এআই আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
গত কয়েক দশক ধরেই মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু পাঁচ বছর আগেও খুব কম ব্যক্তিই ধারণা করেছিলেন যে ২০২০–এর দশকে—এমনকি সম্ভবত পুরো শতাব্দীতেই—এআই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল—এআইকে ঘরে ঘরে পরিচিত করেছে; তবে এআইয়ের সব ক্ষেত্রেই বড় অগ্রগতি হয়েছে।
এখন এআই আমাদের জীবন ও বিশ্বকে কতটা বদলে দেবে—তা নিয়ে আমরা কথার বন্যায় ভাসছি। ইতিমধ্যে কোম্পানিগুলো নানা কাজ, এমনকি সম্পূর্ণ চাকরিও এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার উপায় খুঁজছে। আরও বেশি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য এআইয়ের দিকে ঝুঁকছে। শিক্ষাবিদরা শিক্ষার্থীদের এআই টুলগুলোর ওপর বাড়তি নির্ভরতা কীভাবে সামলাবেন, তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আর নিকট ভবিষ্যতে এআই ওষুধ আবিষ্কার ও জ্বালানি খাতে যুগান্তকারী অগ্রগতি আনতে পারে। এই প্রযুক্তি আরও বেশি মানুষকে শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক কন্টেট তৈরির সুযোগ দিতে পারে—অথবা এই ক্ষেত্রগুলোকে নিম্নমানের কনটেন্টের কারখানায় পরিণত করতে পারে।
সুতরাং এআই আমাদের উন্নত ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে নাকি ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে—এই প্রশ্নে সমাজ যখন দ্বিধাবিভক্ত, তখন মার্কিন দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতামত বিভাগ (টাইমস ওপিনিয়ন) আগামী পাঁচ বছরে এআই কোন দিকে যেতে পারে—তা জানতে আটজন বিশেষজ্ঞ এবং প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীর মতামত নিয়েছে। তাদের কথা শোনা হয়তো আমাদের এই নতুন প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো কাজে লাগাতে এবং নেতিবাচক দিকগুলোর প্রভাব কমাতে সাহায্য করবে।
আগামী পাঁচ বছরে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় বাজি কী?
ইউভাল নোয়া হারারি, ইতিহাসবিদ
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কিছু দেশে এআই এজেন্টকে আইনি সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতে পারে।
মেলানি মিচেল, কম্পিউটার বিজ্ঞানী
এআই ক্যানসার সারাবে না বা পদার্থবিজ্ঞানের সব সমস্যার সমাধান করবে না। আর সাবলীলভাবে কথা বলতে পারা—এটিকে কেউই চূড়ান্ত বুদ্ধিমত্তার লক্ষণ বলে মনে করবে না।
হেলেন টোনার, এআই নীতি গবেষক
আমার ধারণা, আমাদের কাছে এমন এআই সিস্টেম থাকবে যা একাধিক বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে একেবারে অগ্রসীমায় অবদান রাখতে পারবে—কিন্তু নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কাজের পরিকল্পনা করতে তবু একে বিশ্বাস করতে পারবেন না।
নিক ফ্রস্ট, কোহেয়ারের সহপ্রতিষ্ঠাতা
এআই সবচেয়ে ভালো অর্থে একঘেয়ে হয়ে যাবে। জিপিএস বা স্প্রেডশিটের মতো মানুষের মনোযোগের কেন্দ্র থেকে পেছনে চলে যাবে। তবে দৈনন্দিন এআই টুলও মানুষের কাজকে শক্তি জোগাবে। সবচেয়ে সাধারণ ব্যবহারগুলোই আসলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনে।
