মার্কিন ঘাঁটি থাকা একাধিক উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রে ইরানের পাল্টা হামলা
ইরানে যৌথভাবে বড় ধরনের হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলার জবাব দিতে শুরু করেছে তেহরান, যার অংশ হিসেবে আরব রাষ্ট্রগুলোতে থাকা মার্কিন স্থাপনা ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। সবমিলিয়ে এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে।
শনিবার ইরান সরকার এক বিবৃতিতে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে দেশটির বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে। হামলার আওতায় ছিল বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো রয়েছে।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ইসরায়েলি ও মার্কিন সব সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে 'ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী আঘাত' হানা হয়েছে।
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, "শত্রুর চূড়ান্ত পরাজয় না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।" একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে, পুরো অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব স্থাপনা এখন ইরানের সামরিক বাহিনীর বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে, এসময় একজন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে।
বাহরাইন জানিয়েছে, দেশটিতে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (ফিফথ ফ্লিট) সদর দপ্তরকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
বাহরাইন সরকার এ ঘটনাকে "বিশ্বাসঘাতকতামূলক হামলা" এবং "রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন" বলে আখ্যা দিয়েছে।
এদিকে আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, কুয়েতে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) আঞ্চলিক সদর দপ্তর অবস্থিত।
কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, দেশটিতে চালানো একাধিক হামলার চেষ্টা 'ব্যর্থ করে দিয়েছে' বলে দাবি করেছে।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "পূর্বনির্ধারিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী হুমকি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কাতারের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর আগেই সব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।"
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে।
দোহা থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক জেইন বাসরাভি জানিয়েছেন, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এপর্যন্ত কেবল ওমানেই ইরান সরাসরি হামলা চালায়নি।
দীর্ঘদিন ধরেই ওমান ইরান ও অঞ্চলের অন্যান্য দেশ, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। সম্প্রতি ওমান ও জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল, সেখানে ওমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল।
গতকাল শুক্রবার ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, শান্তি 'নাগালের মধ্যে' রয়েছে। তিনি জানান, আলোচনায় ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে, যা তিনি একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্য দিয়ে সেই আলোচনাকে কার্যত সমাধিস্থ করা হলো।
১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) আরব উপদ্বীপের ছয়টি দেশ—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—নিয়ে গঠিত একটি জোট। এই জোটের লক্ষ্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সহযোগিতা জোরদার করা।
দোহা থেকে বাসরাভি আরও বলেন, "গত কয়েক ঘণ্টায় এখানে অন্তত ডজনখানেক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বেশিরভাগই সম্ভবত প্রতিহতকারী প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার শব্দ।"
তার ভাষ্য, "ইরানের দৃষ্টিতে, এই দফার সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম গুলি ছুড়েছে। ফলে এখন সম্ভবত সবকিছুই তেহরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।"
