মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তারে তেলের দামে উল্লম্ফন, পুঁজিবাজারে ধস
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ায় আজ সোমবার তেল ও গ্যাসের দাম তীব্রভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর প্রথম কার্যদিবসে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত উল্লম্ফন করে। একই সঙ্গে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যায় ২৪ শতাংশ।
বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে সোনায় বিনিয়োগ বাড়ালে এর দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়। বিপরীতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারগুলোয় পতন দেখা যায়। ইউরোপের প্রধান সূচক স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচক ১.৮ শতাংশ নেমে যায়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এয়ারলাইনস ও হোটেল খাতের কোম্পানিগুলো।
এদিকে পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। হামলার পর থেকে হরমুজ হয়ে নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করে থাকে এবং সাধারণত এশিয়া ও ইউরোপে ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক জুলিয়াস বেয়ার-এর অর্থনীতি বিভাগের প্রধান নরবার্ট রুকার বলেন, "এই সংঘাতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস প্রবাহের ওপর। সম্ভাব্য সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মধ্যে আছে শুধু এই প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, বরং অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি।"
মরগান স্ট্যানলির বিশ্লেষকেরা বলেছেন, উপসাগরের বাইরে ইতোমধ্যে যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে, তা বাজারের সরবরাহ সংকট কিছুটা লাঘব করতে পারে। ব্যাংকটির বিশ্লেষক মার্টিন রাটস বলেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এ বছর এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ১৫ লাখ ব্যারেল প্রতিদিন হারে রপ্তানি বাড়িয়েছে। তিনি হিসাব করে দেখিয়েছেন, সৌদি আরব টেকসইভাবে প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগর তীরবর্তী টার্মিনালে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠাতে সক্ষম, যা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যায়। অন্যদিকে, সরবরাহের সম্ভাব্য ব্যাঘাত মাথায় রেখেই চীন গত ছয় মাসে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল করে অপরিশোধিত তেল মজুত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটের পুঁজিবাজারগুলো খোলার আগে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকভিত্তিক ফিউচার ১.৬ শতাংশ পতনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়। প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোর নাসডাক সূচক ১.৯ শতাংশ নিচে নেমে আসে।
ইউরোপীয় পুঁজিবাজারে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মালিকানা সংস্থা– ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স গ্রুপের শেয়ার ১০ শতাংশ পড়ে যায়। এয়ার ফ্রান্স-কেএলএমের শেয়ারদর কমে ৭ শতাংশ। ফ্রান্সের হোটেল চেইন অ্যাকরের শেয়ার ৮.৫ শতাংশ মূল্য হারায়।
নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ায় প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ১.৬ শতাংশ বেড়ে ৫,৩৬২ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান (গড়ে) ০.৬ শতাংশ শক্তিশালী হয়।
তবে দিনের শুরুতে তীব্র উল্লম্ফনের পর লন্ডনে লেনদেনের সময় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমে এলেও এখনো ৮ শতাংশ ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে।
এশিয়ার শেয়ারবাজারেও সোমবার পতন দেখা যায়। জাপানের টপিক্স সূচক ১.৫ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ১.৪ শতাংশ পতনের মুখ দেখেছে।
