খুন ও ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, তবু নিয়মিত প্যারোলে মুক্তি পান ভারতের যে ‘ধর্মগুরু’
খুন ও ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে এতোদিনে ভারতের কড়া নিরাপত্তার এক জেলখানায় থাকার কথা তার। অথচ অদ্ভুত এক নিয়মিত বিরতিতে কারাগারের দরজা খুলে যায় তার জন্যে। তিনি বেরিয়ে আসেন, বাইরে এসেই লাখো ভক্তের উদ্দেশে ভক্তি, নীতিনৈতিকতার বাণী প্রচার করতে শুরু করেন।
বর্ণিল জীবনযাপন আর রকস্টারদের মতো জাঁকজমকপূর্ণ চলাফেরার জন্য পরিচিত এই গুরুর নাম গুরমিত রাম রহিম সিং। ধর্ষণের অভিযোগে ২০১৭ সালে তিনি প্রথম কারাগারে যান। এর দুই বছর পর খুনের দায়েও দোষী সাব্যস্ত হন।
কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, গুরু রাম রহিম এ পর্যন্ত ১৫ বার প্যারোলে (সাময়িক মুক্তি) জেল থেকে বের হয়েছেন। সব মিলিয়ে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পরও তিনি কারাগারের বাইরে কাটিয়েছেন ৪০০ দিনেরও বেশি সময়।
ভারতে তথাকথিত অনেক 'ধর্মগুরু' বা 'গডম্যান' আছেন, যাদের ভক্তসংখ্যা অগণিত। কিন্তু রাম রহিমের এভাবে বারবার মুক্তি পাওয়া নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। সমালোচকরা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশে তথাকথিত আধ্যাত্মিক গুরুদের প্রভাব, অর্থবিত্ত এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ যে বিচারব্যবস্থার পাল্লাকেও প্রভাবিত করতে পারে, রাম রহিমের বারবার মুক্তি পাওয়া তারই এক উদাহরণ।
হরিয়ানা রাজ্যের আইনে 'ভালো আচরণের' পুরস্কার হিসেবে কয়েদিদের প্যারোল দেওয়ার বিধান রয়েছে। এই আইনের সুযোগ নিয়েই জানুয়ারি মাসের শুরুতে আবারও জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন রাম রহিম। আর ছাড়া পাওয়ার পর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি। সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন গানের ডালি সাজিয়ে নিজের প্রচারণায় নেমে পড়েছেন তিনি।
'বাবার জন্য লড়াই করে যাচ্ছি ২০০২ সাল থেকে'
গুরুর এই বারবার মুক্তি মেনে নিতে পারছেন না তার অপরাধের শিকার পরিবারগুলো। সাংবাদিক রাম চন্দর ছত্রপতির ছেলে আনশুল ছত্রপতি এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ২০০২ সালে রাম রহিমের আধ্যাত্মিক সংগঠন 'ডেরা সাচ্চা সওদা'র ভেতরের নির্যাতন ও অনিয়মের খবর প্রকাশ করায় সাংবাদিক রাম চন্দরকে হত্যা করা হয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ডের দায়েই সাজা খাটছেন এই তথাকথিত ধর্মগুরু।
আনশুল বলেন, 'বাবার জন্য সেই ২০০২ সাল থেকে আমি আজ পর্যন্ত লড়াই করে যাচ্ছি।'
অবশ্য ডেরা সাচ্চা সওদার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, রাজ্যের হাজার হাজার বন্দীর মতোই রাম রহিম প্যারোল পাওয়ার যোগ্য। তাকে কোনো 'বিশেষ সুবিধা' দেওয়া হয়নি।
রাম রহিম সিং কেবল একজন ধর্মগুরু নন, তিনি পুরোদস্তুর একজন 'মিডিয়া মোঘল'। তিনি নিজেই পাঁচটি সিনেমা প্রযোজনা করেছেন এবং সেগুলোতে অভিনয়ও করেছেন। এর মধ্যে 'ম্যাসেঞ্জার অব গড' সিনেমায় তাকে সুপারহিরো হিসেবে দেখা গেছে। তার গানের জগতও বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। ভক্তদের কাছে তার গাওয়া 'লাভ চার্জার' গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়।
বিশৃঙ্খলার মধ্যে ডেরা সাচ্চা সওদার উত্থান
১৯৪৮ সালে হরিয়ানার সিরসা শহরে ডেরা সাচ্চা সওদা প্রতিষ্ঠা করেন মস্তানা বালুচিস্তানি নামে এক সুফি সাধক। সিরসা শহরটি ভারতের 'শস্যভাণ্ডার'খ্যাত পাঞ্জাব এবং মরুরাজ্য রাজস্থানের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত।
ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ করে চলে যাওয়ার পর উপমহাদেশজুড়ে যে ভয়াবহ দাঙ্গা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার ক্ষত তখনো দগদগে। লাখ লাখ মুসলিম তখন নবগঠিত পাকিস্তানের দিকে ছুটছিলেন, আর হিন্দু ও শিখরা পাড়ি জমাচ্ছিলেন ভারতে। পাঞ্জাব ও এর আশপাশের অঞ্চলের মানুষের জীবন তখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল দেশভাগ, স্বজন হারানো আর বাস্তুচ্যুতির বেদনায়। সেই সময়টিতেই ডেরা সাচ্চা সওদার যাত্রা শুরু।
