যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলা অস্তিত্বের প্রতি হুমকি, সেভাবেই পাল্টা জবাব দেবে ইরান
২০২৫ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানার পর তেহরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে সীমিত হামলা চালিয়েছিল। তারও পাঁচ বছর আগে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়; এর অল্প সময়ের মধ্যেই ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান।
কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সর্বশেষ মার্কিন–ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পর ইরানের নেতৃত্ব থেকে সেই ধরনের সংযম প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত হবে না। ইতোমধ্যেই সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত হয়েছেন শত্রুর হামলায়, তাঁর উত্তরসূরীরা এর সমুচিত জবাব দেওয়াকেই উচিৎ মনে করবেন।
গতকাল ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ইরানের একাধিক স্থাপনায় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভাষায়, 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র অংশ হিসেবে পরিচালিত এই হামলার আগে কয়েক মাস ধরে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছিল।
তবে এই হামলা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওমান ও জেনেভায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলছিল—যার লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক উপায়ে সংকট নিরসন।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের ওপর আক্রমণ শুরুর পর, যে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা এখন কার্যত বাতিল বলেই ধরে নেওয়া যায়। তাছাড়া ব্যাপ্তি ও তীব্রতার দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যৌথ আক্রমণ ইরানের বিরুদ্ধে আগের যেকোনো হামলার তুলনায় বহুগুণ বড়।
প্রতিক্রিয়ায় ইরান জানিয়েছে, তারা "বিধ্বংসী" শক্তি প্রয়োগ করবে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে আমার মূল্যায়ন—ওয়াশিংটন ও তেহরানের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ও চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ইরানের নেতৃত্ব প্রায় নিশ্চিতভাবেই এই সংঘাতকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখছে। সংঘাতের লেলিহান শিক্ষা আরও না বাড়িয়ে—থামার মতো কোনো সুস্পষ্ট উপায়ও এখন চোখে পড়ছে না।
এখন তেহরানের কাছ থেকে এমন এক প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত, যেখানে তাদের হাতে থাকা সব সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করা হবে। আর সেটি কেবল উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
মার্কিন অভিযানের সম্ভাব্য লক্ষ্য
এই সংঘাতের কেবল শুরু হয়েছে, বা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সুতরাং অজানা তথ্যের পরিমাণই এখন বেশি।
২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইরানের নেতৃত্বের কারা নিহত হয়েছেন, কিংবা তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা কতটা ধ্বংস হয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোর দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি।
গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। গত এক মাসের সংবাদ প্রতিবেদন ও ইরানি বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের একটি অংশ পুনর্গঠন করতে পেরেছে, যা এখন ব্যবহার করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের লক্ষ্য স্পষ্টতই ইরানের ব্যালিস্টিক কর্মসূচিকে পঙ্গু করে দেওয়া—কারণ এই সক্ষমতার মাধ্যমেই ইরান সরাসরি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। জেনেভা ও ওমানের আলোচনায় বড় অচলাবস্থার কারণই ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো দাবি। ওয়াশিংটন চাইছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের পাশাপাশি ইরানকে তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে। এমনকী আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে পারবে না এমন অঙ্গীকার করুক তেহরান।
তবে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই তার জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম ভিত্তি—ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর পশ্চিমাদের বিধিনিষেধ আরোপের প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু হামলা সুনির্দিষ্টভাবে ইরানের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, উৎপাদন স্থাপনা ও অস্ত্র ভাণ্ডার লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলেও ইরানের জন্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই প্রধান প্রতিরোধমূলক হাতিয়ার। চলমান সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ তারই প্রমাণ।
'শেষ হলে, সরকারের দখল আপনারা নিন'
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক ও প্রচলিত সামরিক হুমকি দূর করা নয়, বরং এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। সর্বশেষ হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকেও টার্গেট করা হয়েছে।
প্রথম দফার মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল তেহরানের একটি কমপাউন্ড, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অবস্থান করেন বলে জানা যায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ভাষ্যমতে, ৮৬ বছর বয়সী খামেনিও অভিযানের লক্ষ্য ছিলেন এবং তিনি নিহত হয়েছেন।
