ব্রিটেন কি তবে আরেকজন প্রধানমন্ত্রী হারাতে যাচ্ছে?
২০২২ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় বরিস জনসন বলেছিলেন, তার অনুগত রাজনীতিকরাই তার বিরুদ্ধে চলে গেছেন।
এই বিরোধী অবস্থানই তার রাজনৈতিক পরিণতি নির্ধারণ করে দেয়। সে সময় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, 'দলবদ্ধ মানসিকতা খুবই শক্তিশালী। আর যখন দল সরে যায়, তখন সবাই সরে যায়।'
এখন একই প্রশ্ন উঠছে কিয়ার স্টারমারকে নিয়ে। ২০২৪ সালে তার লেবার পার্টি বড় ব্যবধানে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু গত সপ্তাহান্তে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মরগান ম্যাকসুইনির পদত্যাগ এবং গত ১৮ মাসে সরকারের নানা বিপর্যয় তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক মহলে অসন্তোষ ও হতাশা স্পষ্ট হলেও, এখনো দলীয়ভাবে একযোগে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়নি। অন্তত এখনো নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা, এমনকি গার্ডিয়ানের লেখকরাও একমত যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমারের সময় ফুরিয়ে আসছে। গত ১০ বছরে যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে। ডেভিড ক্যামেরনের পর থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস এবং ঋষি সুনাকের পর স্টারমার ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
স্টারমারের নিজ দলেও অনেকেই মনে করছেন তার সময় শেষ, তবে প্রকাশ্যে বলার সাহস খুব কম লোকই দেখাচ্ছেন। সোমবার স্কটিশ লেবার পার্টির নেতা আনাস সারওয়ার প্রথম হেভিওয়েট নেতা হিসেবে প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি বলেন, 'বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে হবে এবং ডাউনিং স্ট্রিটের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হবে।' তবে সারওয়ারের ডাকে কেউ সাড়া দেয়নি এবং এক ঘণ্টার মধ্যে স্টারমারের মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্যরা তাকে সমর্থন জানিয়ে অবস্থান নেন, যা তাকে টিকিয়ে রাখার সমন্বিত প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।
ম্যাকসুইনির পদত্যাগ ও এপস্টিন সংযোগ
স্টারমারের চিফ অফ স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম না হলেও ব্রিটিশ রাজনীতিতে তার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি ছিলেন স্টারমারের প্রধান সহযোগী এবং কৌশলী, যিনি লেবার পার্টির বিপুল জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। সরকারে তিনি ছিলেন স্টারমারের প্রধান মিত্র। তাদের সম্পর্ক ছিল সাইমন-গারফাঙ্কেল বা স্টারস্কি-হাচের মতো ঘনিষ্ঠ।
ম্যাকসুইনির পদত্যাগ এবং স্টারমারের ওপর এই চাপের মূল কারণ কুখ্যাত জেফরি এপস্টিনের নথি প্রকাশ। প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, ব্রিটিশ রাজনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসন এপস্টিনের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ছিলেন ম্যান্ডেলসন। এপস্টিনের সঙ্গে তার সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসার পর তিনি পদত্যাগ করেন।
ম্যান্ডেলসন দাবি করেছিলেন, এপস্টিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুব গভীর ছিল না। কিন্তু ১০ দিন আগে প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, তারা এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে ২০০৮ সালে লেবার সরকারের মন্ত্রী থাকাকালে ম্যান্ডেলসন এপস্টিনের সঙ্গে বাজার-সংবেদনশীল গোপন তথ্য শেয়ার করেছিলেন।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডন এই ঘটনাকে যুক্তরাজ্যের সম্ভবত সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার দায় শেষ পর্যন্ত স্টারমারের ওপরই বর্তায়। তবে ম্যাকসুইনি তাকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং সেই দায় স্বীকার করেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। ম্যাকসুইনি তার বিবৃতিতে বলেন, 'পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। তিনি আমাদের দল, দেশ এবং রাজনীতির ওপর বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।'
সমর্থকরা আশা করছেন, এই পদত্যাগ স্টারমারকে সরকার ঢেলে সাজানোর সময় দেবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, তার শেষ রক্ষকবচ সরে গেছে এবং তার বিদায় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
গার্ডিয়ানের পলিটিক্যাল এডিটর পিপা ক্রেরার উল্লেখ করেছেন, স্টারমার তার পুরো ক্যারিয়ারে নারীদের সুরক্ষায় কাজ করেছেন। এপস্টিন কেলেঙ্কারি তার সেই ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে, যা তাকে অনুশোচনায় ফেলতে পারে এবং নিজের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করতে পারে।
যদি স্টারমার টিকে থাকতে চান, তবে তার উত্তরসূরি কে হবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অ্যাঞ্জেলা রেয়নার এবং ওয়েস স্ট্রিটিং সম্ভাব্য প্রার্থী হলেও তাদের নিয়ে দলে বিভক্তি রয়েছে। রেয়নার কর জটিলতার কারণে মন্ত্রিসভা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, আর স্ট্রিটিং দলে বিভক্তি সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত। তারা কি দলকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন, বা কনজারভেটিভ সরকারের কেলেঙ্কারিতে বিরক্ত দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে পারবেন—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আগামী মে মাসে স্কটিশ ও ওয়েলশ পার্লামেন্ট এবং ইংল্যান্ডের কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে লেবার পার্টির ফল খারাপ হলে স্টারমারের ওপর চাপ অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তখন হয়তো তার নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেন এবং তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন।
