এপস্টিনকে ‘আশীর্বাদ’ মানতেন ধনকুবের ফারকাস, মিলেমিশে করতেন ব্যবসা
জেফরি এপস্টিন কুখ্যাত এক যৌন অপরাধী। তার সঙ্গে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে ইমেইলে যোগাযোগ ছিল মার্কিন ধনকুবের অ্যান্ড্রু ফারকাসের। আদান-প্রদান হয়েছে প্রায় ২ হাজার ইমেইল। সেখানে ফারকাস জীবন, একাকিত্ব এবং বার্ধক্য নিয়ে তার একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনাগুলো এপস্টিনের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন।
বিনিয়োগকারীদের কাছে অবশ্য এই সম্পর্কের কথা তিনি বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, এপস্টিনের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব কিংবা জেলে গিয়ে দেখা করার বিষয়টি কখনোই জানাজানি হবে না।
কিন্তু গত ৩০ জানুয়ারি এপস্টিন ফাইলের আরও ৩০ লাখ পৃষ্ঠা প্রকাশ হওয়ার পর ফারকাসের সেই গোপন বন্ধুত্ব ফাঁস হয়ে গেছে। নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট মোগল ফারকাস এপস্টিনকে তার জীবনের 'অন্যতম আশীর্বাদ' এবং 'সবচেয়ে সাহসী মানুষদের একজন' বলে অভিহিত করেছিলেন।
নথিপত্র বলছে, তাদের সম্পর্কটা ছিল গভীর। একে অপরকে গোপন কথা বলতেন, ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। ফারকাস এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপেও যেতেন। তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল মূলত রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতে, যা এপস্টিনকে লাখ লাখ ডলার কর বাঁচাতে সাহায্য করেছিল। শুক্রবার এক ইমেইল বার্তায় ফারকাস তাদের সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করেননি।
তিনি বলেন, 'জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে মেলামেশার জন্য আমি গভীরভাবে অনুতপ্ত।' তবে মেরিনা বা নৌঘাট ব্যবসায় অংশীদারিত্ব গোপন রাখার অভিযোগ তিনি মানতে নারাজ। তার দাবি, এটি প্রকাশ করার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
সপ্তাহান্তে পাঠানো আরেক বার্তায় ৬৫ বছর বয়সী ফারকাস বলেন, ১৫ বছরের ইমেইল বার্তালাপ 'ভুলভাবে উপস্থাপন' করা হতে পারে, যদি তা প্রসঙ্গের বাইরে বা তার কথা বলার ভঙ্গি না বুঝে বিচার করা হয়। তিনি দাবি করেন, 'আমি কোনো সময়ই অনুপযুক্ত আচরণ করিনি।'
ফারকাসের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। তবে ইমেইলগুলোতে নারীবিদ্বেষী মন্তব্য এবং ক্ষমতাধরদের নাম উল্লেখ করার বিষয়টি স্পষ্ট। বোঝা যায়, তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধুত্বেরই ফসল।
এপস্টিনকে খুশি রাখতে ফারকাস তাকে বিভিন্ন ব্যবসায় ঢোকাতে চাইতেন। বিনিময়ে এপস্টিন তাকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবশালী ব্যাংকারদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন।
ফারকাস 'আইল্যান্ড ক্যাপিটাল'-এর প্রতিষ্ঠাতা। এই মার্চেন্ট ব্যাংকের মালিকানায় রয়েছে ৩৭৩ মিলিয়ন ডলারের শেরাটন টাইমস স্কয়ার। তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিরও একজন বড় দাতা।
২০০৫ সালে ফারকাস বিলাসবহুল মেরিনা ব্যবসায় নামতে চেয়েছিলেন। তিনি সেন্ট থমাসে 'আইল্যান্ড গ্লোবাল ইয়টিং' নামে একটি কোম্পানি চালু করেন। এখানেই ১৯৯৮ সাল থেকে এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপ ছিল।
২০০৬ সালের জুলাইয়ে এপস্টিনের বিরুদ্ধে ফ্লোরিডায় পতিতাবৃত্তির অভিযোগ ওঠে। এর চার মাস পর ফারকাস তাকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে একটি ব্যবসার খবর দেন। তিনি লেখেন, 'আমরা আমেরিকান ইয়ট হারবার কেনার চুক্তিতে আছি... আমি চাই আপনিও এতে থাকুন।'
