বাতাস থেকে মিলবে বিশুদ্ধ পানি; দ্বীপবাসীর জীবন বাঁচাতে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী আবিষ্কার
ঘূর্ণিঝড় বা খরায় মূল সরবরাহ লাইন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও মিলবে বিশুদ্ধ পানি। পরিবেশবান্ধব এমনই এক যুগান্তকারী যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী। তিনি বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর মানুষের জীবন বাঁচাতে এই আবিষ্কার বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যন্ত্রটির আবিষ্কারক রসায়নবিদ অধ্যাপক ওমর ইয়াগি। যন্ত্রটিতে 'রেটিকুলার কেমিস্ট্রি' নামের বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা ব্যবহার করে আণবিকভাবে তৈরি উপাদান (মলিকিউলারলি ইঞ্জিনিয়ারড ম্যাটেরিয়ালস) কাজে লাগানো হয়েছে। এর মাধ্যমে একেবারে শুষ্ক ও মরুভূমির মতো পরিবেশেও বাতাস থেকে আর্দ্রতা টেনে নিয়ে বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করা সম্ভব।
অধ্যাপক ইয়াগির প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'অ্যাটোকো' জানিয়েছে, ২০ ফুট লম্বা একটি শিপিং কনটেইনারের সমান এই যন্ত্রগুলো চলবে অতি নিম্নমাত্রার তাপশক্তিতে (আলট্রা-লো-গ্রেড থার্মাল এনার্জি)। ঘূর্ণিঝড় বা খরার কারণে যদি বিদ্যুৎ ও পানির মূল সরবরাহ বন্ধও হয়ে যায়, তবু এই যন্ত্রগুলো লোকালয়ে বসিয়ে প্রতিদিন এক হাজার লিটার পর্যন্ত বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করা যাবে।
রসায়নে ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ইয়াগি বলেন, খরাপ্রবণ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জগুলো এতে দারুণভাবে উপকৃত হবে।
বেরিল বা মেলিসার মতো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর হাজার হাজার মানুষ সুপেয় পানির অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়েন। নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীর মতে, এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর পানিবন্দী বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া জনপদে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তার এই আবিষ্কার দুর্দান্ত এক সমাধান হতে পারে।
অধ্যাপক ওমর ইয়াগি বলেন, 'মেলিসা বা বেরিলের মতো ঘূর্ণিঝড় ক্যারিবীয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ডেকে এনেছিল। ঘরবাড়ি ও খেতখামার ধ্বংস করার পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা—বিশেষ করে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা টেকসই করা কতটা জরুরি।'
এই নোবেলজয়ী আরও বলেন, তার এই আবিষ্কার পানি সংগ্রহের প্রচলিত অন্য পদ্ধতিগুলোর একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত (ডেসালিনেশন) করার প্রক্রিয়ার কথা বলেন। ওই প্রক্রিয়ায় অবশিষ্ট ঘন লবণাক্ত পানি যখন পুনরায় সাগরে ফেলা হয়, তখন তা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের (ইকোসিস্টেম) জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে। কিন্তু নতুন এই যন্ত্রে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার কোনো ভয় নেই।
বিশুদ্ধ পানির এই আবিষ্কার এমন একসময়ে সামনে এল, যখন বিশ্বজুড়ে সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার চলছে। গত মাসেই জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পৃথিবী এখন 'বৈশ্বিক পানি দেউলিয়াত্বের যুগে' (গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাংক্রাপটসি এরা) প্রবেশ করেছে। বিশ্বের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ মানুষই এখন এমন সব দেশে বাস করছে, যেগুলো চরম মাত্রায় পানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, 'বিশ্বের প্রায় ২২০ কোটি মানুষ এখনো নিরাপদ সুপেয় পানির অভাবে ভুগছে। ৩৫০ কোটি মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন বা পয়োনিষ্কাশন সুবিধা নেই। এ ছাড়া প্রায় ৪০০ কোটি মানুষকে বছরের অন্তত এক মাস চরম পানি সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।'
