নেপালের সেই ‘নেপো কিডস’রা এখন কোথায়?
গত বছর নেপালের 'জেনারেশন জেড' বা তরুণ প্রজন্মের যে অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার পেছনে বারুদ হিসেবে কাজ করেছিল রাজনীতিবিদদের সন্তানদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা।
দামি ডিজাইনার লেবেল লাগানো উপহার, বিশ্বের নামী সব পাঁচতারকা রিসোর্টে ব্যয়বহুল ভ্রমণ এবং সড়ক বন্ধ করে জমকালো বিয়ের আয়োজন—এসবই ছিল সেই বিলাসিতার চিত্র। যেখানে দেশটির ২০.৬ শতাংশ তরুণ বেকার এবং ৩০ লাখ মানুষ বিদেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানে ফোনের পর্দায় দেখা এই আকাশচুম্বী বৈষম্য সাধারণ মানুষের জন্য মেনে নেওয়া ছিল কঠিন।
২৫ বছর বয়সী ল্যাব টেকনিশিয়ান সতীশ কুমার যাদব বিবিসিকে বলেন, 'বড় রাজনীতিবিদদের সন্তানরা থাইল্যান্ড বা সুইজারল্যান্ডের মতো জায়গায় উৎসব উদযাপন করে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সন্তানদের কাজের সন্ধানে উপসাগরীয় দেশগুলোতে যেতে বাধ্য করা হয়।'
তরুণদের এই ক্ষোভের মুখে সরকার যখন সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেয়, তখন সেই ক্ষোভের আগুন রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে। গত ৮ সেপ্টেম্বর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। দুই দিনের মধ্যে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে প্রাণ হারায় ৭৭ জন, যার প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আগামী সপ্তাহে নেপালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিবিদরা তরুণদের এই ক্ষোভের বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে নানা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এদিকে, এক সময় বিলাসিতার ছবি দিয়ে সাজানো রাজনীতিবিদদের সন্তানদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মেয়ে ও সাবেক মিস নেপাল শ্রিঙ্খালা খাতিওয়াদা—এক সময় যার ১০ লাখের বেশি অনুসারী ছিল—তিনি তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি সম্ভবত বন্ধ করে দিয়েছেন। ইউটিউবে তার সর্বশেষ ভিডিওতে তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন কেন তিনি 'নেপো কিডস' তকমা পাওয়ার যোগ্য নন।
তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া মাওবাদী নেতার নাতনি স্মিতা দাহাল তার দামি হ্যান্ডব্যাগ সংগ্রহের ছবি প্রদর্শন করে সমালোচিত হয়েছিলেন। তিনিও এখন তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি প্রাইভেট করে রেখেছেন। আগস্টের শেষ দিক থেকে তার ফেসবুক পেজেও কোনো আপডেট নেই।
অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। সাবেক এক মন্ত্রীর ছেলে সৌগাত থাপার বিলাসবহুল লাইফস্টাইল এখনো তার অ্যাকাউন্টে দৃশ্যমান। তবে এই ধরনের পোস্ট এখন আর তরুণদের আগের মতো উত্তেজিত করছে না। বিক্ষোভকারী দীপিকা সারু মুগার বলেন, 'আমার মনে হয় অনেকেই 'নেপো বেবি' ট্রেন্ডটি ভুলে গেছে। সেই ট্রেন্ড এখন শেষ এবং মানুষের মনোযোগ এখন অন্য দিকে সরে গেছে।'
সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের দিক থেকে মনোযোগ সরলেও স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৮৪ শতাংশ নেপালি মনে করেন সরকারি দুর্নীতি দেশটির একটি বড় সমস্যা।
উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির উদাহরণ দেশটিতে এখন অহরহ। গত ডিসেম্বরে একটি নতুন বিমানবন্দরের নির্মাণ ব্যয় অবৈধভাবে ৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার (৫৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড) বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে পাঁচজন সাবেক মন্ত্রীসহ ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া ভুটানি শরণার্থী সাজিয়ে নেপালিদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর এক প্রতারণা মামলায় আরও দুই সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী অভিযুক্ত হয়েছেন।
সতীশ কুমার যাদব বলেন, 'আমরা পুরোনো রাজনৈতিক নেতাদের অনেক সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু মানুষ বারবার প্রতারিত হয়েছে। অনেক জায়গায় ভালো রাস্তা নেই, শিক্ষার মান খারাপ এবং ভালো হাসপাতাল নেই। এখন এসব পরিবর্তন হতেই হবে।'
নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতির তদন্ত ও তরুণ প্রজন্মের 'অভিভাবক' হিসেবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত 'রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি' (আরএসপি) সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে, 'নেপালি কংগ্রেস' ১৯৯১ সাল থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের উচ্চপর্যায়ের তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছে। এমনকি তারা পাঁচবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবাকে দলীয় সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
দেউবার ছেলে জয়বীর সিং দেউবার জমকালো বিয়ের ছবিগুলো এক সময় তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল। জয়বীরের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টও এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নেপালের তরুণ নেতা রক্ষা বাম বলেন, 'তারা সংস্কার করতে বাধ্য হয়েছে। কোনো প্রার্থী কতবার প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধান হতে পারবেন, তার সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এটি নীতিগত দুর্নীতি রোধে সহায়ক হতে পারে।'
তবে অনেক তরুণ মনে করেন এই সংস্কারগুলো যথেষ্ট নয়। যাদব বলেন, 'যদি নতুন মুখ আসে তবেই আমি পরিবর্তনের আশা করি। কিন্তু পুরোনো দলগুলো ক্ষমতায় থাকলে খুব একটা পরিবর্তন হবে না।'
নির্বাচনের পর জোট সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল।
দীপিকা সারু মুগার বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিতে ১৬ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিচ্ছেন। তার মতে, সেপ্টেম্বরে কী হয়েছিল—তা মনে রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, 'এই বিদ্রোহ ছিল মানুষের যন্ত্রণার ফল। ভোট দেওয়ার সময় সেটা মনে রাখা উচিত। সাধারণ মানুষ দুর্নীতির গভীর তদন্ত চায়। তারা অনেক অন্যায়ের শিকার হয়েছে। আমি চাই, কর্মফল যেন ভোগ করতে হয়।'
নেপালের রাজনীতিতে 'নেপো কিডস' হয়তো আপাতত নীরব। কিন্তু দুর্নীতির প্রশ্ন এখন নির্বাচনের কেন্দ্রে—এবং তরুণ ভোটাররা তাকিয়ে আছেন, এবার সত্যিই কিছু বদলায় কি না।