ফারকাস ২০১৯ সালে তার বোর্ডের কাছে দাবি করেছিলেন, অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তিনি এপস্টিনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু নতুন নথি সেই দাবি ভুল প্রমাণ করছে।
২০০৮ সালের জুনে এপস্টিন জেলে যান। জানা গেছে, ১৩ মাসের সাজা খাটার সময় ফারকাস নিয়মিত তার সঙ্গে দেখা করতেন। যদিও দর্শনার্থীর খাতায় তার নাম ছিল না। এপস্টিন সপ্তাহে ছয় দিন 'কাজের জন্য' জেলের বাইরে নিজের অফিসে যাওয়ার বিশেষ অনুমতি পেয়েছিলেন। সেখানেই নিউইয়র্ক থেকে গোপনে গিয়ে দেখা করতেন ফারকাস।
২০০৮ সালের নভেম্বরে এপস্টিন তাকে ইমেইলে লিখেছিলেন, 'তোমাকে দেখে ভালো লাগল।' ২০০৯ সালের আগস্টে এক ইমেইলে ফারকাস এপস্টিনকে 'প্রিয় বন্ধু' সম্বোধন করে তার সঙ্গে দেখা করতে পাম বিচে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন।জেল থেকে বের হওয়ার পর এপস্টিন ও ফারকাস দুজনেই সেন্ট থমাসে বড় ধরনের কর ছাড় পান।
ভার্জিন আইল্যান্ডস ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অথরিটির সঙ্গে চুক্তির ফলে তারা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কর বাঁচাতে পেরেছিলেন। জেপিমর্গান চেজের এক মামলা অনুযায়ী, এই কর ছাড়ের ফলে এপস্টিন ৩০ কোটি ডলারেরও বেশি সাশ্রয় করেছিলেন।
আমেরিকান ইয়ট হারবার ছাড়াও তারা অন্য ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। ২০১২ সালে ফারকাস তার রিয়েল এস্টেট ফার্ম 'সি-থ্রি ক্যাপিটাল পার্টনারস'-এর একটি উদ্যোগে এপস্টিনকে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
ইমেইলে আরও দেখা গেছে, ফারকাস এপস্টিনের দ্বীপে যেতেন এবং নারীদের 'উপহার' হিসেবে উল্লেখ করতেন। একবার এপস্টিন জানতে চেয়েছিলেন ফারকাস এখনো 'উপহারের' অপেক্ষায় আছেন কি না। জবাবে ফারকাস এক নারীর নাম ও ফোন নম্বর পাওয়ার উপায় বাতলে দেন।
বিচার বিভাগের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, একটি ইয়টে এপস্টিন এবং ফরাসি মডেলিং এজেন্ট জঁ-লুক ব্রুনেলের সঙ্গে ফারকাসও আছেন। সেখানে কয়েকজন তরুণীও ছিলেন। এক ছবিতে ফারকাসকে এক তরুণীকে জড়িয়ে ধরে থাকতে দেখা যায়।
২০১৬ সালে এপস্টিনকে সেন্ট থমাসে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে সাহায্য করেছিলেন ফারকাস। তিনি 'ব্যাঙ্কো পপুলার'-এর সিইও রিচার্ড ক্যারিয়নের মাধ্যমে এই সুবিধা করে দেন।
বিনিময়ে এপস্টিনও ফারকাসের উপকার করতেন। তিনি ফারকাসকে সেন্ট থমাসের সরকারি নেতা সেলেস্টিনো হোয়াইটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। হোয়াইটের বিরুদ্ধে এপস্টিনের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এপস্টিন ফারকাসকে জেপিমর্গানের জেস স্ট্যালির সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ২০১২ সালে ফারকাস এপস্টিনকে লিখেছিলেন, 'জেস সত্যিই চমৎকার মানুষ। মাত্রই তার অফিস থেকে বের হলাম।'২০২২ সালে ফারকাস তার 'আইল্যান্ড গ্লোবাল ইয়টিং' কোম্পানি বিক্রি করে দেন।
কিন্তু এপস্টিন নথিতে নাম আসার পর তিনি কোম্পানিটি আবার কিনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। কোম্পানিটির বর্তমান মালিক 'মেরিনম্যাক্স' অভিযোগ করেছে, ফারকাস গোপন তথ্য পেতে এক কর্মীকে ৯ লাখ ডলার ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সফল হলে আরও ৩০ লাখ ডলার দেওয়ার টোপও দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য ফারকাস এই অভিযোগ 'মিথ্যা ও ভিত্তিহীন' বলে দাবি করেছেন।