কার্ল বেনেডিক্ট ফ্রে, অর্থনীতিবিদ
শুধু আমরা যা আগে থেকেই করি সেটাকে স্বয়ংক্রিয়তায় রূপান্তর করলেই এআই দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি বয়ে আনবে না। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর এআই টুল আমাদের সস্তা ফলাফলের স্প্রেডশিট দেয়—যেমন যন্ত্রচালিত তাঁত আমাদের সস্তা কাপড় দিয়েছিল। কিন্তু বড় অগ্রগতি আসে নতুন শিল্প থেকে, দ্রুত পুনরাবৃত্তি করার শক্তি থেকে নয়।
গ্যারি মার্কাস, কোগনিটিভ সায়েন্টিস্ট (চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষক)
২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তো নয়ই, এমনকি সম্ভবত ২০৩২ সালের শেষ নাগাদও কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (এজিআই) আসবে না।
আজেয়া কোত্রা, এআই ঝুঁকি গবেষক
আমার মনে হয়, পাঁচ বছরের মধ্যে এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের অনেক অপারেশনই এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয় করে ফেলবে, যা এআইয়ের অগ্রগতিকে আরও দ্রুততর করবে।
অরবিন্দ শ্রীনিবাস, পারপ্লেক্সিটির প্রধান নির্বাহী
মানুষ চায় অত্যন্ত ব্যক্তিগত এআই সহকারী—যা তাদের জন্য কাজ করবে। এটা তাদের এআই, আমাদের বানানো এআই নয়। আমরা এমনটাই গড়ে তুলছি। ব্যবহারকারীদের এআই সহকারী ব্যক্তিগত ও নিরাপদ যেন থাকে— সেই অধিকার রক্ষায় হয়তো আমাদের লড়তে হবে।
নিকট ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআইয়ের প্রভাব কী হবে?
গ্যারি মার্কাস
চিকিৎসায় এআই ব্যাপক অবদান রাখবে, আপাতত সেই ধারণাটির সাফল্য অনেক দেখা গেছে, কিন্তু আমার জানামতে বাস্তব ক্ষেত্রে এখনও খুব বেশি প্রয়োগ শুরু হয়নি—মেডিকেল নোট লেখার মতো খুচরও কাজগুলোর বাইরে।
নিক ফ্রস্ট
এআই অবশ্যই চিকিৎসকদের কার্যকারিতা বাড়াবে। একেকজন রোগীর পেছনে তাদের কাজের চাপ কমাবে। যেমন দ্রুত রোগীর চিকিৎসার রেকর্ড পর্যালোচনা, নতুন তথ্য সংগঠিত করা, সম্ভাব্য সমস্যা আগে থেকেই শনাক্ত করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সহায়ক হবে এআই।
তবে এআই বিশাল ডেটা বিশ্লেষণে খুব ভালো হলেও একেবারে নতুন ধারণা তৈরি করতে ভীষণ দুর্বল। এআই নিজে নিজে নতুন ওষুধ আবিষ্কার করবে—এই আশা করলে মানুষ সম্ভবত হতাশই হবে।
প্রোগ্রামিংয়ে এআইয়ের প্রভাব কী হবে?
ইউভাল নোয়া হারারি
কোডিং মূলত তথ্য নিয়ে কাজ করা, এতে শারীরিক বা জৈবিক সীমাবদ্ধতা খুব কম। তাই এটি এআইয়ের জন্য আদর্শ ক্ষেত্র।
কার্ল বেনেডিক্ট ফ্রে
একটি র্যান্ডমাইজড পরীক্ষায় দেখা গেছে, গিটহাব ক্যাপিলট ব্যবহার করে ডেভেলপাররা প্রায় ৫৬ শতাংশ দ্রুত কাজ শেষ করেছেন। ২০২৫ সালে ৮০ শতাংশের বেশি ডেভেলপার বলেছেন, তারা এআই টুল ব্যবহার করছেন বা করবেন—তবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এআই প্রদত্ত আউটপুট বা কাজের ফলাফলকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজে মানুষের পর্যালোচনা/ সংশোধন এখনো জরুরি।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এআইয়ের প্রভাব কী হবে?