এটি স্পষ্ট যে মার্কিন প্রশাসন 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র পর শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে। হামলার প্রথম প্রহরে রেকর্ড করা ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, "আমরা শেষ করলে, আপনারা নিজেদের সরকারের দখল নিয়ে নিন। সেই সুযোগ আপনাদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।"
শাসন পরিবর্তনের ঝুঁকি
শাসন পরিবর্তনের ইঙ্গিত হয়তো দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক দুর্দশায় অসন্তুষ্ট ইরানিদের নতুন করে রাস্তায় নামতে উৎসাহিত করতে পারে—যেমনটি তারা জানুয়ারিতে করেছিল।
কিন্তু এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার স্বার্থের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড বা ২০২৫ সালের জুনের সংঘাতের পর ইরানের প্রতিক্রিয়া সীমিত ছিল।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। দুই পক্ষই 'নকআউট' আঘাত হানতে চাইবে। কিন্তু সেই নকআউটের সংজ্ঞা কী? মার্কিন প্রশাসন শাসন পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্ব এমন প্রতিক্রিয়া খুঁজবে যা আগের পাল্টা হামলাগুলোর চেয়ে বড়—সম্ভবত মার্কিনীদের প্রাণহানি ঘটানো। ট্রাম্প নিজেও সতর্ক করেছেন, মার্কিন হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে।
তাহলে এখন কেন এই ঝুঁকি? আমার কাছে স্পষ্ট—কূটনৈতিক অগ্রগতির কথা শোনা গেলেও ট্রাম্প এই প্রক্রিয়ায় ধৈর্য হারিয়েছেন।
২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভার সর্বশেষ বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেমন কোনো বার্তা আসেনি। অঞ্চলজুড়ে দ্বিতীয় এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, যুদ্ধজাহাজ ও শত শত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল তেহরানের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিতে সম্মতি দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু, ইরান সেটি আমলে নিচ্ছে না বলে ট্রাম্প মনে করেছেন।
সামনে কী?
এখন প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র কি প্রাথমিক হামলার পর কিছুটা বিরতি নিয়ে অপেক্ষা করবে, দেখতে চাইবে ইরান শান্তির আবেদন করে কি না? নাকি এটি আরও বড় অভিযানের সূচনা?
এই মুহূর্তে কূটনীতির জাহাজ বোধহয় বন্দর ছেড়ে গেছে। ট্রাম্পের আর কোনো চুক্তির আগ্রহ নেই—তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন চান।
এ লক্ষ্যে তিনি কয়েকটি বড় ঝুঁকি নিয়েছেন। প্রথমত, রাজনৈতিক ও আইনি দিক থেকে—'অপারেশন এপিক ফিউরি' পরিচালনার আগে তিনি কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। ২৩ বছর আগে ইরাকে আক্রমণের আগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যে অনুমোদন পেয়েছিলেন, এবার তেমন কোনো যুদ্ধ অনুমোদন নেই বর্তমান প্রেসিডেন্টের।
হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা সম্ভবত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২–এর অধীনে কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেছেন। তবুও ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী জবাবদিহির সময়সীমাও ঘনিয়ে আসছে।
৬০ দিনের মধ্যে অভিযান শেষ না হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে কংগ্রেসে ফিরে গিয়ে হয় অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করতে হবে, নয়তো শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন বা আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা চাইতে হবে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ বাজি—ইরানিরা কি সত্যিই তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বহুদিনের বিতর্কিত শাসনব্যবস্থাকে সরাতে এগোবে? জানুয়ারির বিক্ষোভে হাজারো মানুষের মৃত্যুর পরও কি তারা নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়াবে? বিশেষত যখন তাঁদের দেশ বিদেশি শত্রুর আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
তৃতীয়ত, মার্কিন প্রশাসন বাজি ধরেছে—অস্তিত্বগত হুমকির মুখেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে টেনে নিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর সক্ষমতা রাখে না।
এই শেষ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা জানেন, তেহরানের পারমাণবিক বোমা নেই, অন্যদিকে ড্রোন, ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুদেরও একটা সীমা আছে। গেল বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে যার অনেকটাই খরচ হয়েছে।
কিন্তু তারা অপ্রচলিত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে পারে। আইআরজিসির কুদস ফোর্স বা লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা খুবই বাস্তব। ইয়েমেনের হুথি কিংবা ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে বা সরাসরি নির্দেশে মার্কিন স্বার্থে হামলা চালাতে পারে।
বহু প্রাণহানির ঘটনা ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে, তবে আমি মনে করি না এরপরেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থলসেনা পাঠাবে। মার্কিন জনমতের মধ্যে সে রকম যুদ্ধের আগ্রহ নেই, আর তেমন সিদ্ধান্ত নিতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে—যা এখনো পাওয়া যায়নি।
কেউ ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে দেখতে পারে না। এই অভিযান কয়েক দিন, এমনকি তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—ইরানের শাসনব্যবস্থা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। তাদের কাছ থেকে বর্তমানে সংযম প্রত্যাশা করাও যায় না।
লেখক: জাভেদ আলী, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি নীতি অনুশীলনের সহযোগী অধ্যাপক।