সেই বিশৃঙ্খলা ও দেশভাগের ক্ষতবিক্ষত সময়ে মানুষের জন্য 'ডেরা সাচ্চা সওদা' হয়ে উঠেছিল এক আশ্রয়স্থল। প্রায় ৭০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই চত্বরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি আলাদা জগত। এখানে নিজস্ব হাসপাতাল, সিনেমা হল ও দোকানপাট থেকে শুরু করে তাজমহল ও আইফেল টাওয়ারের বিশাল প্রতিকৃতিও আছে। ডেরার নিজস্ব একটি অনলাইন ব্যবসাও রয়েছে, যেখান থেকে ডাল, শুকনো ফল, প্রসাধনী ও চুলের কলপসহ নানা ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি করা হয়।
তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার জন্য একটি নিরাপদ ও পবিত্র স্থান তৈরি করা। তবে ডেরার আধুনিক রূপটি তৈরি হয় ১৯৯০ সালে, যখন এর তৃতীয় গুরু হিসেবে দায়িত্ব নেন রাম রহিম সিং।
চাকচিক্যময় জীবন আর নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অনেক আগে রাম রহিম ছিলেন রাজস্থানের এক শান্ত গ্রামের জমিদার পরিবারের একমাত্র সন্তান। ১৯৬৭ সালে এক ধর্মপ্রাণ শিখ পরিবারে তার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি ডেরা সাচ্চা সওদার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বাবা ছিলেন এই সংগঠনের অনুসারী। সাত বছর বয়সেই তৎকালীন প্রধান শাহ সতরাম সিংয়ের হাত ধরে তিনি এই সংগঠনে দীক্ষা নেন বলে সংগঠনের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেরার ভাষ্যমতে, রাম রহিমের ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণের গল্পটি যেন এক দৈব ঘটনা। ১৯৯০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, ডেরার তৎকালীন বয়োজ্যেষ্ঠ প্রধান প্রকাশ্যে ২৩ বছর বয়সী তরুণ রাম রহিমকে নিজের উত্তরসূরি ঘোষণা করেন।
তরুণ রাম রহিম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডেরা সাচ্চা সওদার চেহারা পাল্টাতে শুরু করে। একটি আধ্যাত্মিক সংগঠন থেকে এটি পরিণত হয় এক বিতর্কিত ও হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্যে। ২০১৭ সালে এই সাম্রাজ্যের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কোটি রুপি।
রাম রহিমের ভাবমূর্তিও অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হয়েছে। তাঁর ফ্যাশন সেন্স অনেকটা 'বাইকার গ্যাং লিডারের' মতো। পাথরের কাজ করা রঙিন জ্যাকেট আর হাতে অনেকগুলো স্বর্ণের আংটি পরা রাম রহিমের 'লাভ চার্জার' গানটি তাঁর ভক্তদের মধ্যে রীতিমতো ভাইরাল।
তবে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া নারীদের জন্য লড়াই করা সমাজকর্মী সুদেশ কুমারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাম রহিমের চারপাশে এক আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করত। তিনি বলেন, 'রাম রহিম বলতেন—আমিই সব, আমিই ভগবান। আমি যা বলি তোমাদের তাই করতে হবে। তিনি প্রচণ্ড প্রভাবশালী একজন মানুষ।
২০১৭ সালের আগস্টেই ১৯৯৯ সালের পুরোনো একটি ধর্ষণ মামলায় রাম রহিমকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। দুজন নারী ভক্তকে ধর্ষণের দায়ে তাকে টানা দুটি ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পরপরই হরিয়ানা ও পাঞ্জাবজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ ভক্তরা রাস্তায় নেমে টিভি চ্যানেলের গাড়িতে হামলা চালায়, আগুন দেয় ব্যক্তিগত গাড়িতেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায় হাসপাতালগুলো, আহত মানুষের ভিড়ে উপচে পড়ে জরুরি বিভাগ।
