইউরোপীয়দের উপহার হিসেবে কেবল 'একটি আরও অনিরাপদ বিশ্ব এবং আরও খারাপ জীবন' দিয়েছিলেন।
স্প্যানিশ নেতার এই অবস্থান চ্যান্সেলর মের্ৎসের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। মের্ৎস মঙ্গলবার জার্মান টিভিতে বলেন, ইরানে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হলে বিশ্ব 'আরেকটু ভালো অবস্থানে' থাকবে, যদিও তিনি এটিও বলেছিলেন যে এটি 'ঝুঁকিমুক্ত নয় এবং আমাদের এর পরিণতিও ভোগ করতে হবে'।
স্পেনের ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও গ্রিস যেখানে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় সামরিক সম্পৃক্ততার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেখানে স্পেন এখনো এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবার দাবি করেন, ট্রাম্পের বার্তা 'স্পষ্টভাবে' শোনার পর স্পেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে 'সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে'।
তবে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করে বলেছেন, তার সরকারের অবস্থানে 'এক চুল পরিমাণ পরিবর্তন আসেনি'।
যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি সানচেজের জোট সরকার গত কয়েক মাস ধরে প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তার অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সানচেজের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
সিআইএস গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ স্প্যানিশ নাগরিক ট্রাম্প সম্পর্কে 'খারাপ' বা 'খুব খারাপ' ধারণা পোষণ করেন।
এর মানে হলো, এমনকি ডানপন্থী ভোটাররাও এই ইস্যুতে সানচেজকে সমর্থন দিতে পারেন। তবে ট্রাম্পের এই হুমকি শেষ পর্যন্ত বড় কোনো অর্থনৈতিক প্রতিশোধে রূপ নেয় কি না, তা নিয়ে স্পেনের সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েই গেছে।
