সৌদি আরব ও ইসরায়েল কয়েক সপ্তাহের লবিংয়ের পর ইরানে হামলা করতে রাজি করিয়েছে ট্রাম্পকে
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্র দেশ ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কয়েক সপ্তাহের লবিংয়ের পর আয়াতুল্লাহ খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইসরায়েলকে নিয়ে শনিবার ইরানে হামলা চালিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
ওই চার সূত্র জানিয়েছে, জনসমক্ষে ইরান সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলে এলেও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত এক মাসে ট্রাম্পকে বেশ কয়েকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে ইরানে মার্কিন হামলার পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই ইরানকে তার দেশের জন্য অস্তিত্বের হুমকি বিবেচনায় দেশটিতে মার্কিন হামলার জন্য দীর্ঘদিন প্রকাশ্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর ওপর বিমান হামলার নির্দেশ দেন। হামলার প্রথম ঘণ্টাতেই খামেনি ও ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মৃত্যু হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি কোনো হুমকির আশঙ্কা ছিল না। তা সত্ত্বেও এই হামলা চালানো হয়েছে। ৯ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো এমন পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান থেকে গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিরত রেখেছিল। শনিবারের এই হামলা সেই দীর্ঘকালীন মার্কিন নীতি থেকে বড় বিচ্যুতি। এটি ট্রাম্পের নিজের আগের সামরিক পদক্ষেপগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ আগে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলোর পরিসর ছিল সীমিত।
হামলার জন্য সৌদি আরব এমন এক সময়ে চাপপ্রয়োগ করে যাচ্ছিল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দেশটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সেই আলোচনা চলাকালীনই সৌদি যুবরাজ ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ফোনালাপের পর রিয়াদ বিবৃতি দেয়। তাতে বলা হয়, মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানে হামলার জন্য সৌদি আরবের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবেন না।
তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি নেতা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এখনই হামলা না চালায়, তবে ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। স্পর্শকাতর এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, যুবরাজ সালমানের এই অবস্থানকে সমর্থন জানান তার ভাই ও সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান। গত জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনিও হামলা না চালানোর নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।
সৌদি নেতার এই জটিল অবস্থানের পেছনে মূলত দুটি বিষয়ের টানাপোড়েন কাজ করেছে বলে মনে করছেন তার চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা। প্রথমত, নিজ দেশের তেল স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলা এড়ানোর ইচ্ছা; দ্বিতীয়ত, রিয়াদের প্রধান আঞ্চলিক শত্রু হিসেবে তেহরানকে দমন করার লক্ষ্য। শিয়া-অধ্যুষিত ইরান ও সুন্নি নেতৃত্বাধীন সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, যা এই অঞ্চলে বারবার প্রক্সি যুদ্ধের সূচনা করেছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক হামলার পর ইরান সত্যিই সৌদি আরবের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এর জবাবে রিয়াদ এক ক্ষুব্ধ বিবৃতিতে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানায় এবং ইরানের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে 'প্রয়োজনীয় ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ' নেওয়ার আহ্বান জানায়।
এই বিষয়ে মন্তব্য করার অনুরোধে সৌদি দূতাবাস কোনো সাড়া দেয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার তথ্যমতে, উইটকফ ও কুশনার গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেষ বৈঠক করেন। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে এটি ছিল তাদের তৃতীয় উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ। তবে বৈঠক শেষে তারা এই ধারণা নিয়ে ফিরে আসেন যে, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেহরান আসলে তাদের সঙ্গে টালবাহানা করছে।
শুক্রবার বিকালে ট্রাম্পের ক্ষোভ ও বক্তব্যের সুর আরও চড়তে থাকে। তিনি বারবার বলেন, ইরানি আলোচকদের ওপর তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন।এই হামলার সিদ্ধান্ত এক অর্থে গত দুই মাসের ব্যাপক মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি দেখেই আঁচ করা যাচ্ছিল।
শনিবার নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ট্রাম্প ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের প্রসঙ্গ তানেন। তিনি এই মার্কিন হামলাকে ইরানের সঙ্গে কয়েক দশকের সংঘাতের 'প্রতিশোধ' হিসেবে বর্ণনা করেন। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে রাখার ঘটনা; ১৯৮৩ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর হাতে বৈরুতে মার্কিন ব্যারাকে বোমা হামলায় ২৪১ জন সেনার মৃত্যু; এবং ২০০০ সালে ইয়েমেনে নোঙর করা মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ 'ইউএসএস কোল'-এ হামলার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে শনিবার ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র 'ইরানি শাসকদের কাছ থেকে আসন্ন হুমকির' সম্মুখীন। তিনি বলেন, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এমন 'দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে...যা খুব শীঘ্রই আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে পারে।'
তবে ট্রাম্পের এই দুটি দাবিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তিনি নিজেই গত গ্রীষ্মে জোর দিয়ে বলেছিলেন, বিমান হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি 'গুঁড়িয়ে' দিয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ওই হামলার পর ইরান পুনরায় তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে বা তাদের কোনো সক্রিয় বোমা তৈরির পরিকল্পনা আছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া গত বছরের এক মূল্যায়নে মার্কিন ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) জানিয়েছিল, ইরান আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ শুরু করেছে এমন কোনো লক্ষণ নেই। আর দেশটি যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ও, তবে সেই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে অন্তত এক দশক সময় লাগবে।
তবে হামলা শুরু করার পর এখন প্রশ্ন হলো—এর পরে কী হবে?
আপাতত ট্রাম্প বলছেন, খামেনির মৃত্যুর পর তিনি আশা করেন ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ 'ইরানি দেশপ্রেমিকদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে মিশে যাবে এবং দেশটিকে তার প্রাপ্য গৌরবে ফিরিয়ে নিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।'
তিনি আরও অঙ্গীকার করেন, 'মধ্যপ্রাচ্য তথা সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সপ্তাহজুড়ে বা প্রয়োজনে আরও দীর্ঘ সময় এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী এবং ভারী বোমাবর্ষণ অবিরাম চলবে।'