২০১৭ সালে রাম রহিমের সাজা ঘোষণার পর সেই দাঙ্গায় ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। এর দুই বছর পর ২০১৯ সালে সাংবাদিক রাম চন্দর ছত্রপতি হত্যার দায়ে রাম রহিমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ডেরার ভেতরে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতনের তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার কারণেই ২০০২ সালে ওই সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হয়েছিল। রাম রহিমের সঙ্গে তার দুই সহযোগীকেও এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের লড়াই শেষে এই রায় আনশুলের জন্য ছিল স্বস্তির এক মুহূর্ত। 'বলা হয় বিচার পেতে দেরি হওয়া মানে বিচার না পাওয়া। আমাদের ক্ষেত্রে বিচার পেতে দেরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দেরিতে হলেও আমরা বিচার পেয়েছি, এটাই বড় পাওয়া,' বলেন তিনি।
ভারতে 'গডম্যান' সংস্কৃতি
ভারতে তথাকথিত 'গডম্যান' বা আধ্যাত্মিক গুরুদের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। কঠোর জাতপাতপ্রথা এবং সীমাহীন দারিদ্র্য অনেক মানুষকে এসব গুরুর অন্ধ ভক্ত হতে প্ররোচিত করে। সমাজের নিচুতলার লাখ লাখ মানুষ, যাঁদের কাছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পৌঁছায় না, তাদের কাছে গুরুর আশ্রমই হয়ে ওঠে এক বিকল্প স্বর্গ। সেখানে তারা সম্মান ও সাম্যের ভরসা পান এবং গুরুর মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য খোঁজেন।
কাল্ট কনসাল্টিং অস্ট্রেলিয়ার পরিচালক রাফায়েল অ্যারন বলেন, ভারতের এই গুরুরা বিদেশেও অনুসারী খোঁজেন, তবে দেশের মাটিতেই তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভক্তদের দেখা মেলে। এ ধরনের আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী নিয়ে তিনটি বই লিখেছেন অ্যারন। তিনি বলেন, 'ভারতের পরিবেশটাই এমন যে এসব সংগঠনের বাড়বাড়ন্ত হতে সুবিধা হয়। এই গুরুদের মধ্যে এক ধরনের জাদুকরী ক্ষমতা থাকে। তারা খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে সাধারণ মানুষকে কাছে টানতে হয় এবং সেই ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।'
অ্যারনের মতে, এসব গুরুর মূল শক্তি হলো অলৌকিক ক্ষমতা—যেমন রোগ সারিয়ে তোলা বা জীবনের জটিল সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। প্রয়াত সত্য সাই বাবা (যিনি অলৌকিক ঘটনা দেখানোর দাবি করতেন) থেকে শুরু করে বর্তমানের শ্রী শ্রী রবি শংকর—সবার জনপ্রিয়তার পেছনেই রয়েছে এমন কোনো না কোনো আধ্যাত্মিক বিশেষত্ব। শ্রী শ্রী রবি শঙ্করের 'আর্ট অব লিভিং' ফাউন্ডেশন ইয়োগা ও আধ্যাত্মিক উপদেশের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে।
রাফায়েল অ্যারনের মতে, একবার কিছু অনুসারী জুটে গেলে এই সংখ্যাটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার, তারপর লাখ থেকে কোটিতে পৌঁছাতে সময় লাগে না।
এই তথাকথিত গুরুদের কেউ কেউ জনহিতকর কাজের জন্যও প্রশংসিত। গরিবদের জন্য স্কুল বানানো বা অনুন্নত গ্রামে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো তৈরির কাজও তাঁরা করেন। কিন্তু এই উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সমানতালে চলছে সমালোচনাও। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে কিছু গুরুর জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন আর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
১৯৮০-র দশকে ওশো নামে পরিচিত ভগবান শ্রী রজনীশের কথাই ধরা যাক। তার হীরাখচিত ঘড়ি, দামী পোশাক আর বিলাসবহুল 'রোলস রয়েস' গাড়িবহর ভক্তদের মুগ্ধ করত। কিন্তু এখন তাঁর নাম আধ্যাত্মিকতার চেয়ে বেশি আলোচিত হয় অপরাধের কারণে। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে খাবারে বিষক্রিয়া ঘটানো (বায়ো-টেরর অ্যাটাক) এবং অভিবাসন জালিয়াতির মতো অপরাধের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে আছে।
একইভাবে আশারাম বাপু ওরফে 'বাপুজি' সত্তরের দশক থেকে বিশ্বজুড়ে ৪০০ স্কুল আর লাখ লাখ অনুসারীর এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ২০১৮ ও ২০২৩ সালে ধর্ষণের দায়ে তার সাজা হওয়ার পর সেই সাম্রাজ্যের জৌলুস এখন ম্লান।