ক্যারিবীয় সাগরের তিন দ্বীপের দেশ গ্রেনাডায় গত বছর (২০২৪) ভয়াবহ আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় বেরিল। বিশেষ করে ক্যারিয়াকো ও পেটিট মার্টিনিক দ্বীপ দুটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিকে ঘূর্ণিঝড়, অন্যদিকে খরা ও উপকূলীয় ভাঙন—এই ত্রিমুখী বিপদে থাকা এসব মানুষের জন্য অধ্যাপক ইয়াগির আবিষ্কার এক নতুন আশার আলো।
ক্যারিয়াকো সরকারের কর্মকর্তা ও পরিবেশকর্মী ডেভন বেকার বলেন, 'গ্রিডের (জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন) বাইরে থেকে শুধু পরিবেশের সাধারণ তাপমাত্রা ব্যবহার করে পানি উৎপাদনের এই প্রযুক্তি আমাদের জন্য সত্যিই চমৎকার এক সমাধান হতে পারে।'
ঘূর্ণিঝড় বেরিলের ধ্বংসযজ্ঞের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি ক্যারিয়াকো ও পেটিট মার্টিনিক। দ্বীপগুলোতে প্রতিবছর খরার প্রকোপ বাড়ছে, দীর্ঘ হচ্ছে খরাকাল। বাধ্য হয়ে এই শুষ্ক মৌসুমে মূল ভূখণ্ড গ্রেনাডা থেকে তাদের পানি আমদানি করতে হয়।
ডেভন বেকার বলেন, 'আমরা এখন ঘুরে দাঁড়ানোর নানা কৌশল নিয়ে ভাবছি। অধ্যাপক ইয়াগির এই বায়বীয় পানি সংগ্রহের (অ্যাটমোসফেরিক ওয়াটার-হারভেস্টিং) প্রযুক্তি আমাদের বড় কিছু সমস্যার সমাধান দিতে পারে।' তিনি আরও বলেন, পানি আমদানি করতে প্রচুর খরচ হয়, এতে কার্বন নির্গমন বাড়ে এবং পানি দূষিত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। ঘূর্ণিঝড়ে কেন্দ্রীয় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এসব কারণেই প্রথাগত অবকাঠামো অকেজো হয়ে গেলে স্থানীয়ভাবে কাজ করবে—এমন সমাধানই এখন তাদের বেশি প্রয়োজন।
জর্ডানের এক উদ্বাস্তু শিবিরে বেড়ে উঠেছেন অধ্যাপক ইয়াগি। সেই বাড়িতে কলের পানি বা বিদ্যুৎ—কোনোটাই ছিল না। ছোটবেলার সেই চরম অভাব ও কষ্টই তাকে এমন যুগান্তকারী কিছু আবিষ্কারের প্রেরণা জুগিয়েছে। নোবেল পুরস্কারের ভোজসভায় দেওয়া ভাষণে সেই মরুভূমির স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, 'সরকার থেকে সপ্তাহে বা দুই সপ্তাহে একবার আমাদের এলাকায় পানি আসত।'
সেই দিনের কথা স্মরণ করে ইয়াগি বলেন, 'আমার এখনো মনে পড়ে, আশপাশের সবার মধ্যে ফিসফাস শুরু হতো—পানি আসছে! আর আমি হন্তদন্ত হয়ে ছুটতাম, পানি আসা বন্ধ হওয়ার আগেই হাতের কাছে যা পেতাম, তা দিয়ে সব পাত্র ভরতে শুরু করতাম।'
নিজের এই আবিষ্কারকে 'পদার্থের নতুন রূপ দেওয়ার বিজ্ঞান' হিসেবে বর্ণনা করেন এই নোবেলজয়ী। বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'বাধাগুলো দূর করুন, গবেষণার স্বাধীনতা রক্ষা করুন এবং বিশ্বের সব প্রতিভাকে স্বাগত জানান।'
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করার সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেন ইয়াগি। তিনি বলেন, 'জলবায়ু ইস্যুতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার সময় চলে এসেছে। বিজ্ঞান আমাদের হাতের মুঠোয়। এখন শুধু দরকার সাহস—আমাদের বিশাল লক্ষ্যের সমান সাহস। তবেই আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শুধু কার্বন ধারণ (কার্বন ক্যাপচার) করার প্রযুক্তি নয়, বরং তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাসযোগ্য একটি পৃথিবী রেখে যেতে পারব।'
