কেন দুবাইয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন চীনের ধনীরা?
সিঙ্গাপুরের সিনিয়র মিনিস্টার লি সিয়েন লুং সম্প্রতি দেশটিতে বসবাসরত বিদেশিদের একটি বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'অনুগ্রহ করে নিজেদের জৌলুস একটু কমিয়ে রাখুন।' অভিবাসীদের প্রতি লি-র উপদেশ ছিল—অহেতুক দামি শ্যাম্পেনের বোতল খোলা বা রাতে উচ্চশব্দে ফেরারি চালিয়ে স্থানীয়দের বিরক্তির কারণ না হওয়া। তবে উপসাগরীয় শহর দুবাইয়ের সামাজিক চিত্র এর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে নিজের ইতালীয় স্পোর্টসকার নিয়ে ঘুরে বেড়ানো লি গুয়ো নামের এক চীনা অভিবাসী জানান, দুবাইয়ে সম্পদের প্রদর্শন মোটেও নেতিবাচকভাবে দেখা হয় না।
লি গুয়ো একা নন। বর্তমানে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ নিয়ে চীনের অসংখ্য বিত্তশালী অভিবাসী দুবাইয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন। নিজ দেশে স্থবির অর্থনীতি এবং মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে তারা এখন নিজেদের সম্পদ বিভিন্ন দেশে সরিয়ে নিচ্ছেন। দীর্ঘকাল ধরে সিঙ্গাপুর ছিল চীনের ধনকুবেরদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু বর্তমানে তারা দুবাইয়ের মতো নিরাপদ, করমুক্ত এবং বিলাসী জীবনযাপনের উপযোগী জায়গার দিকে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি চীনের অনেক কোম্পানিও নিজ দেশের মন্দা বাজার ছেড়ে দুবাইয়ের মতো ক্রমবর্ধমান বাজারের দিকে হাত বাড়াচ্ছে।
চীনের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বর্তমানে ৩ লাখ ৭০ হাজার চীনা নাগরিক বসবাস করছেন। সেখানে ১৫ হাজারেরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০১৯ সালের তুলনায় এই সংখ্যা বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ।
সম্পদশালী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান 'হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স'-এর মতে, ২০২৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিট ১০ হাজার ডলার-মিলিয়নেয়ার প্রবেশ করেছেন। বিপরীতে সিঙ্গাপুরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৬০০। দুবাইয়ের অফশোর ফিন্যান্সিয়াল সেন্টারে বর্তমানে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ভেহিকল বা পারিবারিক বিনিয়োগ তহবিল সক্রিয় রয়েছে, যা ২০২৪ সালের শেষে ছিল ৮০০। যদিও আমিরাত কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারীদের জাতীয়তা প্রকাশ করে না, তবে সম্পদ উপদেষ্টাদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই এসেছে চীনের পুঁজি থেকে।
দুবাইয়ে বসবাসরত চীনারা এখন নিজ দেশের মতোই স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছেন। এখানে শুধু চীনা রেস্তোরাঁই নয়, তাদের রুচি অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে বিশাল চেইন শপ 'উইমার্ট'। মরুভূমির গ্রিনহাউসে ফলানো হচ্ছে চীনের পরিচিত শাকসবজি। ২০২০ সাল থেকে সেখানে চালু হয়েছে 'চাইনিজ স্কুল দুবাই', যেখানে সাশ্রয়ী ফিতে চীনের জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পড়াশোনা করা যায়। এমনকি সেখানে চীনাদের জন্য আলাদা হাসপাতালও রয়েছে।
একজন নবাগত চীনা অভিবাসী জানান, দুবাইয়ের চীনা কমিউনিটি এখন অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
বিনিয়োগের এই জোয়ারে শুধু পারিবারিক সম্পদই নয়, চীনা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। দুবাই মাল্টি কমোডিটিজ সেন্টারের (ডিএমসিসি) ডেপুটি সিইও ফেরিয়াল আহমাদি জানান, তাদের ফ্রি-ট্রেড জোনে ১ হাজারেরও বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
