ট্রাম্পের ইরান 'যুদ্ধের' কৌশল কি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধেরই পুনরাবৃত্তি?
২০০৩ সালের জানুয়ারি মাস। মার্কিন কংগ্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এক 'ভয়াবহ বিপদের' হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের এক 'একনায়ক' এবং তাঁর হাতে থাকা 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' (ডব্লিউএমডি)। মজার ব্যাপার হলো, সেই একনায়ক সাদ্দাম হোসেন একসময় ছিলেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই ঘনিষ্ঠ মিত্র।
ঠিক ২৩ বছর পর সেই একই কক্ষে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও শোনালেন প্রায় একই গল্প। তাঁর 'স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন' ভাষণে তিনি তুলে ধরলেন এক 'বিপজ্জনক শাসনব্যবস্থা', 'পারমাণবিক হুমকি' আর দ্রুত ফুরিয়ে আসা সময়ের কথা।
১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনকে অঢেল অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে সেই সাদ্দামই ওসামা বিন লাদেনকেও ছাপিয়ে ওয়াশিংটনের এক নম্বর শত্রুতে পরিণত হন। আর এখন সেই একই তকমা দেওয়া হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে। সাদ্দামের সঙ্গে সেই প্রলয়ংকরী যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ইরানের অন্যতম প্রধান নেতা।
যুদ্ধের এই 'চিত্রনাট্য' একই সুরে গাঁথা মনে হলেও বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট এখন অনেক বদলে গেছে। বুশ আমলের ওয়াশিংটনের নীতি ছিল 'আগ্রাসনমূলক'। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন ট্রাম্পের আমলে সেটি রূপ নিয়েছে 'প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণে'। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে ১২ দিনের হামলার পর এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে এই পরিস্থিতির মুখে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েকটি প্রশ্ন—গোয়েন্দা তথ্যগুলো কতটা সঠিক? এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? আর ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের এই খেলায় কোনো জবাবদিহি কেন নেই?
২০০৩ সালে যুদ্ধের ভয় দেখানোর কৌশল ছিল 'ওপরের দিকে'। তখন ভয় দেখানো হতো মার্কিন শহরগুলোর ওপর 'মাশরুম ক্লাউড' ওড়ার কিংবা জনবহুল এলাকায় জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ার। আর এখন সব নজর মাটির অনেক গভীরে—সুড়ঙ্গের দিকে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওসামা আবু ইরশাদ বলেন, 'বুশ প্রশাসন যেভাবে তথ্য অতিরঞ্জিত করেছিল, ট্রাম্পও ঠিক তাই করছেন। তবে একটি বড় পার্থক্য আছে। ২০০৩ সালে মিথ্যার সঙ্গে মেলাতে গোয়েন্দা তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। আর ২০২৬ সালে দেখা যাচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রকৃত মূল্যায়নের সঙ্গে ট্রাম্পের দাবির কোনো মিলই নেই।'
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর 'স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন' ভাষণে দাবি করেছেন, ইরান আমেরিকায় হামলা চালানোর জন্য আবারও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলছে। অথচ তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কথাতেই রয়েছে প্রচণ্ড বৈপরীত্য।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট তাঁর বসের সুর মিলিয়ে বলছেন, ২০২৫ সালের 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার'-এ ইরানের সব স্থাপনা 'গুঁড়িয়ে' দেওয়া হয়েছে। আবার ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মাত্র কয়েক দিন আগেই দাবি করেছেন, তেহরান পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে মাত্র 'এক সপ্তাহ' দূরে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই 'তথ্যের গোলকধাঁধা' একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে। হুমকিকে সব সময় অস্পষ্ট ও রহস্যময় রাখা, যাতে যেকোনো সময় সামরিক চাপ তৈরির অজুহাত পাওয়া যায়।