ধর্ম ও রাজনীতির 'দেওয়া-নেওয়া'
নানা বিতর্ক ও কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও ভারতে আধ্যাত্মিক নেতাদের বড় একটি অংশ এখনো পূজনীয়। যে দেশে ধর্ম ও বিশ্বাস সমাজের অনেকটা অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে গুরু ও রাজনীতিবিদদের সম্পর্ক অনেকটা 'দেওয়া-নেওয়া'র ওপর দাঁড়িয়ে।
চণ্ডীগড়ের ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশনের অধ্যাপক রঙ্কি রাম এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, গুরুরা তাদের লাখ লাখ ভক্তকে একটি শক্তিশালী 'ভোট ব্যাংক' হিসেবে রাজনীতিবিদদের হাতে তুলে দিতে পারেন। আর এর বিনিময়ে রাজনীতিবিদরা এই গুরুদের নানাভাবে সুরক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকেন।
সমালোচকদের মতে, রাজনীতি ও ধর্মের এই অশুভ আঁতাতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো ডেরা সাচ্চা সওদা। এই সংগঠনটি সামাজিক সেবামূলক কাজকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দক্ষতায় বেশ পটু।
যদিও রাম রহিমের আইনজীবী জিতেন্দর খুরানা প্যারোলে মুক্তির পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য থাকার কথা অস্বীকার করেছেন, তবে দেখা গেছে অনেকবারই তার মুক্তি পাওয়ার সময়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে। এতেই এই সন্দেহ জোরালো হয়েছে যে ডেরার দেওয়া 'ভোটের সমর্থনের' পুরস্কার হিসেবেই রাম রহিমকে বারবার কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এবার তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে সংগঠনের দ্বিতীয় প্রধান শাহ সতরাম সিংয়ের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবে যোগ দিতে। হরিয়ানা সরকার অবশ্য রাম রহিমের মুক্তির বিষয়ে সাফাই গেয়ে বলছে, প্যারোল দেওয়া হয় মূলত কয়েদিদের 'পুনর্বাসন' এবং 'সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা' করার সুযোগ দিতে।
রাম রহিমের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় তাঁকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হতো বলে দাবি করেছেন সমাজকর্মী সুদেশ কুমারী। তিনি বলেন, 'সেখানে এক চরম আতঙ্কের রাজত্ব ছিল। তার যে কোনো দিন সাজা হতে পারে, এমন কোনো আশা আমাদের ছিল না।'
অন্যদিকে, আমরেস চাওলার মতো লাখো অনুসারী এখনো রাম রহিমের আদর্শে অন্ধ বিশ্বাসী। নিরামিষ আহার এবং মাদক থেকে দূরে থাকার কড়া নিয়মের কারণেই তারা এই সংগঠনের প্রতি আকৃষ্ট হন। রাম রহিমের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ও আদালতের সাজাকে 'ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দেন চাওলা। তাঁর কাছে 'গুরুজি'র শিক্ষাই শ্রেষ্ঠ। ডেরায় গেলে তিনি মানসিক শান্তি পান উল্লেখ করে চাওলা বলেন, 'গুরুজির সঙ্গে যখন প্রথম দেখা হয়েছিল, আমি আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। সেই মুহূর্ত থেকে আমার জীবন বদলে গেছে।'
ক্ষত যখন বারবার তাজা হয়
গত মাসে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর রাম রহিম এরই মধ্যে ইউটিউবে প্রায় ২৪টি গান প্রকাশ করেছেন। 'ড্রাগস' নামের একটি গানে তিনি মাদক থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, আর 'চার্জ মি' গানে স্রষ্টার কাছে পথনির্দেশ চেয়েছেন। এসব ভিডিওর নিচে হাজার হাজার ভক্ত তাঁকে ভালোবাসা ও শুভকামনা জানাচ্ছেন।
১২ ফেব্রুয়ারি রাম রহিমের বর্তমান প্যারোলের মেয়াদ শেষ হবে। তবে হরিয়ানা সরকারের যে নিয়ম, তাতে বছর শেষ হওয়ার আগেই হয়তো তাঁকে আবারও কারাগারের বাইরে দেখা যাবে।
সাজাপ্রাপ্ত আসামির এভাবে বারবার জেল থেকে বেরিয়ে আসা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে। নিহত সাংবাদিকের ছেলে আনশুল ছত্রপতি বলেন, 'প্রতিবার যখন সে ছাড়া পায়, আমাদের স্বজন হারানোর বেদনা নতুন করে জেগে ওঠে। মনে হয়, শরীরের পুরোনো কোনো ক্ষত যেন আবারও খুঁচিয়ে তাজা করা হচ্ছে।'
