ইরানে যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্পের মিথ্যা ও অপ্রমাণিত যত দাবি
ইরানের বিরুদ্ধে আরেকটি সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা চলতি সপ্তাহে বেশ কিছু জোরালো দাবি করেছেন। তাদের মতে, ইরান আবার পরমাণু কর্মসূচি শুরু করেছে, অল্প সময়ের মধ্যেই বোমা তৈরির মতো উপকরণ তাদের হাতে চলে আসবে এবং তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে যা অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই তিনটি দাবির কোনোটিই পুরোপুরি সত্য নয়, বরং বেশিরভাগই অপ্রমাণিত। মার্কিন ও ইউরোপীয় সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অস্ত্র পর্যবেক্ষণকারী দল এবং খোদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনগুলো হোয়াইট হাউসের এই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের কিছু পরমাণু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইরান এখন সেগুলো মেরামতের কাজ করছে এবং মার্কিন গোয়েন্দাদের নজরদারিতে থাকা কিছু জায়গায় নতুন করে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে বা বোমা তৈরির কোনো সক্রিয় চেষ্টা করছে, তার কোনো প্রমাণ নেই।
গত বছরের হামলায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল ভাণ্ডার মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। তাই এই মুহূর্তে বোমা তৈরি করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ইরানের হাতে স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বড় ভাণ্ডার রয়েছে, যা ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য হুমকি হতে পারে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার মতো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে ইরানের আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
গত দুই দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে পেন্টাগন। কিন্তু এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ দেখাতে পারেনি হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা যুদ্ধের পক্ষে নানা যুক্তি দিলেও সেগুলো ধোপে টিকছে না।
এমনকি তাদের নিজেদের বক্তব্যের মধ্যেও রয়েছে গরমিল। স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প ইরানের হুমকিকে যেভাবে জরুরি হিসেবে তুলে ধরেছেন, তা ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে জর্জ ডব্লিউ বুশের বক্তব্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। তখন বুশ দাবি করেছিলেন, ইরাক আফ্রিকা থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করছে, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল।
হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জিম হাইমস পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, 'মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কোনো প্রেসিডেন্টের বা দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। এখন কেন আবার সেখানে যুদ্ধ শুরু করতে হবে, তার কোনো সঠিক কারণ আমরা শুনতে পাইনি।'
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
ধারণা করা হয়, ইরানের হাতে প্রায় ২ হাজার স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। গত জুনে ইসরায়েল ও কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে শত শত মিসাইল ছোড়ার পর ইরান তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আবার পূর্ণ করেছে। তাদের মিসাইলগুলো এখন মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে আঘাত হানতে সক্ষম।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এমন মিসাইল বানাচ্ছে যা 'শিগগিরই' যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারবে। পরদিন রুবিও দাবিটি পুনরাবৃত্তি করলেও তিনি বলেছেন ইরান 'একদিন' সক্ষম হবে। ইরানের মিসাইল কর্মসূচি সম্পর্কে জানেন এমন তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প হুমকিটিকে অতিরঞ্জিত করে বলেছেন। একজন কর্মকর্তা জানান, গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা উদ্বিগ্ন যে শীর্ষ সহযোগীরা তথ্য বিকৃত করে প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপন করছেন।
গত বছরের এক প্রতিবেদনে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার মতো ব্যালিস্টিক মিসাইল ইরানের নেই এবং তা তৈরি করতে এক দশক সময় লাগতে পারে। ২০১০ সালে উইকিলিকসের ফাঁস করা নথিতে দেখা গিয়েছিল, উত্তর কোরিয়া ইরানকে মিসাইল প্রযুক্তি দিচ্ছে। সেগুলো ছিল মধ্যম পাল্লার মিসাইল। ১৬ বছর পার হলেও ইরান দূরপাল্লার মিসাইল তৈরিতে খুব একটা গুরুত্ব দিয়েছে বলে প্রমাণ নেই।
বরং ইরান স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার মিসাইলের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। কারণ তারা মনে করে, এটিই ইসরায়েল বা আমেরিকার সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অনুমতি দিলেও মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় নারাজ।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি
হোয়াইট হাউসের প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ ফক্স নিউজকে বলেছেন, ইরান 'হয়তো এক সপ্তাহের মধ্যে' বোমা তৈরির উপকরণ হাতে পাবে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তা ও অস্ত্র পরিদর্শকরা বলছেন, এটা সত্য নয়। কারণ গত জুনের হামলায় নাতানজ, ফোর্দো ও ইস্পাহানের পরমাণু স্থাপনাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা ইরানের জন্য এখন অনেক কঠিন। এমনকি তা সংগ্রহ করলেও ওয়ারহেড বানাতে কয়েক মাস বা এক বছরের বেশি সময় লাগবে।
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার মতে, ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রায় ১ হাজার পাউন্ড ইস্পাহানে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। ইরান সেগুলো বের করার চেষ্টা করছে বলে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। ট্রাম্পের দলের লোকরাই উইটকফের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সিনেটর মার্কওয়েন মুলিন সিএনএনকে বলেছেন, 'আমি উইটকফের হয়ে কথা বলতে পারব না। আমি ওই রিপোর্টগুলো দেখিনি।' রুবিও বুধবার স্বীকার করেছেন, ইরান বর্তমানে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধ করছে বলে কোনো প্রমাণ নেই।
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে দাবি করেছেন, গত জুনের হামলায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি 'পুরোপুরি ধ্বংস' করা হয়েছিল, কিন্তু ইরান আবার তা শুরু করতে চাইছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, জুনের পর ইরান নতুন কোনো পরমাণু স্থাপনা তৈরি করেনি। তবে নাতানজ ও ইস্পাহানের কাছে দুটি অসম্পূর্ণ সাইটে কিছু কার্যক্রম দেখা গেছে।
মনে হচ্ছে ইরানি প্রকৌশলীরা মাটির আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরান হয়তো এমন স্থাপনা বানাতে চাইছে যা আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত বোমা 'ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর'-এর আঘাত সহ্য করতে পারে। গত জুনে ফোর্দো সাইটে এই বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল। কর্মকর্তাদের মতে, ফোর্দো স্থাপনাটি এখনো অকেজো অবস্থায় রয়েছে।