আল জাজিরাকে আবু ইরশাদ বলেন, '৯/১১ হামলার পর জনগণের মনে যে ক্ষোভ ছিল, বুশ সেটিকে কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের সেই সুযোগ নেই। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে কোনো হামলা চালায়নি। তাই তাঁকে একটি সরাসরি হুমকির গল্প সাজাতে হচ্ছে। তিনি দাবি করছেন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকায় পৌঁছাতে সক্ষম—যদিও কারিগরিভাবে এই দাবির কোনো সত্যতা নেই।'
২০০৩ সালের বুশ প্রশাসনের সঙ্গে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বড় পার্থক্য হলো অভ্যন্তরীণ ঐক্য। বুশ টিমে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডরা সবাই একই সুরে কথা বলতেন।
বাস্তবতা ছিল তার উল্টো। বাগদাদের কেন্দ্রে সাদ্দামের মূর্তি ভেঙে ফেলার দৃশ্যটি টেলিভিশনে যত নাটকীয়ই দেখাক না কেন, খুব দ্রুতই মার্কিন দখলদারির বিরুদ্ধে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ। রক্তক্ষয়ী সেই গৃহযুদ্ধে প্রাণ যায় হাজার হাজার মার্কিন সেনার। ২০০৩ সালের মে মাসে বিশাল এক ব্যানারে 'মিশন সম্পন্ন' ঘোষণা করেছিলেন বুশ। পরে সেই দম্ভই বুশ প্রশাসনকে বছরের পর বছর তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
২০২৬ সালের ট্রাম্প প্রশাসনকে অনেক বেশি বিভক্ত দেখা যাচ্ছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করছেন, তাঁদের লক্ষ্য ইরানে সরকার পরিবর্তন নয়; বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। গত রোববার ভ্যান্স বলেন, 'আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত নই, আমরা লড়ছি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে।'
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি তাঁদের কথার বিরোধিতা করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, 'বর্তমান ইরানি শাসকেরা যদি ইরানকে আবার 'মহান' করতে না পারে, তবে কেন সেখানে ক্ষমতা পরিবর্তন হবে না?'
বিশ্লেষক আবু ইরশাদ মনে করেন, ট্রাম্প এমন এক 'বিজয়' চাইছেন যা তাঁর পূর্বসূরিরা পারেননি—তা হোক সমঝোতার মাধ্যমে কিংবা ইরানকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
২০০৩ সালে বুশ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার অন্তত লোকদেখানো হলেও একটি 'বন্ধু জোট' তৈরি করেছিলেন। ইরাক যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে নিন্দিত হলেও ব্লেয়ার তখন ওয়াশিংটনকে বড় কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন।
কিন্তু ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখা যাচ্ছে একেবারেই একাকী। আবু ইরশাদ ব্যাখ্যা করেন, 'ট্রাম্প জোট গড়ছেন না, বরং মিত্রদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। এখন শুধু ইসরায়েলই পুরোপুরি আমেরিকার পাশে আছে।'
পরিস্থিতি এতটাই বদলেছে যে, ২০২৫ সালের অভিযানে ব্রিটেন তাদের দ্বীপ ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করতে আমেরিকাকে অনুমতি দেয়নি। ফলে মার্কিন বি-টু বোমারু বিমানগুলোকে সরাসরি আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে ১৮ ঘণ্টা উড়ে গিয়ে ইরানে হামলা চালাতে হয়েছিল।
ইরাক যুদ্ধের গোয়েন্দা তথ্যের চরম ব্যর্থতা আর মিথ্যার পর অঙ্গীকার করা হয়েছিল যে, এরপর থেকে যুদ্ধের ব্যাপারে কংগ্রেসের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। দুই দশক পর সেই নিয়ন্ত্রণ বা জবাবদিহি এখন অদৃশ্য।
ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় পক্ষের কয়েকজন সদস্য যুদ্ধ রুখতে আবেদন করলেও রিপাবলিকান পার্টি এখন পুরোপুরি ট্রাম্পের অনুসারীদের দখলে। সুপ্রিম কোর্টও ডানপন্থীদের দিকে হেলে আছে। ট্রাম্প ৯/১১ পরবর্তী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করছেন যা দিয়ে যে কোনো সময় 'সীমিত হামলা' শুরু করা যায়—আর সেই হামলা কখন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তেহরানের বিক্ষোভে '৩২ হাজার' মানুষ নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে মার্কিন প্রশাসন। যদিও স্বতন্ত্র সূত্রগুলো বলছে এই সংখ্যা অনেক অতিরঞ্জিত। ইরানও একে 'বড় মিথ্যা' বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্যের মাধ্যমে মূলত জাতিসংঘ বা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই একটি যুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