মেলানি মিচেল
আমার বিশ্বাস, এই প্রভাব অনেক যেমন ধারণা করছেন, তেমন দ্রুত হবে না। সঠিক প্রশ্ন তোলা, পুরো গবেষণা পরিকল্পনা করা, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ডেটা বোঝা—এই কাজগুলোতে মানুষ এখনও অপরিহার্য।
অরবিন্দ শ্রীনিবাস, পারপ্লেক্সিটি
এআই যত বেশি বিশ্বের জ্ঞান ধারণ করবে, প্রশ্নকারীদের জন্য তত শক্তিশালী টুল হবে। মানুষ বরাবরই প্রশ্ন করতে দক্ষ। এআই হবে উত্তরে দক্ষ।
পরিবহনখাতে এআইয়ের প্রভাব কী হবে?
নিক ফ্রস্ট
আমি সবচেয়ে আগ্রহী পরিবহনের লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনার উন্নতি নিয়ে। যেমন পূর্বানুমানযোগ্য রক্ষণাবেক্ষণ, স্মার্ট ট্রাফিক বিশ্লেষণ, রুট অপটিমাইজেশন ও চালকের নিরাপত্তা ইত্যাদি।
হেলেন টোনার
স্বচালিত গাড়ির বিস্তার আমাকে খুব আশাবাদী করে—কারণ এতে প্রতিবছর হওয়া হাজার হাজার সড়ক মৃত্যুর ঘটনা কমতে পারে। তবে এখানে অগ্রগতি খুব ধীর এবং অন্য পরিবহনখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব কতটা হবে তা স্পষ্ট নয়।
শিক্ষায় এআইয়ের প্রভাব কী হবে?
কার্ল বেনেডিক্ট ফ্রে
এআই টিউটররা ইতিমধ্যে অনেক মানব শিক্ষকের চেয়ে ভালো পারফর্ম করছে, কিন্তু এগুলো শর্টকাটের প্রলোভনও বাড়ায়। আমাদের এআই-মুক্ত সময় রাখতে হবে—স্বাধীনভাবে পড়া ও ভাবার জন্য।
একই সঙ্গে, সামনাসামনি টিউটোরিয়ালভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বিতর্ক করবে ও যুক্তি উপস্থাপন করবে।
গ্যারি মার্কাস
শিক্ষায় প্রভাব এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। স্কুল ও কলেজগুলো বুঝে উঠতে পারছে না কী করা যায়। কারণ শিক্ষার্থীরা এআইয়ের সাহায্য নেওয়ায় টার্ম পেপার আর মূল্যায়নের কার্যকর মাধ্যম থাকতে পারছে না।
হেলেন টোনার
শিক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই বড় পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিল। সেদিক থেকে বলা যায়, এআইয়ের সাথে মানিয়ে নেওয়া হয়তো আশীর্বাদই হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যে এআইয়ের প্রভাব কী হবে?
মেলানি মিচেল
মন্দ দিক: এআই-প্ররোচিত মানসিক বিভ্রান্তি।
ইতিবাচক দিক: কিছু মানুষ চ্যাটবটকে থেরাপিস্ট হিসেবে ব্যবহার করে সত্যিই উপকৃত হবে।
ইউভাল নোয়া হারারি
এআই বিপ্লবের দ্রুত পরিবর্তন মানসিক স্বাস্থ্য সংকট ডেকে আনতে পারে। আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালাতে যাচ্ছি—কোটি কোটি মানুষের ওপর।
নিক ফ্রস্ট
চ্যাটবট সামান্য মানসিক সমস্যায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মানব থেরাপিস্টের সে বিকল্প নয়।
শিল্প ও সৃজনশীলতায় এআইয়ের প্রভাব কী হবে?
মেলানি মিচেল
এআই শিল্প, লেখা ও সংগীতে রূপান্তরমূলক প্রভাব ফেলবে—কারণ এটি সস্তা। অনেক সময় দামের বিষয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইউভাল নোয়া হারারি
যে সৃজনশীল কাজগুলো মূলত প্যাটার্ন খোঁজা ও ভাঙার ওপর নির্ভর করে—সেগুলো এআইয়ের দখলে চলে যাবে।
নিক ফ্রস্ট
শিল্পে এআই ভাবনার খোরাক দিতে পারে, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত মানুষই নেয়—কোনটা তার ঠিক লাগছে।