গত তিন বছরে প্রতি বছরই এই সংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ করে বেড়েছে। এই তালিকায় চীনের বড় রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও পেট্রোলিয়াম কোম্পানি থেকে শুরু করে 'উইরাইড'-এর মতো অত্যাধুনিক স্বয়ংচালিত গাড়ি নির্মাতা স্টার্টআপও রয়েছে।
হংকং বা সিঙ্গাপুরে ভাষা ও উন্নত পুঁজি বাজারের সুবিধা থাকলেও তিনটি প্রধান কারণে দুবাইয়ের আবেদন বাড়ছে: নিরপেক্ষতা, উন্মুক্ত পরিবেশ এবং অর্থ উপার্জনের সুযোগ।
দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর নিরপেক্ষ অবস্থান। ২০২২ সালে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ধনীরা বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত হলেও দুবাই তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। চীনের বিত্তশালীদের জন্য এটি একটি বড় বার্তা—পশ্চিমারা যে কোনো সময় নিষেধাজ্ঞা দিলে দুবাই তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে।
এ ছাড়া আবাসন ও রেসিডেন্সি প্রক্রিয়ায় দুবাই বেশ উদার। সিঙ্গাপুর বা সুইজারল্যান্ডে বসবাস করা কঠিন হলেও দুবাইয়ে ২ মিলিয়ন দিরহাম (প্রায় ৫ লাখ ৪৫ হাজার ডলার) মূল্যের একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনলেই দীর্ঘমেয়াদী ভিসা পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে দুবাই ১ লাখ ৫৮ হাজার রেসিডেন্সি পারমিট ইস্যু করেছে, যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক সময়ে মানি লন্ডারিং কেলেঙ্কারির পর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নথিপত্র কড়াভাবে পরীক্ষা করছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপরও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে। বিপরীতে দুবাইয়ের পরিবেশ অনেকটা শিথিল থাকায় অনেক ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান সেখানে আস্তানা গাড়ছে।
সামাজিকভাবে দুবাইয়ের উদারতা চীনের ধনীদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। লি গুয়ো বলেন, 'চীনে আপনি অতি ধনী হলেও ল্যাম্বরগিনি চালাতে পারবেন না। কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের সেখানে খুব সাধারণ জীবনযাপন করতে হয়। কিন্তু দুবাইয়ে আপনি যা খুশি চালাতে পারেন, কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না।'
মুনাফার ক্ষেত্রেও দুবাই এখন উর্বর ভূমি। দুবাইয়ের আবাসন খাতে বিনিয়োগ করে চীনারা ভালো মুনাফা পাচ্ছেন। ২০২৫ সালে দুবাইয়ের আবাসিক সম্পত্তির দাম বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। চীনের ধুঁকতে থাকা আবাসন খাতের তুলনায় যা অনেক বেশি লাভজনক। এ ছাড়া নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষায় দুবাইয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বেশ উৎসাহ দেয়। 'উইরাইড'-এর কর্মকর্তা এরিক ডং জানান, চীনে ট্যাক্সি ভাড়া যেখানে প্রতি কিলোমিটারে ৩০ সেন্ট, দুবাইয়ে তা প্রায় তিনগুণ বেশি। ফলে এখানে ব্যবসা করা অনেক বেশি লাভজনক।
তবে এই অভিবাসনের জোয়ারে কিছু জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সাইবার অপরাধী ও স্ক্যাম সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে কড়াকড়ি শুরু হওয়ায় তাদের অনেকে এখন দুবাইয়ে আস্তানা গাড়ছে। ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়ছে।
এ ছাড়া আরও দুটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, চীন সরকার যদি তাদের বিত্তশালীদের দেশের বাইরে অর্থ সরিয়ে নেওয়া ও জৌলুস দেখানো পছন্দ না করে, তবে তারা পুঁজি চলাচলের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্ব শুরু হলে দুবাইয়ের ব্যাংকগুলোও গৌণ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারে। তবে যতক্ষণ সেই পরিস্থিতি না আসছে, দুবাইয়ের এই 'চীনা জৌলুস' কমবে বলে মনে হচ্ছে না।
